নিউজপোল ডেস্ক:‌ সোশ্যাল মিডিয়া!‌ আমজনতার জীবনযাত্রাই পাল্টে দিয়েছে এই দু’‌টি শব্দ। কী করছেন, কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে ঘুরছেন— এসবেরই খুঁটিনাটি ফেসবুক বা টুইটারে না জাহির করা পর্যন্ত যেন শান্তি নেই আমাদের। অনেকেরই অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের গোটা দিনের অনেকটা সময় খেয়ে নিচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ফেসবুকে কিংবা টুইটারে মুখ গুঁজে বসে থাকা মানে শুধুই সময়ের অপচয়, আর কিছুই নয়। কিন্তু সত্যিই কি তাই?‌ ২০১৮ সালটা কিন্তু এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। গত বছরে গোটা দেশে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা চমকে দেওয়ার মতোই ভাল। সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া আর কিছুতেই সম্ভব হতো না এগুলি। আসুন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এমন ন’‌টি ঘটনা।

১. সুনীলের আর্জি:‌ ফুটবল নিয়ে আমাদের প্রবল উন্মাদনা। কিন্তু আমাদের জাতীয় ফুটবলের দলের প্রতি অনেকেরই সেভাবে আগ্রহ নেই। সেটা আরও একবার প্রমাণিত হয়েছিল ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে। ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীর হ্যাটট্রিকের দিনে স্টেডিয়ামের মাত্র এক–চতুর্থাংশ আসন ভর্তি হয়েছিল। এরপরেই ভারতের অধিনায়ক সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ফুটবলপ্রেমীদের উদ্দেশে মাঠে আসার অনুরোধ জানান। মাত্র ২ মিনিটের এই ভিডিও নিয়ে তোলপাড় পড়ে যায়। শচীন তেন্ডুলকার, বিরাট কোহলির মতো তারকারা ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করেন। সুনীলের মতো তাঁরাও ভারতীয়দের প্রতি স্টেডিয়ামে এসে জাতীয় দলকে সমর্থন করার অনুরোধ জানান। এই প্রয়াস ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকরী হয়েছে। আর তার পরের ম্যাচেই তিলধারণের জায়গা ছিল না মাঠে।

২. আমজনতাই তুলে দিল ছাত্রীর খরচ:‌ সম্প্রতি বাবাকে হারিয়েছেন। সবজি বিক্রি করে সংসার চালান মা। একমাত্র ভরসা মা-ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অথচ কলেজে ভর্তির ফি দিতে হবে ১৮ বছরের এক ছাত্রীর। ভেবেচিন্তেও যখন কোনও পথ পাওয়া গেল না, তখন কলেজের অধ্যক্ষ উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু কলেজের সমস্ত কর্মীকে জানিয়েও কিছু করে উঠতে পারলেন না। অবশেষে ওই কলেজেরই অধ্যাপিকা নন্দিনী সেন পুরো বিষয়টা ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেটি নিয়ে হইচই পড়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। অবশেষে মেটে সমস্যা। আজকের দিনে যেখানে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ স্লোগান, সেখানে কলেজ কর্তৃপক্ষের এমন উদ্যোগ সত্যিই তারিফযোগ্য।

৩. গানে সুপারহিট শ্রমিক:‌ পেশায় শ্রমিক রাজেশ থাকেন কেরলের নুরানন্দে। লরিতে মাল বোঝাইয়ের পর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাজেশ। গাড়ির চালক সমীরে তাঁকে গান গাওয়ার অনুরোধ করেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজেশ গান গাইলে সমীর সেটি রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। বাকিটা ইতিহাস। এই ঘটনার পর গোপী সুন্দর, বলভাষ্কর, পন্দালাম বালান-এর মতো সঙ্গীত পরিচালকেরা তাঁদের পরবর্তী সিনেমায় রাজেশের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই অসম্ভবও সম্ভব হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতেই।

৪. পাখির ঠোঁটে রিং:‌ নফজগড়ের বসইয়ের ঘটনা। দিল্লির নাগরিক মনোজ নাইয়ারের পাখির প্রতি আগ্রহ বরাবরের। সেই সূত্রেই তাঁর যাওয়া বসই ওয়েটল্যান্ডে। সেখানে গিয়ে মনোজ একটি সারস পাখির ছবি তোলেন, যাঁর ঠোঁট প্লাস্টিকের একটা রিং দিয়ে আটকানো। পাখিটির লম্বা ঠোঁট বন্ধ হওয়ায় সে অভুক্ত অবস্থায় বেশ কিছুদিন কাটায়। ইতিমধ্যে মনোজের তোলা ছবিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। বার্ডস অ্যান্ড ফরেস্ট টিমের নজরে আসতেই বিষয়টি খতিয়ে দেখে তারা। অবশেষে ৫দিনের মাথায় পাখিটি অনাহারে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাকে উদ্ধার করা হয়।

৫. যে হাতে শাসন, সে হাতেই স্নেহ:‌ অর্চনা জয়ন্ত সিং আগ্রার বাসিন্দা। কিন্তু কর্মসূত্রে থাকেন ঝাঁসিতে। ৬ মাসের কন্যাসন্তানের মা অর্চনা পেশায় কনস্টেবল। তাঁর স্বামী গুরগাঁও-এর একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। তাই পরিবার থেকে আলাদা থাকতে হয় অর্চনাকে। তা বলে নিজের সন্তানকে তো অবহেলা করা যায় না। তাই ছ’‌মাসের কন্যাকে টেবিলে শুইয়ে রেখেই প্রশাসনিক কর্তব্য পালন করেন তিনি। কর্মরতা অর্চনা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় তাঁর ছ’‌মাসের সন্তান শুয়ে আছে টেবিলে। ছবিটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই উত্তরপ্রদেশ পুলিস প্রত্যেকটি থানায় শিশু রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। দেশের সম্পদ, শিশুর নিরাপত্তার জন্য এমন ঘটনাও বিরল।

৬. ছ’‌ঘণ্টায় ১৭ লক্ষ:‌ অফিসে কর্মরত অবস্থায় একে অন্যকে চেনা। তারপর দুজনের প্রেম। প্রায় ২ বছর পর বাড়ির মতে বিয়েও হয়। সবই ঠিকঠাক চলছিল। সমস্যা শুরু হল এর পরে। যমজ সন্তানের জন্মের অব্যবহিত পরেই মারা যান বধূ। এমন অকাল মৃত্যুতে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারল না। যুবকও মারা গেলেন মাত্র কুড়িদিনের মাথায়। যমজ ভাইবোন বড় হতে লাগল দাদু-ঠাকুমার তত্ত্বাবধানে। যমজ সন্তানের মধ্যে মেয়েটির (‌আরুশি)‌ কঠিন অসুখ ধরা পড়ে আড়াই বছর পর। প্রচুর টাকার প্রয়োজন। অথচ এত খরচ বহন করার ক্ষমতা দাদু ঠাকুমার নেই। তখন ‘‌হিউম্যানস অফ বম্বে’ নামে এক সংস্থার উদ্যোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারকাজ শুরু হয়। আশ্চর্যভাবে মাত্র ৬ঘন্টার মধ্যে প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা অনুদান ওঠে।

৭. টাকাও এল, ছাতাও এল:‌ ট্রাফিক সিগন্যালের কাছে অল্পবয়স্ক ছেলে ও মেয়ে ফেরি করছে, এরকম দৃশ্য আমরা প্রায়শই দেখতে পাই। এদের কাজ থামে না বৃষ্টির সময়েও। কখনও কি এরা আপনার কাছে ছাতা চেয়েছে? এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে আপনি কী করতেন? ২৮ বছরের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী বিমলও পড়েছিলেন এমনই পরিস্থিতিতে। বিষয়টি তাঁকে নাড়া দেয়। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি শেয়ার করেন একটি পোস্ট, যেখানে তিনি ওই শিশুদের ছাতা চান। বন্ধু ও সহকর্মীদের সহায়তায় ছড়িয়ে যায় তাঁর পোস্ট। মাত্র ১০ দিনের মাথায় ৭০০টি ছাতা ও প্রায় ৪০,০০০ টাকা অনুদান মেলে। বিমল ও তাঁর বন্ধুদের উদ্যোগে এগুলি বিতরণ করা হয় শহরের বিভিন্ন ট্রাফিক সিগনালে।

৮. ঠাঁই পেলেন রাজা:‌ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। তবু রাজা সিং ফুলের রাতদিন কাটে নয়াদিল্লির রেলস্টেশনের কাছেই। তাঁর দুই ছেলের একজন আমেরিকা ও অন্যজন ইংল্যান্ডে প্রবাসী। সন্তানের সময় নেই রাস্তায় পড়ে থাকা বাবার খেয়াল রাখার। অবশেষে দিল্লির এক বাসিন্দা অবিনাশ সিংয়ের অসামান্য উদ্যোগে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হল রাজা সিংয়ের। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই ঘরছাড়া বৃদ্ধ ফিরে পেলেন ঘর।

৯. যে মেয়ে এক করে দিল ইস্ট–মোহনকে:‌ দুর্গাপুরের মেয়ে ঊষশ্রী চক্রবর্তী প্রাণবন্ত, মেধাবী ছাত্রী। পদার্থবিদ্যায় গবেষণা ছাড়াও একজন ক্রীড়াপ্রেমী। কেরিয়ারের শুরুতেই ধরা পড়ল ব্লাড ক্যান্সার। অপারেশনের জন্য প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন। এক মধ্যবিত্ত পরিবার কীভাবে জোগার করবে এত টাকা! ঊষশ্রীর বন্ধুরা এগিয়ে আসেন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে যায় দূর-দূরান্তে। বিদেশ থেকেও আসতে থাকে অনুদান। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের একনিষ্ঠ সমর্থক ঊষশ্রী পাশে দাঁড়ায় ক্লাবের সমর্থক এবং বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ। অনুদান তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন চিরশত্রু মোহনবাগানের সদস্য–সমর্থকরাও। আপামর মানুষের সহযোগিতায় প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় মাত্র কয়েকদিনেই। টাকার জন্য চিকিৎসা আটকায়নি। যদিও বাঁচানো যায়নি তাঁকে।‌