ব্যান্ড–এ–মাতরম থেকে জয়যাত্রা শুরু। তারপরে কেটে গিয়েছে একযুগের বেশি। বাংলা ব্যান্ডের জগতে এখনও অন্যতম সেরা আকর্ষণ ‘‌ঈশান’‌। বুধবার ১৯ বছরে পা রাখল বাংলার এই প্রথম নিও প্রোগ্রেসিভ রক ব্যান্ড। তাদের ফ্রন্টম্যান সায়ন মিত্রের সঙ্গে কথা বললেন দেবাশীষ দাস

অবশেষে ১৯-এ পা দিল ঈশান। অনেকটাই লম্বা সফর। নিশ্চয়ই অনেক বাধাবিপত্তি এসেছে! ঈশানের ফ্রন্টম্যান হিসেবে কী বলবে?

সায়ন: অফিসিয়ালি ঈশান ব্যান্ড ২০০০ সালে তৈরি হলেও আনঅফিসিয়ালি ১৯৯৭ থেকে শুরু হয়েছে ঈশান-এর যাত্রা। আমি আর ইবলু (‌প্রাক্তন গিটারিস্ট)‌ তখন স্কুলে পড়ি। তখন আমরা কেউই ‘প্রফেশনাল মিউজিসিয়ান’ ছিলাম না। আমাদের একটা গ্রুপ ছিল। স্কুলে সবাই মিলে গানবাজনা শুরু করি। সেখান থেকেই মৌলিক গান লেখা শুরু আমাদের। তারপর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং সেখানে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা তো অনেকেই জানেন। এখান থেকেই আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়তে শুরু করে। তারপর অ্যালবাম-এর দিকে পা বাড়াই। যদিও তারপর লাইন আপের বদল হয়েছে। কিন্তু এটা তো একটা ইনস্টিটিউশন। মতানৈক্যের কারণে সদস্য পরিবর্তন হলেও প্রত্যেকের অবদান রয়েছে এই ব্যান্ডে। পরে নতুনেরা এসেছে। একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা। ব্যান্ডের দর্শন মেনে আমরা নিজেরা নিজেদের যথেষ্ট জায়গা দিয়েই এগিয়ে চলেছি। ব্যক্তিগত সমস্যা সেখানেও এসেছে। কেউ বেরিয়েও গিয়েছে সেই কারণে। তবে একনায়কতন্ত্র আসেনি কখনও। এতগুলো বছর ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছি আমরা। টানাপোড়েন থাকবেই শিল্পীর জীবনে। ঈশান আমার সন্তান। একসঙ্গে চলতে চলতে ব্যান্ডের অন্যান্য সদস্যদেরও সন্তান হয়ে উঠেছে। তবে এটা বলতে পারি, প্রতিকূলতা থাকেই। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে ঈশান ব্যান্ড বন্ধ হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

তোমরা যে ধরনের কাজ করো, সেগুলো বাংলা ব্যান্ডের প্রথাগত গানগুলোর মতো নয়। বরং অন্য ধরনের জঁর নিয়ে তোমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শ্রোতারা যে সাদরে গ্রহণ করেছেন এই ফরম্যাট, বলা বাহুল্য।

সায়ন:‌ একদমই তাই। আগের প্রশ্নেরও উত্তর রয়েছে এখানে। শ্রোতাদের ভালবাসা বা বিশ্বাস যদি আমাদের ওপর না থাকত, আমরা চলতে পারতাম না হয়তো। আমাদের এত লাইন আপ বদলেছে, এত বাধাবিপত্তি এসেছে, তবুও ওঁরা আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করেছে এবং করছেনও। শ্রোতারাই আমাদের আসল শক্তি। ওঁরা আছে বলেই, থেমে যাইনি আমরা।

এই ভক্তরাই তো আরও গান চাইছেন। নতুন অ্যালবাম আসুক, চাইছেন। কিন্তু আগাগোড়াই তোমরা অনেক সময় নিয়ে অ্যালবাম প্রকাশের পক্ষপাতী। এটা কেন? পারফেকশন?
সায়ন:‌ পারফেকশন তো বটেই। এই বিষয়ে একটা কথা বলা দরকার। আমার ব্যক্তিগত স্টুডিও, যার নাম ‘র-সায়ন’, এখানেই অন্যান্য রেকর্ডিং ছাড়াও আমাদের ব্যান্ডের গানের রেকর্ডিংয়ের কাজ করি। আসলে আগাগোড়াই আমরা নিজস্ব স্টুডিওতে কাজ করতে অভ্যস্ত। ওই কারণে নিজেদের মতো করে আমাদের সৃষ্টিগুলোকে নিখুঁত করার কথা ভাবার অবসর পাই আমরা। যা ভাড়া করা কোনও স্টুডিওর ক্ষেত্রে সেই সুযোগ পাওয়া যায় না সবসময়। পারফেকশনের জন্যই আমার স্টুডিও র-সায়নেই আমরা আমাদের যাবতীয় অ্যালবামের কাজ করি। বলা যায়, সেই কারণেই অনেকটা সময় লাগে আমাদের।

✦ অ্যালবামের কাজ তো জোরকদমে চলছে। কবে আসছে অ্যালবাম?

সায়ন:‌ এই নিয়ে অনেকেই অনেক প্রশ্ন করছেন। আমাদের শ্রোতারাও অপেক্ষা করে আছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলব, খুব শিগগিরই আসতে চলেছে আমাদের তৃতীয় অ্যালবাম। আমরা একটু অন্যরকমভাবে ভাবছি এবার। আমরা অ্যালবামের হার্ড কপি করার কথা ভাবছি। সেখানে গানের কথা লেখা থাকবে। আর্ট ওয়ার্কও থাকবে সেখানে। আমার আঁকা ছবিও থাকবে। যাতে অ্যালবাম যাঁরা কিনবেন, তাঁরা যত্ন করে অ্যালবামটা সংরক্ষণ করতে চাইবেন।

✦ অ্যালবামের ক্ষেত্রে তোমরা ফিজিক্যাল কপির পক্ষে। আজকের এই ডিজিটাল সময়ে দাঁড়িয়ে কতটা কার্যকরী এই উদ্যোগ?
সায়ন:‌ এই প্রজন্মের অনেকেই আমাদের সিঙ্গল প্রকাশ করার পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু আমরা অ্যালবামের দিকেই যাচ্ছি। অ্যালবামের একটা আলাদা আবেদন রয়েছে। আমাদের সঙ্গে পরিচতি তৈরি হয় শ্রোতার। যেটা শুধু একটা গানের মাধ্যমে হয়ে ওঠে না। শুধু তা-ই নয়, ফিজিক্যাল কপির কথাই যে আমরা ভেবেছি, তার কারণ অবশ্যই আমরা যা দেখে এসেছি, তারও একটা প্রভাব রয়েছে। হয়তো এটাও ঠিক, অ্যালবাম প্রকাশের পরদিনই পাইরেসি হবে। কিন্তু এই প্রজন্মেও অনেকে রয়েছেন, যাঁরা বাড়িতে সিডি রাখতে চান, ইনলে হাতে নিয়ে ঘাঁটতে চান। তাঁদের কথা ভেবেই ফিজিক্যাল কপির সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। তবে ফিজিক্যাল কপি ছাড়া গানগুলো অনলাইনে তো থাকবেই।

✦ গত বছরই অপ্রাপ্তবয়স্কের তকমা ঘুচেছে। সিনিয়র মিউজিসিয়ান হিসেবে দায়িত্ব বেড়েছে তো অনেক! কী মনে হচ্ছে? এই সময়ের উঠতি ব্যান্ডগুলিও তাদের গান প্রকাশ করছে তোমাদের হাত ধরে!

সায়ন:‌ নতুনরা যে আমাদের ওপর আস্থা রাখছে, আমাদের থেকে উৎসাহ পাচ্ছে, একইভাবে আমরাও কিন্তু ওদের মাধ্যমে উৎসাহিত হচ্ছি। আসলে আমরা একটা কমিউনিটি, যেখানে আমরা বাংলা মৌলিক গান করি। একই জায়গায় রয়েছি আমরা। আমাদের গানগুলো প্রথাগত মাধ্যমে বাজানো হয় না। সেখানে দাঁড়িয়ে একক লড়াই ফলপ্রসূ হবে না। নতুন, পুরনো সবাই মিলে লড়তে হবে। আমাদের জায়গা আমাদেরই দখল করতে হবে।
বাংলা ব্যান্ডের পরিসরটা বড্ড ছোট। অল্টারনেটিভ গান বলতে শ্রোতারা যা বোঝেন, সেই ক্ষেত্র নিয়ে ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যেই কাদা ছোড়াছুড়ির অভিযোগ তোলেন অনেকে!
হ্যাঁ অনেকেই অভিযোগ করেন। কিন্তু এগুলো তো ঠিক নয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থুতু ছোড়ার মতো। নিজেরাই কালিমালিপ্ত হব। এই মুহূর্তে আমাদের সংঘবদ্ধ হওয়া দরকার। একসঙ্গে লড়তে হবে।

✦ তোমাদের ‘ছিলিস তুই কোথায়’ মিউজিক ভিডিও নিয়ে প্রশংসা করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সেই বাচ্চু ভাই চলে গেলেন। একজন মিউজিসিয়ান হিসেবে এই অঘটনে বাংলা গানের ধারায় কতটা ঘাটতি মনে হয় তোমার?

সায়ন:‌ যাঁদের ছোটবেলা থেকে শুনছি, তাঁদের মধ্যে বাচ্চুভাই অন্যতম। সেই বাচ্চু ভাই নেই ঠিকই, কিন্তু ওঁর গান বেঁচে থাকবে। সবথেকে বড় কথা, মানুষ হিসেবেও বাচ্চু ভাই অসাধারণ। শুধু ‘ছিলিস তুই কোথায়’ নয়, বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতা শুরু হয় ‘বাংলাদেশ’ গান দিয়েই। বাচ্চু ভাইকে পাঠিয়েছিলাম গানটা। ওঁর পছন্দ হয়েছিল গানটা। নিজেই যোগাযোগ করেছিল। শিল্পী হিসেবে বাচ্চু ভাইয়ের যে সুনাম, মানুষ হিসেবেও তার থেকে কম কিছু নয়। আমাদের জঁর ওর ভাল লেগেছিল। এমনকী, বাংলাদেশে একটা কনসার্টের কথাও হয়েছিল বাচ্চুভাইয়ের সঙ্গে। এটা অপূরণীয় ক্ষতি।

গত বছরে রুফটপ কনসার্টের মধ্যে দিয়ে জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছিল ঈশান। এবারেও কি সেরকম কোনও পরিকল্পনা রয়েছে?

সায়ন:‌ সেরকমই পরিকল্পনা ছিল আমাদের। সেভাবে এগোচ্ছিলামও। কিন্তু আগামীকাল নির্বাচনের ফলপ্রকাশ। সেই কারণেই আমরা পিছিয়ে এলাম। তবে গানের আড্ডা নিশ্চয়ই হবে আজ।

✦ জন্মদিনে কী রেজোলিউশন থাকবে?
সায়ন:‌ আপাতত অ্যালবাম নিয়েই ভাবছি। ঈশান-এর শ্রোতাদের জন্য আমাদের তরফ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অ্যালবাম প্রকাশ করাই এই মুহূর্তের রেজোলিউশন।