সহকারী পরিচালক হিসেবে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অজস্র ‘‌প্রোজেক্ট’‌–এ কাজ করেছেন। মহীনের সবচেয়ে দুঁদে ঘোড়াকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ৭১তম জন্মবার্ষিকীতে প্রাক্তন ‘‌বস্‌’‌–এর জীবনের নানা অজানা গল্প নিউজপোলকে বললেন ল্যাডলী। শুনলেন কৃশানু ঘোষ।

আড্ডার শুরু চায়ের দোকানে:‌ বেহালায় কাছাকাছি পাড়ায় থাকতাম আমরা। পরে নাকতলায় চলে যায় মণিদা। তাতে যোগাযোগ আটকায়নি। বেহালাতেই ছিল এক আড্ডার জায়গা, ‘মহাদেবের চায়ের দোকান’। সেখানেই একজোট হত সবাই। সমবয়সিদের সঙ্গে মণিদার তেমন সখ্য ছিল না। বয়সে ছোট, প্রাণবন্ত তরুণদেরই পছন্দ করতেন তিনি। আমরাও তাঁর দিকে আকর্ষিত না হয়ে পারতাম না। বয়সে বড়, নবীনদের ভাল সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পকলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, এক অন্যধারার জীবনযাত্রার সুলুক-সন্ধান দিচ্ছে, কে না আকর্ষিত হবে!‌ আমার মধ্যে সহজাতভাবে ম্যানেজমেন্ট সামলানোর দক্ষতা ছিল, সেটা দেখে অসংখ্য প্রোজেক্টে আমায় সঙ্গী করে নিয়েছিল। পথনাটক, সিনেমা এবং আরও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছি মানুষটার সঙ্গে।

আড্ডা তো নয়, যেন থিঙ্কিং ক্লাব:
মানুষটা কেমন ছিল, সেটা এককথায় বলা মুশকিল। একইসঙ্গে প্রচণ্ড রগচটা আবার কখনও খুবই ট্যাকটিক্যাল। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তাঁর শেষ ফিচার ফিল্মটি মাত্র একবারই নন্দনে দেখানো হয়েছিল। এই নিয়ে ঝগড়া কম হয়নি। আমাদের তখন মনে হত এটা ওঁর দম্ভ। কিন্তু পরে বুঝলাম, আত্মবিশ্বাস। বলত, ‘এই শোন, আমার চিরকুট বেচে রেশন তুলবি।’ আমি এবং আমার বয়সি আরও অনেক তরুণ সেই সময় মণিদার সঙ্গে গানবাজনা কিংবা থিয়েটার করার দিকে ঝুঁকে পড়েছি। আসলে অল্টারনেটিভ স্টান্ট, অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট স্টান্ট এই ব্যাপারগুলো খুব পছন্দ করত লোকটা। আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় রোজ অংশগ্রহণ করে গেছে। আয়োজন করেছে নানা বিষয় সম্পর্কিত বিতর্কের। এবং আমরা যে কাগজ (ম্যাগাজিন) করতাম তা কখনও বিনামূল্যে নেয়নি। বলত, ‘না, কাগজ আমি কিনে নেব।’

অসম্ভব আড্ডাবাজ ছিল এ আর নতুন করে বলার কিছু নয়। তবে আড্ডা মানে নিছক আড্ডা কোনওদিনও দিতে দেখিনি মণিদাকে। সবসময়, আড্ডার মধ্যে দিয়ে মোটিভেট করার একটা প্রয়াস ছিল তাঁর। হয়তো নানা ধরনের গল্প বলে যাচ্ছে, কিন্তু যার বোঝার ক্ষমতা আছে সে ওখান থেকেই এগিয়ে যাওয়ার রসদ পেয়ে যাবে। সবসময় কিছু না কিছু প্রোডাক্টিভ, সৃষ্টিশীল চিন্তায় মগ্ন থাকত। হাতে পয়সাকড়ি কিছু নেই, কিন্তু সারাক্ষণ কিছু না কিছু ভেবে চলেছে। ওই সময়ে ওঁর থেকে ভাল মানের গিটারিস্ট অনেকেই ছিল, কিন্তু ক্রিয়েটিভিটির ব্যাপারটায় আর সবাইকে পেছনে ফেল দিয়েছিল মণিদা। আর শুধু গিটার তো না, নানারকম যন্ত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে জীবনে। একবার বিদেশ থেকে ফেরার সময় একটা স্যাক্সোফোন নিয়ে হাজির হল। না শিখেও দিব্যি বাজানোও শুরু করল। অনেকেই জানে না, মণিদার প্রথাগতভাবে শেখা যন্ত্র ছিল শুধুই তবলা। আর কিচ্ছু না। বাকিগুলো নিজে নিজে শিখেছে।

রগচটা, খুঁতখুঁতে, ট্যাকটিক্যাল: একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক।‌ একবার এক রেস্তোরাঁয় বসে পানাহার করছি আমরা দু’জন। নামী সংবাদপত্রের এক সাংবাদিক এসে বলল, ‘কী গো, কীসব লায়লা-মজনু মার্কা ছবি করেছ, আবার অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছ। কিছু খাওয়াও।’ কথাটা মোটেই পছন্দ হয়নি মণিদার। আরও একবার টিপ্পনী করতেই সোজা উত্তর, ‘ডু ইউ নো মাই লেফ্‌ট হুক?’ বলেই, এককালে বক্সিং শেখা মণিদা এক ঘুসিতে সাংবাদিকের নাকমুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল। টেবিল, চেয়ার সব তছনছ। কাণ্ডটা ঘটিয়েই প্রথম কথা, ‘ল্যাডলী ভাই, ট্যাক্সি ধর।’ পরের দিন অবশ্য সেই কাগজে বড় বড় করে খবর বেরল, ‘সাংবাদিক নিগৃহীত।’ ভাবুন কাণ্ডটা!‌ এরকম খুচরো কারণে বেশ কয়েকবার জেলে যেতে হয়েছে মণিদাকে।

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় (ডান দিকে)।

তারপর হয়তো কোনও ছবির কাজ চলছে। অভিনেতার অভিনয় পছন্দ হচ্ছে না মণিদার। দু’ তিনবার ভালভাবে বলেও যদি কাজ না হয়, ওমনি চিৎকার চেঁচামেচি, আর তার সঙ্গে পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করে ছুড়ে মারত মণিদা। একবার, ৪৫ ডিগ্রি গরমে বোলপুরে দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ নামে এক ধারাবাহিকের শুটিং চলছে। আমি ছিলাম সহকারী। সাধুর ভূমিকায় যে ছেলেটি অভিনয় করছে সে কিছুতেই ঠিকঠাক কাজটা করে উঠতে পারছে না। বেশ কয়েকটা টেক-এর পর ভয়ানক রেগে গিয়ে মণিদা বলল, ‘ল্যাডলী, টেকটা তুই নে।’ আমি ক্যামেরায় জুম ইন করে দেখি বেচারা ছেলেটির হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। শেষে আমি বললাম, মণিদা তুমি এই জায়গা থেকেই সরে যাও।

একবার আর এন মুখার্জি রোড দিয়ে হাঁটছি দু’জন। তখন তো ফিল্মের যুগ। ফিল্ম স্টকের জন্য রাইটার্স বিল্ডিং থেকে পারমিশন নিতে হত। ওরকমই কিছু করে আমরা ফিরছি। মণিদা ‘ট্যাক্সি’ বলে চেঁচালেও সেটা পাত্তা না দিয়ে চলে যাচ্ছিল। এবার চার অক্ষরের একটা বাছাই ‘ভাষা’ দিয়ে ডাকতেই ক্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে গেল একটা ট্যাক্সিটা। তখন অ্যাম্বাস্যাডর ট্যাক্সির একটা স্টার্টার থাকত, ‘এস’ বলা হত। এস অক্ষরের মতো একটা লোহার রড। সেটা নিয়ে ট্যাক্সির ড্রাইভার তো উলটে গালাগাল করতে করতে তেড়ে এল। আমি ভাবছি এ যদি আমায় ধরে তো আমি শেষ, একেবারে আছাড় মেরে শেষ করে দেবে। পাশে তাকিয়ে দেখি মণিদা হাওয়া। বেগতিক দেখে আমি এমন ভাব করতে লাগলাম যেন আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ। যে গালাগাল করেছিল তাঁকে চিনিই না। ভাগ্যক্রমে মারধর না খেয়ে স্টিফেন হাউজের কাছ থেকে নাকতলার বাস ধরব ভাবছি (আমার তখন ট্যাক্সি চড়ার মতো আর্থিক ক্ষমতা ছিল না)। হঠাৎ দেখি ওই স্টিফেন হাউজের লিফটম্যানের সঙ্গে গল্প করছে মণিদা। সে খইনি ডলছে আর মণিদা পায়ে তাল দিয়ে কী সব ভোজপুরি গান শোনাচ্ছে। আমায় দেখে কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বলল, ‘ট্যাক্সি ছাড়, আমরা বাসে যাব।’

গাড়িতে গান শোনার সেই বিচিত্র অভ্যাস:‌ বিভিন্ন ফিল্মের শুটিংয়ে বা রেইকিতে যখন যেতাম, সেখানে সবাই জানত গাড়িতে অবশ্যই গান শোনার বন্দোবস্ত থাকতে হবে। কারণ ডিরেক্টর (গৌতম চট্টোপাধ্যায়) গান ছাড়া গাড়িতে চড়েন না। তখন তো ক্যাসেট চলত, আর মণিদা নিজে বাড়ি থেকে পছন্দসই ক্যাসেট নিয়ে আসত। একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লাগত, হয়তো কোনও গান অর্ধেক শেষ অবস্থায় কোনও ব্রিজে উঠছি আমরা, মণিদা গাড়ি ব্যাক করিয়ে নিয়ে যেতেন এবং আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গানটা আবার পছন্দসই জায়গা থেকে চালাত। যাতে ব্রিজের ওপর গাড়িটা চলা অবস্থায় গানটার বিশেষ অংশ চলতে পারে। মণিদার কথায়, এটা তাকে আলাদা অনুভূতি দিত।

মণিদার রাজনৈতিক মতাদর্শ, এ সময়ে বেঁচে থাকলে কী অবস্থান নিতেন।

এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কী করত মণিদা:‌ প্রবলভাবে বামপন্থী। নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় জেলেও যেতে হয়েছে। বামপন্থী মানে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ‘অফিসিয়াল’ বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ছিল মণিদা। এখন বেঁচে থাকলে নিঃসন্দেহে হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন না তাতে আমি নিশ্চিত। নিশ্চয়ই মানুষের পক্ষে কথা বলতেন। কিন্তু কোন ফর্ম-এ, সক্রিয় আন্দোলন নাকি শিল্পের মাধ্যমে সচেতনতা দিয়ে ময়দানে নামতেন সেটা আমি বলতে পারব না। কিছু একটা করতেনই সেটা নিয়ে আমি আশাবাদী।