প্রিয়ম সেনগুপ্ত: পেশাসূত্রে আলাপ হয়েছিল পাকিস্তানি ক্রিকেটের এক কিংবদন্তির সঙ্গে। সাংবাদিকদের একটু এড়িয়েই চলতেন ভদ্রলোক। আমার প্রাক্তন প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কলমচি হওয়ার সুবাদে এই প্রতিবেদকের সৌভাগ্য হয়েছিল বেশ কয়েকবার কাছাকাছি যাওয়ার। এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে হচ্ছিল ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনালের কথা। মনে আছে তো, সেই যে অজয় জাদেজা ওয়াকার ইউনিসকে বীভৎস ঠেঙালেন, আমির সোহেলকে বোল্ড করে ভারতের বেঙ্কটেশপ্রসাদ তেড়ে গেলেন অঙ্গভঙ্গি করতে করতে.‌.‌.‌ সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণা করতে করতেই প্রশ্ন তুলেছিলাম, ‘বিশ্বকাপ ছেড়েই দিন, আগে এমনি কোনও ছোট টুর্নামেন্টে ভারতের ম্যাচ থাকলেও রাস্তাঘাটে লোকচলাচল কমে যেত। সকাল থেকে একটা কী হবে কী হবে মার্কা উত্তেজনা গ্রাস করতো গোটা দেশকে। এখন আর সেই উত্তেজনাটা দেখা যায় না কেন?‌’‌ কিংবদন্তি সেই অলরাউন্ডার মুচকি হেসে যা বলেছিলেন, তার সারমর্ম হল, মহেন্দ্র সিং‌ ধোনি, বিরাট কোহলিরা নিঃসন্দেহে বিরাট বড় তারকা। কিন্তু তুমি যে সময়টার কথা বলছো, সেই সময়ে দলের প্রত্যেকটি ক্রিকেটারই একটি করে ‘‌ক্যারেক্টার’‌ ছিলেন। এদিকে অনিল কুম্বলে ভাঙা চোয়াল নিয়ে বল করে দিচ্ছেন, ওদিকে মুলতান টেস্টে পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে দাঁত চেপা লড়াইতে একা কুম্ভ হয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছেন শচীন, আবার অন্যদিকে ম্যাচ জিতে লর্ডসের বারান্দা থেকে টি–শার্ট ওড়াচ্ছেন সৌরভ গাঙ্গুলি। মোদ্দা কথাটা হল, ‘‌ক্যারেক্টার’‌!‌ যে ক্যারেক্টার শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। তবেই তো নিছক সমর্থন থেকে ব্যাপারটা গণউন্মাদনায় রূপান্তরিত হবে। দু’‌–একজন ছাড়া ভারতীয় দলে এখন আর সেরকম ক্যারেক্টার কই?‌ সেরকম ‘‌ক্যারিশমা’‌–ই বা কই?‌
‘‌ক্যারেক্টার’
এবং
‘‌ক্যারিশমা’‌‌!‌
এই দু’‌টি শব্দের অবতারণার জন্য এত দীর্ঘ স্মৃতিরোমন্থন করতে হল। রূপম ইসলামের একক এই দু’‌টি বিশেষণ ছাড়া বোধহয় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাঁর একক অনুষ্ঠান মানেই ‘‌পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ’‌, সে কথা নতুন নয়। তা যতই ৮ জুন শহরের দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলুক এবং জামাইষষ্ঠী থাকুক। কিন্তু যে গণউন্মাদনা এই অনুষ্ঠানগুলোতে ধারাবাহিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সেটা শুধুই প্রতিভা, উৎকর্ষ, সুগায়কী— এসব চেনা ছকের বিশেষণে ব্যাখ্যা করলে সত্যের অপলাপ হবে। বাংলা গানে (শুধু ‌বাংলা ব্যান্ড নয়)‌ রূপম নিঃসন্দেহে একটি ক্যারেক্টার। এবং তাঁর ক্যারিশমা তর্কাতীত। সেটা মেনে না নিলে একের পর এক এককের ধারাবাহিক সাফল্যকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি রূপম আসলে নিপুণ এক কথকও বটে। যিনি নিজের জীবনের গল্প বলেন, নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলেন। কখনও গান গেয়ে, কখনও আড্ডা মেরে কখনও স্রেফ চিৎকার করে। কখন যে সেই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, কথা, চিৎকার, আফশোস, দীর্ঘশ্বাস গানের মধ্যে চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে, চালু মিম্‌–এর ভাষায় বলতে গেলে ‘‌ধরতে পারবেন না।’‌ রূপম সেটা পারেন বলেই ৮ জুন সিএলটি অবনমহলের অনুষ্ঠানে এমন ১৯ গানের ‘‌সেটলিস্ট’‌ নিয়ে আসার সাহস করেন, যার সাড়ে সতেরোটিই অপ্রকাশিত। প্রকাশিত বলতে ‘‌ভূত আর তিলোত্তমা’‌ (‌দশ বছর আগে প্রকাশিত)‌। এছাড়া ‘২৩ আগস্ট’ শীর্ষক গানটি রূপম গেয়েছিলেন ‘‌আরওটিআর’‌–নামে একটি রেডিও অনুষ্ঠানে। তাও ওইরকমই বছর দশেক আগেই।
রূপম বরাবরই ‘‌দাবি’‌ করে থাকেন, ‘‌একক বড়ই বোরিং অনুষ্ঠান।’ দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখে তো তেমনটা মনে হল না। একেবারে নতুন ‘‌মৌসুমী’‌ গান  দিয়ে শুরু করলেন রূপম। তাঁর গানবাজনার শিক্ষার ভিত যে ভারতীয় ধ্রুপদীসঙ্গীত, সেটার স্পষ্ট ছাপ পাওয়া গেল ‘মৌসুমী’-তেও। এরপর একে একে ‘‌খুকী’‌, ‘‌স্বাগতম বর্ষাকাল’‌, ‘‌মহানগরের কিনারে’‌। রূপম সাধারণত একক অনুষ্ঠানে ফসিল্‌সের কোনও গান গাইতে চান না। দু’‌–একবার ‘‌মানববোমা’‌, ‘‌মিলেনিয়াম’‌ গেয়েছেন ঠিকই, তবে সেটা বিরল ব্যাপারই বটে। তবে এদিন গাইলেন ‘‌ভূত আর তিলোত্তমা’‌। রূপম গাইলেন?‌ বলা ভুল। তাঁর গলার চেয়ে দর্শকদের গলা মেলানোর শব্দই যেন বেশি জোরে শোনা গেল। দেখেশুনে মনে হতেই পারে, বেছে বেছে অপ্রকাশিত ‘‌অখ্যাত’‌ গানগুলোই এককে গেয়ে ঠিকই করেন রূপম। অপ্রকাশিত গানের লিরিই যদি এভাবে সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে যায় দর্শকদের মধ্যে, তাহলে প্রকাশিত–পরিচিত গান গাইতে শুরু করলে কী হবে!‌
যে রূপমকে গায়ক হিসেবে চেনা যায়, দেখা যায়, তার বাইরে কথক রূপমের পরিচিতির কথাও বলেছিলাম একটু আগে। সেসবের পাশাপাশি রূপম যেন একজন রেডিও জকি। যিনি দস্তুরমতো জানেন, গল্প বলার সময় স্বরপ্রক্ষেপণের মাহাত্ম্য অনুষ্ঠানকে কোন উচ্চতায় তুলে দিতে পারে!‌ যে আলতো আদর দিয়ে দিয়ে তিনি ‘‌বেড়ে গেছে তাই দূরত্ব’‌ উচ্চারণ করেন, তার সমান ও বিপরীত আক্রোশ আছড়ে পড়ে ‘‌বন্দিনী বাংলাভাষা’‌–র ‘‌এটা কি বাংলা গান হচ্ছে নাকি’–র‌ গর্জনে। এই নাটকীয়তা, এই আচমকা পট পরিবর্তনই রূপম এককের অন্যতম আকর্ষণ। শো–এর আগে ফেসবুক লাইভে রূপম বলেছিলেন, ‌এককে কী হয়, সেটা অনেক শ্রোতাই জানেন না। যেটা রূপম বলেননি, সেটা হল, গানেরও তো একটা গল্প থাকে। সেই গল্পের পিছনের গল্পের ব্যাখ্যা তিনি করে থাকেন এককে। জীবনের নানা ওঠাপড়া, টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে যেভাবে ‘‌গানের জন্ম’‌ হয়েছে রূপমের কলমে, রূপম সেই কাহিনীই একে একে খোলসা করেন একক অনুষ্ঠানে। সেই কারণেই প্রতিটি গান এবং তার অনুষঙ্গকে পূর্ণ সততার সঙ্গে ‘‌রিলেট’‌ করতে পারেন শ্রোতারা। ফলে রূপমের যাবতীয় অবরভাষ্য (‌গোদা বাংলায় খিস্তি)‌, চিৎকৃত অভিযোগ ভীষণই যুক্তিগ্রাহ্য এবং ‘‌বেশ করেছে’‌ বলে মনে হয়।
শো–এর প্রথমার্ধ রূপম কাটিয়েছেন অনেকটাই দুলকি চালে। কারণ গান সাজানোর ক্ষেত্রে কী করে শ্রোতাদের উস্কানি দিয়ে যেতে হয়, সেটা তিনি ভালভাবেই জানেন। বারবার শুনতে চাইছেন শ্রোতারা কী শুনতে চাইছেন। কিন্তু বেশিরভাগ গানই এড়িয়ে চলেছেন, তুলে রাখছেন একটু পরে গাইবেন বলে। শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে দিলেন, এটাও বোধহয় রূপমের ‘‌অতিবেগুনি চালাকি’‌। তবে বিরতির আগে পরপর ‘আদমের সন্তান’‌, ‘‌রেডিও জকি’‌, ‘‌বাংলাদেশ’‌ গেয়ে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন, সেকেন্ড ইনিংসের রানরেট বাড়িয়ে হাতখুলেই খেলবেন।
এবং খেললেনও। ‘‌বন্দিনী বাংলাভাষা’‌‌, ‘‌এখনও তোমায় দেখানো বাকি’‌ এবং প্রকাশিতব্য ‘‌দেওয়ালি পি’‌ গাইলেন পরপর। মঞ্চ থেকে রূপম খেয়াল করলেন কি না জানা নেই, দেওয়ালি পি–র অংশ হিসেবে যখন তিনি গাইলেন ‘‌আমরা আসলে যন্ত্রণা প্রজাতির ছেলে’‌, দর্শকাসনে একদম সামনে বসে থাকা সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র লাফিয়ে উঠে হাততালি দিয়ে ফেললেন। একইরকম চমৎকৃত অনুষ্ঠানে হাজির শিলাজিৎ মজুমদার, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, অরিন্দম শীলরা। দেওয়ালি পি গাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে যখন মার্কিন সফরের স্মৃতিচারণ করছিলেন রূপম, ফসিল্‌সেরই সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত থাকা দীপ ঘোষ, অ্যালান তেমজেন, তন্ময় দাসরা দর্শকাসন থেকেই মত বিনিময় করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, এটাই তাঁদের দেখা সেরা রূপম একক। রূপম নিজেও হয়তো সেটা উপলব্ধি করেছেন। না হলে মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম প্রধান ঘোড়া প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসের বহর দেখে কেন রূপম বলবেন, ‘‌বুলাদা (‌প্রদীপ)‌ যখন মেজাজে চলে আসেন, তখন বুঝতে হবে অনুষ্ঠানটায় কিছু একটা হচ্ছে।’‌ সেরা ‌কিনা সেটা তর্কযোগ্য। তবে অন্যতম সেরা তো বটেই। যেভাবে গান তৈরির প্রেক্ষাপটকে, নিজের জীবন কাহিনীকে ‘‌পারফর্মেন্স’‌–এর সঙ্গে সুচারুভাবে মিশিয়েছেন রূপম, হয়ে উঠেছেন নিপুণ কথক, তেমনটা সম্প্রতিতে দেখা যায়নি। না হলে কেনই বা শো ফেরত শিলাজিৎ ফেসবুকে লিখবেন, ‘‌মাঝখানে দশ মিনিট বিরতি ছাড়া ঘণ্টা দু’‌য়েক সারাক্ষণ মন দিয়ে গান শুনিনি । দেখিওনি। শরীর দিয়ে, হৃদয় দিয়ে, শুনেছি দেখেছি। সারাক্ষণ শরীর দুলছিল আমার।’‌
 ‘‌উদাসী আমার সারাদিন’‌–এর পরেই তিনি গাইলেন সেই বিখ্যাত ‘‌২৩ আগস্ট’‌। যা একসময় রূপমের ভিন্নধর্মী গান ‘মনে করে নাও’ হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিল রূপম সেটা একটি এমএম চ্যানেলের অনুষ্ঠানে গাওয়ার পরে। ‘‌ক্ষুধার্ত মাংসাশী’‌ যা রূপম এককের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত। এবং এবারও দেখা গেল সেই চেনা ছবি। রূপমের গলা ছাপিয়ে গোটা অডিটোরিয়ামে গমগম করছে শ্রোতাদের কণ্ঠ। তাঁরাও গাইছেন রূপমের সঙ্গে। খেয়াল করিয়ে দেওয়া যাক, এটাও কিন্তু অপ্রকাশিত গানই। এমনকী, গানের মধ্যে যখন রূপম কথা ভুলে যাচ্ছেন, শ্রোতারাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁকে। যে প্রসঙ্গে শিলাজিৎ লিখেছেন, ‘‌নিজের লেখা লিরিক ভুলছিল বারবার। সরি বলছিল বারবার। আমার ওর সরিগুলো গানের অংশ মনে হচ্ছিল। শুধু আমার না। গোটা প্রেক্ষাগৃহের সমস্ত শ্রোতাদেরও।’‌ অপ্রকাশিত গানের লিরিক কীভাবে কেউ গায়কের চেয়ে ভাল মুখস্থ রাখতে পারেন?‌ নিউটাউন থেকে আসা শ্রোতা সায়নদীপ বললেন, ‘‌আমি প্রতি এককেই ডাইরি নিয়ে আসি। শুনে শুনে লিখে রাখি।’‌ হাতিবাগান থেকে আসা অভিষেক চট্টোপাধ্যায় আবার বললেন, ‘‌শুনেশুনেই মুখস্থ হয়ে গেছে।’‌ শেষ গান ‘‌আমি যাই’‌। গোটা অডিটোরিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে গলা মেলাচ্ছে, শিশুর মতো উচ্ছ্বাস দেখিয়ে হাততালি দিচ্ছেন দেবজ্যোতি— অথচ এই ‘‌আমি যাই’‌–কেই নাকি রূপম একসময় তাঁর নিয়মিত সেটলিস্টে রাখতেন না!‌
অনেকগুলো দাবি কিন্তু এই একক অনুষ্ঠান থেকেই উঠে গেছে। রূপম জানিয়েছেন, তিনি নির্দিষ্ট বিরতিতে ধারাবাহিকভাবে একক অনুষ্ঠান করবেন। শো ফেরৎ দর্শকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে যা বোঝা গেল, বেশ কিছু পুরনো গান শোনার পক্ষেও কিন্তু তাঁরা সওয়াল করছেন। ‘‌তোমার চোখের কালো চাই’‌, ‘‌জোয়ান অফ আর্ক’‌, ‘‌যদি তোমায় বলি’‌–র মতো গানগুলো। দাবি উঠছে, ফসিল্‌সের যে সমস্ত গান মঞ্চে গাওয়া হয় না, তারও দু’‌–একটা (‌মানববোমা, শাস্তি, মহাকাশ, ইতস্তত)‌ গাওয়া হোক।
রূপম যতই ব্যক্তিগত পরিসরে একক অনুষ্ঠানকে ‘‌বোরিং, আসবেন না’‌ বলে দাগিয়ে দিন না কেন, সিএলটি অবনমহলের এককের পর থেকে কিন্তু নতুন করে প্রত্যাশার পারদ চড়তে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একক সংক্রান্ত আলোচনা চোখে পড়ছে আগের চেয়েও আরও বেশি করে। দাবি উঠছে নতুন ইনিংসে নতুন করে রূপম মাঠে নামুন, স্টান্স নিন নতুন করে।
রূপম শুনতে পাচ্ছেন তো?
ছবি – কুণাল বোস