শেখর দুবে: ভারতের সবচেয়ে বড় হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক দল সিপিআইএম। আদর্শগতভাবে দুই মেরুতে রয়েছে সিপিএম ও আরএসএস। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটি সবসময় নিজেদের অরাজনৈতিক দাবি করে এসেছে। সিপিএম সেখানে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দল।

কিন্তু শুধুই কি অমিল? ভারতীয় রাজনীতিতে চরম বিরোধী দুটো সংগঠনের মিলও রয়েছে প্রচুর। সংগঠন দুটির গঠনতন্ত্রের মিল অবাক করবে অনেকেই।

কী কী মিল রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টির? তুলনার শুরুটা বোধহয় পার্টি হোলটাইমার পদটিকে দিয়েই হওয়া উচিৎ। সিপিএম দলটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ‘সর্বক্ষণের কর্মী’ বা পার্টি হোলটাইমার। এই কর্মীরা অন্য কোনও পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না। দলের নিদের্শ মতো দেশের যে কোনও প্রান্তে সংগঠনের কাজ করেন। পার্টি থেকে প্রতি মাসে একটা ভাতাও পান এই ফুলটাইমাররা। একইভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের ‘‌ফুলটাইমার’‌ পদ হল ‘প্রচারক’। যাঁরা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটির নির্দেশ মতো সারা দেশের যে কোনও প্রান্তে কাজ করেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক অরিজিৎ ভট্টাচার্য বললেন, ‘গঠন পদ্ধতির বেশ কিছুটা পার্থক্য হয়ত রয়েছে। কিন্তু আরএসএস এবং সিপিএমের সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তৃণমূলস্তর থেকে ধাপে ধাপে উপরের দিকে ক্ষমতার বিন্যাস।’

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের তৃণমূল স্তরে কাজ করা এক নেতা নিউজপোলকে জানান, সংঘের মূল দুটি ভাগ রয়েছে, প্রথমত শাখাভিত্তিক, দ্বিতীয়ত সংগঠনভিত্তিক। আরএসএসের শাখার প্রধান হলেন মুখ্যশিক্ষক। ইনিই ঠিক করেন শাখায় কী পড়ানো হবে বা কোন ধরনের শারীরিক কসরত করানো হবে। এরপর থাকেন একজন শাখা কার্যবাহ, যিনি শাখার পরিচালনার বিষয়টি দেখেন। শাখার সর্বশেষ স্তর হল গঠনায়ক। এবং এই পদটির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সংঘের শাখায় সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার দায়িত্ব এর উপরই ন্যস্ত থাকে৷ সাংগঠনিক ভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রধান সর সংঘচালক। তারপর থাকেন বেশকিছু সংঘচালক এবং ক্রমান্বয়ে কার্যবাহ ও প্রচারক। এইরকম সুষ্ঠু সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টি ছাড়া অন্য সংগঠনে খুব একটা চোখে পড়ে না।

সিপিএমের সংগঠনের সর্বোচ্চ স্তর পলিটব্যুরো। যেখানে কিছু সদস্য এবং ‘‌ইনভাইটি’‌ থাকেন। যার প্রধান হলেন, সাধারণ সম্পাদক। এরপর সেন্ট্রাল কনট্রোল কমিশন। এই কমিশন মূলত সেন্ট্রাল কমিটির মাঝের সাংগঠনিক ভাগ। সেন্ট্রাল কমিটির পর রাজ্যভিত্তিক কমিটি থাকে। এর প্রধান হলেন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক। রাজ্যস্তরেও আরও বেশ কয়েকটি ভাগ রয়েছে ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টির। কিন্তু রাজ্য কমিটির পরে প্রধান তিনটি ভাগ হল জেলা কমিটি, জোনাল কমিটি ও এরিয়া কমিটি। একজন বামপন্থীকে লোকাল কমিটির সদস্যপদ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সংগঠনের উপরের স্তরে যেতে হয়।

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক অরিজিৎ ভট্টাচার্য আরএসএস ও সিপিএমের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রশংসা করে বলেন, ‘দেশের এই দুটি সংগঠনের গঠনতন্ত্র চমকপ্রদ। বিজেপি কিংবা সিপিএম দেশের শাসন ক্ষমতায় সবসময় থাকে না। তা সত্ত্বেও চমৎকার সাংগঠনিক দক্ষতায় নিজেদের আদর্শকে তৃণমূলস্তরে জীবিত রাখে আরএসএস-সিপিএম। এখানেই আর পাঁচটা দলের সঙ্গে ওদের পার্থক্য।’‌

গ্রাফিক্স- কুণাল বোস