নিলোভনা চক্রবর্তী, শেখর দুবে:‌ জন্ম কলকাতায়। কর্মও কলকাতায়। অথচ সেই সংস্থাই যখন কর্মী নিয়োগ করছে, বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট লিখে দিচ্ছে, বাঙালিরা আবেদন করতে পারবেন না। চাকরি পাবেন একমাত্র অবাঙালিরাই। হিন্দুস্থান ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড একটি নিয়োগ সংস্থার ওয়েবসাইটে এই বিজ্ঞাপন দেয়। নিরাপত্তা আধিকারিক পদের জন্য কর্মী নিয়োগ করার কথা বলা হয়েছিল ডানকুনি শাখায়। এই বিজ্ঞপ্তি নিয়ে শুরু হয়েছিল তীব্র বিতর্ক। নিউজপোলের তরফে যোগাযোগ করা হলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিশদে কথা বলতে বাধ্য নন সংস্থার আধিকারিকরা। পরে অবশ্য চাপের মুখে বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেয় সংস্থাটি।

হিন্দুস্থান ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড মূলত রেলের বগি, ড্রাফট গিয়ার, সাইড ফ্রেম তৈরি করে। পাটজাত দ্রব্যও তৈরি করে। সদর দফতর কলকাতার ২৭ নম্বর আর এন মুখার্জি রোডের মোদী বিল্ডিং। প্রথম কারখানাটি তৈরি হয়েছিল দক্ষিণ কলকাতার তিলজলায়। ১৯৪৭ সালে। এখন তিলজলা, হুগলির বামুনারি, বৈদ্যবাটি, হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সংস্থার বিভিন্ন কারখানা। সেই সংস্থাই নিজেদের ডানকুনি কারখানার জন্য সিকিউরিটি অফিসার নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। তাতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে, অবাঙালিরাই একমাত্র এই পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন?‌
বাংলায় থেকে, বাংলায় কাজ করে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবাঙালি?‌ বাঙালি–বিদ্বেষ নয় কি? ‌
সংস্থার রিসেপশনিস্ট সেকথা মানতে চাননি। সংস্থায় ফোন করা হয়েছিল। ফোন ধরেন এক পুরুষ কর্মী। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের সংস্থা বিভিন্ন পদে বহু সংখ্যক বাঙালি কাজ করেন। এই বিশেষ পদের জন্যই অবাঙালি এক জনকে চাওয়া হয়েছে। কেন?‌ তা তিনি বলতে বাধ্য নন। সাফ জানিয়ে দেন, এই নিয়ে কোনও আলোচনাও করতে চান না। ভাষার সমস্যার কারণে অবাঙালি নিয়োগ করা হবে?‌ বাঙালিরা তো দিব্যি বাংলার বাইরে কাজ করছেন। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু থেকে ভোপাল— কোথায় নেই বাঙালি। দক্ষিণ ভারতেও দাপিয়ে কাজ করছেন তাঁরা। এমনকী বিদেশেও। তাহলে ভাষার সমস্যা তো হওয়ার কথা নয়?‌ আর বাংলায় দাঁড়িয়ে একজন বাঙালির ভাষার সমস্যা হওয়ার কথাও নয়। তাহলে কেন নেওয়া হবে না বাঙালিদের?‌
এসব প্রশ্ন করা হলে প্রথমবার ফোনটা কেটে দেন সেই কর্মী। তার আগে জানান, এই নিয়ে আলোচনা করা হবে না। কার সঙ্গে কথা বললে উত্তর মিলবে, তাও বলেননি। আসলে উত্তর দেওয়ার মতো যদিও কিছু নেই। কারণ এ ধরনের শর্ত দিয়ে নিয়োগ সংবিধান বিরোধী। দ্বিতীয়বার ফের ফোন করা হয় সংস্থায়। তখন একের পর এক মোট তিন জন কর্মীর কাছে কলটি ফরোয়ার্ড করা হয়। এক জনও নিজের নাম বা পরিচয় দিতে চাননি। শেষ ব্যক্তি একটাই কথা বলেছেন, বিজ্ঞাপনটি নাকি ভুলবশত ওই সাইটে দেওয়া হয়েছিল। এখন তুলে নেওয়া হয়। তাহলে কি এখন বাঙালিরাও ওই পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন?‌ তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, অবশ্যই পারবেন।

এই সংস্থার চেয়ারম্যান শ্রী রাজেন্দ্রপ্রসাদ মোদী। ডিরেক্টর বিক্রমআদিত্য মোদী। বোর্ড অফ ডিরেক্টর মোট সাত জন। তাঁদের মধ্যে মাত্র দু’‌জন বাঙালি। সেই সমীকরণ কি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?‌ প্রথমবার ফোন যিনি ধরেছিলেন, তিনি মানতে চাননি। হিন্দুস্থান ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইন্ডিস্ট্রিজ লিমিটেড–এ নাকি বহু বাঙালি কাজ করেন। সত্যিই করেন কি না, কীভাবে জানা যাবে?‌ যথারীতি উত্তর নেই।