তমাল পাল: মদ্যপান নিয়ে বাঙালির মাতামাতি কম নয়। আর এই সুরাবিলাসের অনেকটা বড় অংশ জুড়ে ছিল চায়না টাউনের পানশালাগুলি। কিন্তু ক্রমশ ‘‌শুকিয়ে যাচ্ছে’‌ ট্যাংরা–তোপসিয়া এলাকার এই সোমরসের উৎস। কারণ একটাই, পুঁজির অভাব। দু’‌বছর আগেও পানশালার লাইসেন্স পুনর্নবীকরণের জন্য দিতে হতো বছরে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা। আচমকাই বেড়ে গিয়েছে এই খরচ। বর্তমানে বছরে সেই অঙ্কটা দাঁড়িয়েছে পাঁচ লক্ষে!‌ যে ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা নেই এই এলাকার বেশ কয়েকটা মাঝারি মাপের রেস্তোরাঁগুলির। অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখতে মদ বিক্রিই বন্ধ করে দিয়েছে ছ’‌টি পানশালা। সেগুলি এখন পরিণত হয়েছে সাদামাটা রেস্তোরাঁয়
১৭৯৮ সালের পর থেকেই চীনা ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত কলকাতায় আসতে থাকেন এবং ঘাঁটি গাড়েন ট্যাংরা অঞ্চলের। প্রথমে চিনির ব্যবসা দিয়ে শুরু হলেও, পরে চামড়া শিল্পে মন দেন তাঁরা। আরও পরে নব্বইয়ের দশকে তাঁরা শুরু করেন পানশালার ব্যবসা। সুরাপ্রেমিকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে চায়না টাউন। সেই থেকে চীনা হোটেল–রেস্তোরাঁ বংশপরম্পরায় এগিয়ে চলছিল। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ‘চায়না টাউন’ এলাকায় যে সব পানশালা–রেস্তোরাঁগুলি রয়েছে তার কয়েকটি একেবারেই মদ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে কয়েকটি আবার কয়েকটিতে মদ পাওয়া যাচ্ছে মাঝেমাঝে। মদ বিক্রি একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে যে পানশালাগুলিতে, সেগুলির মধ্যে রয়েছে কিংফা, কিংজিং, ফুলরার, এভারগ্রিন, চুং। নিয়মিত মদ বিক্রি করতে পারে না যে পানশালাগুলি, তাদের মধ্যে অন্যতম সিমচা। এই পানশালার ম্যানেজার সুরাজ সিং বলছেন, ‘এখানে এমনও কিছু পানশালা আছে, যেখানে বছরের লাইসেন্স শেষ হলে, পুনর্নবীকরণের টাকা না থাকায়, মাঝে মাঝেই মদ পাওয়া যায় না। সেই সময়টা শুধু খাবার পাওয়া যায়। আবার যখন পানশালার লাইসেন্স পুনর্নবীকরণের টাকা জোগার করা সম্ভব হয়, তখন আবার মদ বিক্রি হয়। এখানে বেশিরভাগ পানশালা কিন্তু এভাবেই চলছে। অনেক পানশালা বন্ধও হয়ে গেছে।’‌ সুরাপ্রেমীরা জেনে হতাশ হবেন, এই এলাকায় পানশালার ব্যবসার উন্নতি নিয়ে আশাবাদী নন কর্মীরা নিজেরাই। অনেকেই বলছেন, এভাবে চললে অন্যত্র কাজ দেখতে হবে।
আবগারি দফতর থেকে জানানো হয়, ‘দু’বছর আগে একটি পানশালার বার্ষিক লাইসেন্স পুনর্নবীকরণের খরচ ছিল ৫০ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা কিন্তু বর্তমানে সেই খরচ এখন দশগুন বেড়ে গেছে।’‌ তবে শুধুই খরচ নয়, কারণ আরও আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি রেস্তোরাঁর নিরাপত্তারক্ষী জানালেন, ‘‌যখন এখানে সকলে পানশালার ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তখন এই এলাকায় সুরাপ্রেমীদের একমাত্র গন্তব্য ছিল চায়না টাউনই। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, বাইপাস লাগোয়া আশপাশের অঞ্চলে আরও কতগুলি পানশালা বিগত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে। একেবারে বড় রাস্তার ওপরে হওয়ায় মানুষের পক্ষে সেই পানশালাগুলোতে যাওয়াই সুবিধার। তাছাড়া ওই পানশালাগুলিতে অনেক জায়গাতেই মহিলাদের দিয়ে অশ্লীল নাচ–গান করানো হয়। এখানে সেসব হয় না।‌শুধু অশ্লীল নাচ–গানই নয়, ওই পানশালাগুলিতে অবাধে দেহব্যবসাও চলে। দেহব্যবসার লভ্যাংশ ঢোকে পানশালা মালিকদের পকেটে। ফলে লাভও বেশি হয়।’ গড়গড় করে অনেকটাই বলে থামলেন ওই নিরাপত্তাকর্মী। যেটা বললেন না, সেটা অবশ্য বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। এভাবে চললে চায়না টাউনের আয়ুও আর খুব বেশিদিন নয়।