নিউজপোল ডেস্ক: রীতিমতো লেঠেল সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হত তাঁকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কার্যকলাপে খেপে উঠেছিল উচ্চবর্ণের বাঙালি সমাজ। লেঠেলের ব্যবস্থা অবশ্য করেছিলেন তাঁর বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বীরসিংহ গ্রামের জেলে সর্দার শ্রীমন্তকে পাঠিয়েছিলেন ছেলের ‘বডিগার্ড’ হিসেবে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাহাড়প্রমাণ চেহারার শ্রীমন্ত গ্রামের সেরা লেঠেল হলেও, মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই লাজুক। কথিত আছে, তিনি বিদ্যাসাগরকে অনুরোধ করতেন তাঁকে ‘ছিমন্ত’-এর (শ্রীমন্ত) বদলে ‘ছিরি’ (শ্রী) বলে ডাকতে। নাহলে নাকি লজ্জা করত তাঁর।
কিন্তু ঠিক কোন অপরাধে খুনের চেষ্টা বিদ্যাসাগরকে? তৎকালীন হিন্দু সমাজের হোমরাচোমরাদের মতে, সে এক বিষম অপরাধ। তিনি বিধবাবিবাহের আইন পাশ করিয়েছেন। এর আগে আরেক বাঙালি এইসব হিন্দুদের সংস্কৃতিকে ‘মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল’ সতীদাহ বন্ধ করে। এরপর নাকি বিধবাদের বিয়ে হবে? কোনওভাবেই মানতে পারেননি বিদ্বজনেরা। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শাস্ত্র নিয়ে তর্কে নেমেছিলেন ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন, কাশীনাথ তর্কালঙ্কার, রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত, জগদীশ্বর বিদ্যারত্ন, জানকীজীবন ন্যায়রত্ন, মহেশচন্দ্র চূড়ামণি, গোবিন্দকান্ত বিদ্যাভূষণ, আনন্দচন্দ্র শিরোমণি-র মতো গোঁড়া পণ্ডিতেরা। এঁদের সঙ্গে তর্কে জিতে ব্রিটিশ সরকারকে দিয়ে ১৮৫৫ সালের ২৬ জুলাই বিদ্যাসাগর পাশ করালেন ‘হিন্দু উইডোজ রি-ম্যারেজ অ্যাক্ট’। তখন তাঁর বয়স ৩৬।
এর আগে হিন্দু বিধবাদের জীবনটা ঠিক কী রকম ছিল? তাঁদের বয়স হত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, স্বামীদের বয়স ৬০-৭০-এর কোঠায়। স্বামীর মৃত্যুর পরই বন্ধ হয়ে যেত তাঁদের সাধ-আহ্লাদ। মাথা ন্যাড়া, সাজপোশাক বলতে পাড়হীন সাদা থান। একাদশী করবে, মাছ-মাংস খাবে না, এমনকী শরীর গরম করে এরকম কোনও নিরামিষ খাবারও খাবে না। বেশিরভাগ দিনই উপোস। ঘরের কোণে পড়ে থেকে সংসারের কাজ করবে উদয়াস্ত। কেন এই বিধান? ব্রাহ্মণরা বলেছেন, ‘হিন্দুশাস্ত্রে’ নাকি বলা রয়েছে এরকমই।
খুনের চেষ্টার পাশাপাশি পণ্ডিতেরা নামলেন বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে বিদ্রূপমূলক অপপ্রচারে। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত গান লিখলেন, ‘এমন সুখের দিন কবে হবে বল লো কবে হবে বল/ এতদিনে যাবে যত বিপক্ষের বল দিদি বিপক্ষের বল/ বাধিয়াছে দলাদলি লাগিয়াছে গোল/ বিধবার বিয়ে হবে, বাজিয়াছে ঢোল।’ তাঁকে কটাক্ষ করে লেখা পালায় কবি দাশরথি রায় লিখেছিলেন, ‘ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামক/ তিনি কর্তা বাঙালির/ তাতে আবার কোম্পানির/ হিন্দু কলেজের অধ্যাপক।’
শহরের কিছু প্রভাবশালী এবং পণ্ডিত লোকজন শান্তিপুরের তাঁতিদের দিয়ে বোনালেন বিশেষ ধরনের শাড়ি। ‘বিদ্যাসাগর পেড়ে শাড়ি’ নামক এই শাড়ির পাড়ে লেখা থাকত বিধবাবিবাহ বিরোধী ছড়া, যেমন, ‘আর কেন ভাবিস লো সই, ঈশ্বর দিয়েছেন সই/ বিধবা রমণীর বিয়ের লেগে যাবে ধুম।’ সেকালের ছড়া এবং একালের মূর্তিভাঙা, কে বলে হারানো সময় ফিরে আসে না?