মানসী রায়:‌ প্রতিটি মানুষই তার বাহ্যিক দর্শনে, আচরণে, শিক্ষায়, বুদ্ধিমত্তায়, বিবেচনায় এবং চিন্তাভাবনায় আরেকটি মানুষের চেয়ে আলাদা। এই স্বতন্ত্রতার অন্য নামই ব্যক্তিসত্তা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের এই ব্যক্তিসত্তা বা স্বতন্ত্রতা তর্ক-বিতর্কের মতো জমি পেলে চারাগাছ থেকে মহীরূহ হয়ে উঠতে বেশি সময় নেয় না। কারণ তর্ক এমন একটি মাধ্যম যেখানে অংশগ্রহণকারীরা সকলেই জয়লাভ করতে চান এবং সেই জয়লাভের এক ও একমাত্র উপায় হল নিজের বক্তব্য বা অবস্থানের পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি সহ প্রমাণিত তথ্য উপস্থাপন করা। বলাই বাহুল্য, এমন পরিস্থিতিতে মানুষের পক্ষে একশো ভাগ নিরপেক্ষ থাকা প্রায় অসম্ভব। তখন সে তার স্বপক্ষে এমন যুক্তি সাজাতে থাকে বা এমন তথ্যপ্রমাণ তুলে আনে, যা পক্ষপাতদুষ্ট, অর্থাৎ সে কোনও বিষয়ের কেবল সেই দিকটিই তুলে ধরে যেটা তার জ্ঞান, বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনু্যায়ী সঠিক এবং ইতিবাচক। বিষয়ের অন্যান্য দিকগুলি সে কোনওরকম কারণ ছাড়াই অস্বীকার করতে থাকে। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় মানুষের এই বিশেষ প্রবণতাটির নাম ‘কনফার্মেশন বায়াস’, বাংলায় যাকে একপেশে চিন্তাধারা বলে উল্লেখ করা হয়।

এই প্রবণতার দরুণ মানুষ যেহেতু কোনও বিষয় বা ঘটনা সংক্রান্ত অন্য সমস্ত মত বা যুক্তিকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র তার নিজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশলব্ধ বিচার বিবেচনা অনুযায়ী কোনও একটি মত বা যুক্তিকেই আঁকড়ে ধরে থাকে। সেজন্য অনেক সময়েই তা মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক চিন্তার প্রক্রিয়া, মতদান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। শৈশব থেকেই একজন মানুষ তার চারপাশে যা দেখে, শুনে, শিখে এবং বুঝে বড় হয়, সেই সমস্ত কিছুই পরবর্তীকালে সে অভ্রান্ত বলে মনে করতে থাকে। মানুষের মন বা মস্তিষ্ক বস্তুতঃ একটি নানা ধরনের নির্দিষ্ট জ্ঞানের জটিল ঘেরাটোপ। সে কদাচিৎ সেখান থেকে বের হতে চায় এবং ফলস্বরূপ মাথার ভেতরে জন্ম দেয় জোরালো ‘‌কনফার্মেশন বায়াস’‌–এর। কোনও মতবাদ বা প্রমাণ বা নিদর্শন যত স্পষ্টই হোক, সেটা যদি তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়, সেই জ্ঞান সে প্রত্যাখ্যান করে। আবার, যদি উল্টোটা হয়, অর্থাৎ কোনও মতবাদ, প্রমাণ বা নিদর্শন যদি দুর্বল অথচ তার বিশ্বাসকে সমর্থন করে, সে সেই জ্ঞান নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে।

মানুষের মধ্যে কনফার্মেশন বায়াস তৈরি হওয়ার একটি দ্বিতীয় কারণও রয়েছে, যেটা শুরুতেই উল্লিখিত। মানুষ কোনও পরিস্থিতিতেই পরাজিত হতে চায় না। সে হেরে যেতে ভয় পায়। তাই পরাজয় এড়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টাও তার চিন্তাধারাকে একপেশে করে তুলতে পারে। কোনও রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সম্প্রদায়, ধর্মাচরণ, খেলোয়াড়, অভিনেতা, দেশ- এসবের প্রতি আলাদা আলাদা এবং দলগত মানুষের যে ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব বা প্রতিক্রিয়া, তা মূলত তাদের কনফার্মেশন বায়াসেরই প্রতিফলন।

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কোনও না কোনও কনফার্মেশন বায়াস বর্তমান। তবে তা মানুষ বিশেষে কম বেশি হতে পারে। অল্পস্বল্প কনফার্মেশন বায়াস স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তা কারুর মধ্যে বেশিমাত্রায় তৈরি হয়ে গেলে তা নিজের সঙ্গে প্রতারণারই নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে সমাজে তার একলা হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে। যেমন, কোনও মাদকাসক্ত ব্যক্তি সেই মাদকেরই অংশবিশেষ কোনও ওষুধের প্রয়োজনীয় উপাদান— এই অজুহাত দেখিয়ে যদি নিজের মাদক সেবনকে সমর্থন করতে শুরু করে দেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি অতিমাত্রায় কনফার্মেশন বায়াসের শিকার।

কনফার্মেশন বায়াসের সবচেয়ে ক্ষতিকর উদাহরণ হল কুসংস্কারের প্রতি মানুষের অন্ধবিশ্বাস। বেড়ালের গাড়ি চলাচলের রাস্তা পার হওয়ার কথাই ধরা যাক। বেড়াল রাস্তা পেরোনোর ঠিক পরেই গাড়ি নিয়ে সেই রাস্তায় গেলে দুর্ঘটনা ঘটে- এটি একটি প্রচলিত কুসংস্কার। বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গাড়ির চালক মাত্রেই এই কুসংস্কারটি মেনে চলেন। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ভয় সংক্রান্ত কনফার্মেশন বায়াসটি কোনও একজনের কাকতালীয় ভাবে ঘটা দুর্ঘটনার সূত্র ধরে সহজেই একজনের থেকে অন্যজনে চালিত হয়ে গেছে। প্রায় কেউই সাহস করে এই প্রথা ভেঙে দেখতে চান না যে বেড়ালের রাস্তা পার হওয়ার সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি না।

ব্যবসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এই ধরনের কনফার্মেশন বায়াস লক্ষ্য করা যায়। যে ব্যবসার প্রতি তাদের আগে থেকেই ইতিবাচক ধারণা থাকে সেই ব্যবসাতেই সচরাচর তাঁ্রা বিনিয়োগ করেন যার ফল সবসময় লাভজনক হয় না। এছাড়াও, কোনও পরিসাংখ্যনিক জরিপ কেবলমাত্র প্রশ্নের দোষে কনফার্মেশন বায়াসের শিকার হতে পারে। অবশ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে কনফার্মেশন বায়াস খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে, মানুষের এই সহজাত প্রবণতা তার মাথার মধ্যে শিকড় গেড়ে বসলেও চেষ্টা করলে তা দূর করা সম্ভব। অন্যের মতামতকে তলিয়ে ভাবলে, আবেগের চাইতে যুক্তিবোধকে এগিয়ে রাখলে, ভিন্নমতের লোকজনের সঙ্গে ভাব বিনিময় করলে কনফার্মেশন বায়াস কাটিয়ে ওঠা যায়। তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন নিজের নির্দিষ্ট ধারণা বা বিশ্বাসটিকে ভুল প্রমাণের চেষ্টায় অন্যের কাছ থেকে সেটি যাচাই করে নেওয়া।