শুভময় মল্লিক:‌ আর মাত্র কয়েকদিন। এরপরেই এবছরের মতো শেষ হতে চলেছে বিশ্বের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আইপিএল। বিনোদনে ঠাসা এই লিগ শুরু হওয়ার আগে দেখা যায়, নিলামে দেশি–বিদেশি বহু আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো কিনে নিচ্ছে। এমনকী, ঘরোয়া ক্রিকেটের কিছু অখ্যাত ক্রিকেটারদেরও অনেক সময় বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নেওয়া হয়। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এত টাকা কোথা থেকে আসে? এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্রিকেটার, ম্যানেজমেন্ট, কোচদের দেওয়ার পরেও কি তাদের হাতে কিছু অবশিষ্ট থাকে? হ্যাঁ থাকে। টিম হারুক বা জিতুক লাভের অঙ্ক থাকেই, তবে লাভের অঙ্ক কতটা হবে সেটা টিমের জেতা হারার উপরে নির্ভর করে। যে দল যত বেশি ম্যাচ খেলে সেই দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি তত বেশি লাভ করে। অর্থাৎ এবছর প্লে-অফে খেলা চারটি দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি প্লে অফে না খেলা চারটি দলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর থেকে বেশি আয় করবে। সবচেয়ে বেশি আয় করবে ফাইনালে ওঠা দুটো দল। এবার দেখে নেওয়া যাক এই কোটি কোটি টাকা আসে কোথা থেকে ?

১)‌‌ মিডিয়া স্বত্ত্ব:‌ বেশিরভাগ দর্শকই বাড়িতে বসে টিভিতে বা অনলাইনে খেলা দেখে। তাঁরা যে চ্যানেল বা স্ট্রিমারদের মাধ্যমে দেখেন, তারা বিসিসিআইকে টাকা দেয়। বিসিসিআই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে টাকা ভাগ করে দেয়। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের লাভের ৬০-৭০% টাকা আসে সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেল ও অনলাইন স্ট্রিমারদের কাছ থেকে।

২)‌ ব্র্যান্ড স্পনসরশিপ:‌ ক্রিকেটারদের টিম কিট, জার্সি, হোম গ্রাউন্ডের বাউন্ডারির বাইরে ব্যারিকেডে নানারকম ব্র্যান্ডের লোগো লাগানো থাকে। এইভাবে লোগো প্রদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি নিজেদের প্রচার করে। বিনিময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে টাকা দেয়। এছাড়া ব্র্যান্ডগুলোর ইভেন্ট কিংবা টিভি বিজ্ঞাপনে কোনও টিমের এক বা একাধিক প্লেয়ারদের যুক্ত করা হয়। ব্র্যান্ড স্পনসরশিপের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজির মোট লাভের ২০-৩০% অর্থ ঘরে আসে।

৩)‌‌ টিকিট বিক্রি:‌ আমরা হোম ম্যাচের জন্য যে টিকিট কিনি, তার বিক্রয়মূল্যের ৮০% পান হোম ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক। এই টিকিট বিক্রি থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজির মোট লাভের ১০% লাভ হয়। টিকিটের মূল্য ফ্র্যাঞ্চাইজি নির্ধারণ করে। টিকিটের দাম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে শহর, জনসংখ্যা, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদির উপর নির্ভর করে টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়।

৪)‌ প্রাইজ মানি:‌ ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন টিম চেন্নাই সুপারকিংস পেয়েছিল ২০ কোটি টাকা। এই ২০ কোটি টাকা দুই ভাগে ভাগ হয়। ১০ কোটি টাকা ক্রিকেটার ও কোচরা নেন। বাকি দশ কোটি মালিকদের পকেটে যায়। রানার্স দল হায়দ্রাবাদ সানরাইজার্স পেয়েছিল ১২.৫ কোটি টাকা।

৫)‌ মার্চেন্ডাইজ বিক্রি:‌ ১২ বছরে পা দেওয়া আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজির মোট লাভের ৫% মার্চেন্ডাইজ বিক্রি থেকে আসে। বিশ্বের জনপ্রিয় ফুটবল লিগগুলোর তুলনায় এটা অনেকটাই কম। তবে মাত্র ১১ বছর পূর্ণ করেছে আইপিএল এবং দিনদিন এই মার্চেন্ডাইজ বিক্রির পরিমাণ বাড়ছে। আর দশ বারো বছর পরে আশা করা যায় অনেকটাই বেড়ে যাবে বিক্রি।

৬)‌ বিসিসিআই সেন্ট্রাল পুল:‌ বিসিসিআই আইপিএলের অফিশিয়াল স্পনসরশিপ ও পার্টনারশিপ বাবদ অর্থ দেয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে। লিগ টেবিলে যে টিম যত উপরে থাকে সেই টিমকে তত বেশি পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়।

৭)‌ স্টলভাড়া:‌ স্টেডিয়ামের বাইরে কিছু খাবার ও পানীয়ের স্টল থাকে। এই স্টলগুলো বসাতে হলেও হোম ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ভাড়া দিতে হয়।

৮)‌ প্লেয়ার ট্রেডিং:‌ প্রতি বছর আইপিএলের আগে ট্রান্সফার উইন্ডো খোলা হয়। অনেক সময় পরিবর্তিত নতুন প্লেয়ারটির দাম পুরোনো প্লেয়ারের চেয়ে অনেক কম হয়। সেক্ষেত্রে বাকি টাকা চলে যায় টিম মালিকদের পকেটে।

৯)‌ নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রচার:‌ ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের নিজেদের অন্য এক বা একাধিক কোম্পানি থাকে। সেই কোম্পানির প্রচার আইপিএল চলাকালীন একইসাথে সেরে ফেলা যায়। লাভের উৎসগুলো জানা গেল, কিন্তু এক একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি কত টাকা লাভ করে এটা না জানলে কৌতুহল মেটে না। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, ২০১৮ সালে প্রতিটি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কম করে ৭৫ কোটি টাকা লাভ করেছে। কয়েকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি তো ১০০ থেকে ১২৫ কোটি পর্যন্তও আয় করেছে