মৌমিতা ভট্টাচার্য কর: ‌নিছকই আর পাঁচটা শখের মতো এই শখ। কিন্তু তা সবকিছুর চেয়ে একটু আলাদা। কারণ এই শখের জোরেই রুখে দেওয়া যায় বড় বড় অপরাধ। গোটা বিশ্ব জুড়েই এই শখ অনেকেই লালন করেন। যা পরিচিত হ্যাম রেডিও বা অ্যামেচার ক্লাব নামে। এই নামটার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। তার কারণ সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই এই হ্যাম রেডিওর খবর আমাদের চোখে পড়ে। ভবঘুরে বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই আসল কাজ এই হ্যাম রেডিওর।
সোদপুরের রেলওয়ে পার্কের কাছে হলুদ রঙের বাড়িতে চলে এই হ্যাম রেডিওর কার্যকলাপ।
২০১০ সালে অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের হাত ধরে এ রাজ্য হ্যাম রেডিওর সঙ্গে পরিচিত হয়। কী এই হ্যাম রেডিও? ‌এ প্রসঙ্গে অম্বরীশ জানান, ‘‌নিখোঁজদের খুঁজে দেওয়াটা একটা বিশ্বব্যাপী শখ। যার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে লাগে। এই প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে রেডিও যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক টেলিকমের অন্তর্ভুক্ত এই হ্যাম রেডিওর জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে, যা প্রত্যেককে মেনে চলতে হয়। প্রশিক্ষণের পর হয় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আইবির বিদেশ দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত হয়। এরপরই হ্যাম রেডিওর কাজ শুরু হয়ে যায়।’‌ অ্যামেচার ক্লাবের উদ্যোক্তা জানান, এই রেডিওর মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনও জায়গায় যোগাযোগ করা যেতে পারে। এটা এমনই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যা ট্র‌্যাক করা যায় না। তবে এর অপব্যবহার যাতে কেউ না করে তার জন্য সর্বদাই তাদের ওপর নজরদারি চলছে আইবি–র। অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে যখন অশান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন বিমল গুরুং গা ঢাকা দিয়ে বসে ছিলেন। কিন্তু তিনি গোপনে এই হ্যাম রেডিও–র মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখছিলেন নিজের সঙ্গীদের সঙ্গে। সেটা ধরা পড়ে যায় আমাদের ফ্রিকোয়েন্সিতে। আমরা পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তা রুখে দিয়েছিলাম।’‌ এরকম বহু দেশবিরোধী কাজ, অবৈধ রেডিও স্টেশন ধরা পড়েছে হ্যাম রেডিওর মাধ্যমে। জানা গিয়েছে, মোবাইলের টাওয়ার না থাকলে ব্যহত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু রেডিও যোগাযোগের ক্ষেত্রে তা নয়। এখানে শব্দ তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যায়।

অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের সঙ্গে হ্যাম রেডিওর সদস্যরা

এখন অম্বরীশদের মূল লক্ষ্য নিখোঁজ–ভবঘুরেদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া। এই কাজই তাঁরা করে চলেছেন নিরন্তর। ২০১৮ সালে কাটিহারের নিখোঁজ যুবককে পরিবারের হাতে তুলে দেয় হ্যাম, ওই বছরই ডায়মন্ডহারবার হাসপাতাল থেকে অসামের এক যুবতীকে উদ্ধার করেন তাঁরা। তিনবছর ওই যুবতী নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে যান। সম্প্রতি কেরলের বন্যায় আটকে গিয়েছিলেন মূর্শিদাবাদের ছয় যুবক। সেখানেও ত্রাতা হয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন অম্বরীশের হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। উদ্ধার করা হয় তাঁদের। এরকম বহু কাজ তাঁরা করে চলেছে প্রতিদিন।
অম্বরীশ জানান, তাঁরা তাঁদের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই কাজগুলি করেন। তবে নিঁখোজদের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি তাঁরা প্রয়োগ করেন, তা অত্যন্ত গোপন। তবে তাঁদের সব ভাষা জানা লোক আছেন, তাঁরাই নিখোঁজদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে কিছুটা সাহায্য করেন। তবে এতকিছুর পরও রাজ্য সরকারের প্রতি ক্ষোভ রয়েছে হ্যাম রেডিওর। তিনি বলেন, ‘‌রাজ্য সরকারকে বলেছিলাম অ্যামেচার রেডিওকে স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু বহু টালবাহানার পরও তা আজও বাস্তবে পরিণত হয়নি। অথচ অন্ধ্রপ্রদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে চন্দ্রবাবু নাইডু নিজে খুশি হয়ে আমাদের দাবি মেনে স্কুলের পাঠ্যক্রমে অ্যামেচার রেডিওকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।’‌ বিপর্যয়ের সময় সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন ব্যহত হয়ে পড়ে, তখন একমাত্র হ্যামই ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। প্রসঙ্গত, এ বছরের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের যে সব জায়গায় মোবাইল পরিষেবা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল, সেখানে দুর্দান্ত কাজ করে দেখিয়েছে হ্যাম রেডিও। অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের কথায়, হ্যাম রেডিও অনেক কাজই করতে পারে, কিন্তু এত দায়িত্ব কাঁধে কেন নেব?‌ যেখানে সরকারই আমাদের পাশে নেই।