অভিনন্দন রানা: হ্যাট-ট্রিক। সোজা কথায় পর পর তিনবার একই কাজ করতে পারলে তাই হল হ্যাটট্রিক। ক্রিকেট মাঠে,  পর পর তিনটি বলে উইকেট পেলে সেটা হয় হ্যাটট্রিক, ফুটবলে তিনটি গোল একই ম্যাচে করলে সেটা হয় হ্যাটট্রিক। তাহলে ভোটের ময়দানে পর পর একই কাজ তিনবার করলে তা কেন হ্যাটট্রিক হবে না? আলবাৎ হবে, হতেই হবে। তো চলুন দেখি কোন কোন মহারথী আজ হ্যাটট্রিক করলেন, বা একটুর জন্য, জাস্ট একটুর জন্য মিস করলেন।

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়: তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা এবং সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের প্রায় প্রাক লগ্ন থেকেই দলে রয়েছেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত কাছের ও ভরসার মানুষ বলেই পরিচিত। বিগত লোকসভাতে দলের চিফ হুইপও ছিলেন। ১৯৮৭-৯১, ৯১-৯৬ এবং ১৯৯৬-৯৮ সাল পর্যন্ত বউবাজার থেকে বিধায়ক ছিলেন কংগ্রেসের টিকিটে। তৃণমূলের টিকিটে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম (বর্তমানে বিলুপ্ত) কেন্দ্র থেকে ১৯৯৮-৯৯, ১৯৯৯-০৪ পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন। পরবর্তীতে আবার তৃণমূলের টিকিটে ২০০৯-১৪, ২০১৪-১৯ এবং বর্তমান বছরে কলকাতা উত্তর কেন্দ্র থেকে জিতে জয়ের হ্যাটট্রিক করলেন।

হুমায়ুন কবির।

যদি পারফর্মেন্স ভাল হয় তাহলে দলবদলের সময় ভাল দর পাওয়া যায়, আর হ্যাটট্রিক যদি থাকে একাধিক ঝোলায়, তাহলে আপনি তো এই বাজারের চ্যাম্পিয়ন। আমাদের পরের জন কিন্তু সত্যিই চ্যাম্প, চলুন জেনে নিই তাঁর ব্যাপারে-

হুমায়ুন কবির: মুর্শিদাবাদের এই নেতা কিন্তু সত্যিই দল বদলে চ্যাম্পিয়ন। প্রথমে কংগ্রেস, তারপরে তৃণমূল, একবার নির্দল হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অবশেষে এখন বিজেপিতে। তবে এবার আসি হ্যাটট্রিকের কথায়। ২০১১ সালে রেজিনগর থেকে কংগ্রেসের টিকিটে বিধায়ক হন। তারপর দল বদলে তৃণমূলে, কিন্তু না, দল বদলে আসেনি সাফল্য। সেই প্রথম হার। তারপর তৃণমূল ছেড়ে নির্দল হয়ে দাঁড়ান ২০১৬ সালের বিধানসভায়। শিকে ছেঁড়েনি। এবার বিজেপির টিকিটেও হল না। হয়েই গেল হারের হ্যাটট্রিক।

এরপর যাঁর নাম করব তিনিও পদ্মফুলের প্রার্থী, আর তাঁরও হ্যাটট্রিকও হারের।

রাহুল সিনহা।

বিশ্বজিৎ সিনহা: অচেনা লাগছে? না, অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। চলুন একটু জানি তাঁকে নিয়ে। গত তিনটি নির্বাচনের কথা জানব চলুন, ২০০৯ সালে বাঁকুড়া থেকে দাঁড়ান তিনি, ২০১৪ লোকসভায় প্রার্থী হন উত্তর কলকাতা থেকে, আবারও ২০১৬তে বিধানসভা নির্বাচনে লড়েন জোড়াসাঁকো কেন্দ্র থেকে। নাহ, শিকে ছেঁড়েনি একবারও এবারও সেই ট্র্যাডিশন বজায় রাখলেন তিনি।ও হ্যাঁ, নামটাই তো বলা হয়নি, ইনি শ্রী রাহুল সিনহা, বিজেপির প্রাক্তন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় সম্পাদক।

এখনও অবধি যাদের নাম করলাম সকলেই কিন্তু পোড়খাওয়া রাজনৈতিক নেতা। এবার আসি রুপোলি পর্দায়। রুপোলি পর্দার মানুষও যে রাজনীতিতে সফল হতে পারেন তার উদাহরণ ইনি।

শতাব্দী রায়।

শতাব্দী রায়: হ্যাঁ, শতাব্দী রায়। ২০০৯ সাল থেকে টানা বীরভূমের সাংসদ ইনি। এবারও সেই জয়ের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে করে ফেললেন হ্যাটট্রিক। আর বলতে হবে কোন দলের?

সৌগত রায়।

সৌগত রায়: সৌগত রায়, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতাও কিন্তু দমদম কেন্দ্র থেকে পরপর ৩ বার জয়ী হলেন। ২০০৯, ২০১৪’র পর এবারও জিতে সম্পূর্ণ করলেন তাঁর হ্যাটট্রিক।

এতক্ষণ অবধি যাদের নাম করেছি, জয়ীরা সকলেই তৃণমূল কংগ্রেসের, আর পরাজিতরা বিজেপির। এছাড়াও দেশের সর্বপ্রাচীন দলের অস্তিত্বটুকু যিনি টিকিয়ে রেখেছেন তাঁর কথা না বললেই নয়।

অধীররঞ্জন চৌধুরী।

অধীররঞ্জন চৌধুরী: পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি, বাংলায় কংগ্রেসের পোস্টার বয় এবং মুর্শিদাবাদের এককালের বেতাজ বাদশা অধীর চৌধুরী। প্রথমবার সংসদে যান ১৯৯৯ সালে, এবং তার পর থেকে টানা নির্বাচিত হয়ে চলেছেন। মাঝে রেল প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর সেই রেকর্ড অক্ষুণ্ণই থাকল। বরং বলতে গেলে ডাবল হ্যাটট্রিক করে ফেললেন।

আমাদের পরের রাজনীতিক আরেক কংগ্রেস নেত্রী, তিনি আর কেউ নন দীপা দাশমুন্সি।

দীপা দাশমুন্সি।

দীপা দাশমুন্সি: প্রয়াত কংগ্রেস নেতা, এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির স্ত্রী দীপা দাশমুন্সি। প্রিয়রঞ্জন মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে কোমাতে চলে যাওয়ার পর ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে জয়ী হন রায়গঞ্জ আসন থেকে। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) এর মহম্মদ সেলিমের কাছে অল্প কিছু ভোটে পরাজিত হন। এরপর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর বিধানসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যান। এই নির্বাচনেও আবার রায়গঞ্জ থেকে হেরে হারের হ্যাটট্রিকটি করেই ফেললেন।

বাংলার রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছে আর তাতে সিপিআইএম থাকবে না তা হতে পারে? তাই এই প্রতিবেদন শেষ করব এক সিপিআই (এম) নেত্রীকে দিয়ে-

নন্দিনী মুখোপাধ্যায়।

নন্দিনী মুখোপাধ্যায়: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ডঃ নন্দিনী মুখোপাধ্যায় প্রথমবার নির্বাচনে প্রার্থী হন ২০১১ সালের বিধানসভা উপ নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে জিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধানসভার সদস্য হন। ফলাফল বলে বিড়ম্বনা বাড়ানো অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে করছি। তারপর ২০১৪ লোকসভাতেও দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা থেকে প্রার্থী হন, কিন্তু জনগণ প্রসন্ন হননি, এবারও তিনি প্রার্থী। যাদবপুরের অধ্যাপিকা কিন্তু নিজে আবারও ফেল করে হ্যাটট্রিকটি সম্পূর্ণ করলেন।