ময়ুরী দত্ত: অন্ধকার দুনিয়া, মাফিয়া ডনের জীবন— বারবার উঠে এসেছে রুপোলি পর্দার উপাদান হিসেবে। আর যে মাফিয়া ডনের জীবন সিনেমার পর্দায় সবচেয়ে বেশিবার দেখা গিয়েছে, সে আর কেউ নয়, পাবলো এস্কোবার। কলম্বিয়ার কুখ্যাত এই ড্রাগ মাফিয়াকে নিয়ে বহু ফিল্ম, ডক্যুমেন্টারি, মুভি সিরিজ তৈরি হয়েছে। এমনকী, বর্তমানে নেটফ্লিক্সে যে ‘‌নার্কোস’‌ সিরিজ চলে, তারও নেপথ্যপুরুষই এস্কোবারই। কেউ তাকে মনে করেন, কুখ্যাত অপরাধী, কেউ আবার মনে করেন ‘‌রবিনহুড’‌।
যাকে নিয়ে এত উন্মাদনা, কলম্বিয়ার ‘গরীবের রাজা’ সেই পাবলো এস্কোবার কি সত্যিই মনেপ্রাণে ‘রবিনহুড’ ছিল? নাকি তার পিছনে ছিল কোনও গভীর অভিসন্ধি?‌

দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার অবুরা উপত্যকার মাঝে পাহাড়ি এক ছোট্ট শহর মেডেলিনে জন্ম হয়েছিল এস্কোবারের। ৮০-র দশকে গড়ে ওঠা মেডেলিনে ১২হাজার দরিদ্র মানুষের বাস। পাবলো এস্কোবার স্থানীয় মানুষের জন্য ইঁটের বাড়ি, জল, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, স্কুলের বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। প্রায় এক দশক ধরে খুব গরীব যারা, তাদের বাড়ি ভাড়াও মিটিয়ে দিয়েছিল। কৃতজ্ঞতাবশক স্হানীয় জনতা তাই এই অঞ্চলের নাম রাখে ‘ব্যারিও পাবলো এস্কোবার’।

অনেকেই মনে করেন, যেহেতু পাবলো নিজে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছিল, তাই বোধহয় সে গরিব মানুষের সুখদুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতো। ১৯৪৯ এর ১ ডিসেম্বর কলম্বিয়ার রিওনেগ্রোয় এক দরিদ্র চাষীর ঘরে জন্ম নেয় পাবলো এমিলিও এস্কোবার গভিরিয়া। কৈশোরেই সপরিবারে এসে মেডেলিনে বসবাস শুরু করে সে। মা শিক্ষিকা হলেও, দারিদ্রের সঙ্গে যুদ্ধে হারতে বসা পরিবারের পাবলো ছোটবেলাতেই কোটিপতি ও দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। পড়াশোনাও বেশিদূর এগোয়নি। মাঝপথে ছেদ পড়ে যায়। তাই, চটজলদি উপায় হিসেবে সে বেছে নেয় অপরাধজগতকে।
শুরুতে গাড়ি চুরি, লটারির জাল টিকিট বিক্রি করতে করতে একসময় সে হয়ে যায় স্থানীয় গ্যাংস্টারদের দেহরক্ষী। ১৯৭০–এ শুরু করে অপহরণের কাজ। স্থানীয় এক সরকারি আধিকারিককে অপহরণ করে ১ লক্ষ মার্কিন ডলার হস্তগত করে মেডেলিনের অপরাধীদের কাছে নায়ক হয়ে ওঠে পাবলো।
কলম্বিয়ায় তখন সদ্য কোকেন ব্যবসা শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর চাহিদা তখন তুঙ্গে, এবং কলম্বিয়ার সাথে যোগাযোগপথও সহজ। পাবলো বুঝতে পারল, কোকেন পাচারই তার কোটিপতি হবার মুখ্য রাস্তা হতে পারে।
প্রথম প্রথম সে অল্প পরিমাণ কোকেন দিয়ে পাচারের ব্যবসা শুরু করল। ১৯৭৫ সালে বলিভিয়া থেকে কোকা পেস্ট আমদানি করে ভাইয়ের সঙ্গে কোকেন তৈরি শুরু করে সে। ছোট ছোট প্লেনের চাকার মধ্যে কোকেন ভরে পাচার করতো। ৮০–র দশকে আনুমানিক ৭০-৮০ টন কোকেন পাচার করে সে।  তার তৈরী ‘মেদেয়িন বার্টেনা’ নামে মাদক নেটওয়ার্কটি রাজনীতিবিদ, বিচারক, পুলিশের কর্মকর্তা হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল প্রত্যক্ষভাবে।


৮০-৯০ এর দশকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মাদক ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। কোকেন পাচারের খাতিরে প্রতিবার ৫লক্ষ ডলার মূল্যের কোকেন পাচার করলে বিমানবন্দরের অফিসারদের প্রায় ৩লক্ষ ডলার ঘুষ দিতে হত। বেশি লাভের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ল বেশি পরিমাণ কোকেন পাচারের।
মাসখানেক পরই মেডেলিনের কোকেন ব্যবসার প্রধান ফ্যাবিও রেস্ত্রেপো–কে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে পাবলো। তখনই তার নামের পাশে জুড়ে যায় ‘দ্য গডফাদার’ খেতাব।
১৯৮০ সালে কোকেনের দাম হঠাৎ কমে গিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে চাহিদা বৃদ্ধি পেল। এখানেই বড় চাল চালল পাবলো। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, পুলিশ অফিসার, স্থানীয় কর্মকর্তাদের কিনে নিল ঘুষ দিয়ে। তৈরি হল বিশাল একটা নেটওয়ার্ক।
এই সময় পাবলো বুঝতে পারে, শুধুমাত্র ভয় দেখিয়ে বা ঘুষ দিয়ে খুব বেশিদিন কার্যসিদ্ধি করা যায় না। এই সময় থেকেই সে সুপরিকল্পিতভাবে নিজের ‘‌রবিনহুড’‌ ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। তখন কলম্বিয়ায় চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রবল দুর্নীতি। রাজনীতিবিদেরা গরিবদের কোনও সুযোগসুবিধা দিতেন না, শুধুমাত্র তাঁদের ব্যবহার করতেন। এই সুযোগ হাতছাড়া করেনি পাবলো। কপর্দকশূন্য গরিবের কাছে ভাল ডাকাত হয়ে উঠল সে। তাই, তার তৈরি করা এই ‘রবিনহুড’ ইমেজ মেডেলিনে স্থায়ী প্রভাব রেখেছিল। বিশেষত, দরিদ্ররা কৃতজ্ঞতাবশত তাকে পবিত্র ব্যক্তি রূপেই বিবেচনা করতেন।

তাতে লাভও হয়েছিল। একেবারেই আর্থিক লাভ। ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীন এস্কোবার ছিল বিশ্বের সপ্তম সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তি। তার জনপ্রিয়তার কারণে ১৯৮২ সালে সে কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্খায় বাধা হয়ে দাঁড়ান কলম্বিয়ার তৎকালীন আইনমন্ত্রী রদ্রিগো লারা বনিলা। পাবলোর সব অপকর্ম ও আয়ের উৎস সম্পর্কে কংগ্রেসকে ওয়াকিবহাল করেন। তাই কংগ্রেসের সদস্যপদ পাবার দু’‌বছরের মধ্যেই তাকে দল বহিষ্কার করে। প্রেসিডেন্ট হবার স্বপ্ন ঘুচে যায়। যদিও ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে রদ্রিগোকে খুন করতে বিলম্ব করেনি পাবলো। নিজের প্রয়োজনে কোনও কর্তাব্যক্তি ঘুষ না নিলে গুলি করে প্রাণে মারতো সে। কারণ তার স্ট্র্যাটেজিই ছিল ‘প্লাতা ও প্লোমো’ অর্থাৎ ‘টাকা অথবা সীসার বুলেট’। শত্রুতালিকাও ছিল দীর্ঘ। প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, নেতা, বিচারক থেকে শুরু করে আমজনতা।
শুধুমাত্র তার বিরুদ্ধে তথ্য দিতে পারেন, এমন এক ব্যক্তিকে খুন করতে একটি বিমানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় পাবলো। তাতে প্রায় শতাধিক মানুষ মারা যান। এখানেই থামেনি পাবলো। পাবলোর নির্দেশে শতাধিক বিচারক গুলিতে মারা যান, আগুন ধরানো হয় কাগজপত্রে, পাবলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের সমস্ত রেকর্ড পুড়ে যায়। পাবলো অফিসারদের বিশাল অঙ্ক ঘুষ দিতে থাকে।
তবে চিরদিন কারও সমান যায় না। আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল তাকে। তবে তার আগে সে যে শর্ত দিয়েছিল, সেই শর্তানুসারে তারই তৈরি করা ‘লা কাতেদরাল’ কারাগারে বন্দী করা হয় তাকে। নাইটক্লাব, ফুটবলের মাঠ, ঝরনা, টেলিভিশন, টেলিফোন, ফ্যাক্সের সুব্যবস্থাযুক্ত এই কারাগারকে যদিও জেল না বলে প্রাসাদই বলা চলে। কিন্তু পাবলো এখানে বসেও অবাধে কোকেন ব্যবসা চালিয়ে যায়। কিছুদিন এখানে থাকার পরে পালিয়ে যায় সে। সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। কিন্তু নিজের কিছু লোকেদের বিশ্বাসঘাতকতায় তার ডেরা ফাঁস হয়ে যায়। ছোটবেলায় স্থির করা দ্বিতীয় স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যই তাঁর জীবনে ঘনিয়ে আনল অমোঘ মৃত্যু। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ব্যারিও শহরে এক উঁচু ছাদ থেকে পালাতে গিয়ে কানে গুলি লেগে কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায় সে। তারিখটা ছিল ১৯৯৩ সালের ২ ডিসেম্বর। যদিও তার পরিবারের দাবি, পাবলোই ওই গুলি চালিয়ে আত্মঘাতী হয়েছিল। কারণ, সে নাকি বলতো, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মরার চেয়ে নিজে গুলি করে মরা অনেক ভাল।

তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা অন্ধকারজগতের সঙ্গে আদ্যোপান্ত জড়িয়ে ছিল। মেয়ের শৈশবে একবার শীতের রাতে ফায়ারপ্লেসের কাঠ শেষ হয়ে যাওয়ায়, ঘর গরম করতে আস্ত একটা টাকার বান্ডিলই আগুনে ধরিয়ে ফেলেছিল সে। কাঠ খুঁজতে যদি দেরি হয়, তাই এই ব্যবস্থা। পরিবারের সবার সামনে সেদিন আগুনে পুড়ল ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! ভাই রবার্তো এস্কোবার তার টাকার হিসেব রাখতো। ভাইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাবলোর সম্পত্তির পরিমাণের মূল্য ছিল ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাকার বান্ডিল রাবার ব্যান্ডে বেঁধে রাখতেই খরচ হত প্রতিমাসে ২৫০০ডলার। ৭০০০ একর জমিতে প্রাসাদ ছিল তার, যেখানে তৈরি করেন ছোট চিড়িয়াখানাও। পাবলোর ১৪২টি প্লেন, ২০টি হেলিকপ্টার, ৩২টি প্রমোদতরী এবং ১৪১টি অফিসের সঙ্গে চিড়িয়াখানাটিও সরকারের অধীনে আসে। চিড়িয়াখানাটি এখনও চালু আছে।

‘রবিনহুড’ রূপে গরিবের কাছে জনপ্রিয়তা পেলেও, তার কলঙ্কের ইতিহাস থেকে মুছবে না। তাই, একদিকে গরিবেরা যেমন তাঁর আত্মার স্বর্গসুখ কামনা করতেন, অপরদিকে, তাঁর ভয়ে তটস্থ মানুষেরা তাঁর মৃত্যুতে ভগবানকে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলেন নি।