দেবশ্রুতি চক্রবর্তী:‌ ‌‘আচ্ছা, ‌আপনার ওই হাতের গুলি কি সত্যিই সতেরো?’‌‌—‘সেভেনটিন অ্যান্ড হাফ।’
—‘বাবাহ!‌’
—‘দেখুন.‌.‌.‌ ফিল করুন।’
৭০ বছর বয়সেও টানটান পেশিবহুল চেহারা। বলিষ্ঠ শরীরটার দিকে তাকালে সেই শব্দটাই মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য—‘উহুরিবাবা’। ঠিক যেমনটা চল্লিশ বছর আগে তাঁর নিরেট বাইসেপসে হাত রেখে বলেছিলেন জটায়ু। আসুন, আলাপ করিয়ে দেওয়া যাক মলয় রায়ের সঙ্গে। যাঁকে ফেলুদাপ্রেমীরা চেনেন ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর বডিবিল্ডার গুণময় বাগচী হিসেবে।
ছবির সমস্ত সংলাপ এখনও ঠোঁটস্থ। স্নান সেরে গামছা দিয়ে পিঠ মোছার দৃশ্য, লালমোহন গাঙ্গুলির সঙ্গে হালকা রসিকতা— সবকিছুর স্মৃতিই বলে দিতে পারেন এক নিমেষে। অর্জুন পুরস্কার পেয়েছেন। আটবার জিতেছেন ‘‌মিস্টার ইন্ডিয়া’‌ খেতাব। সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনায় কাজ করেছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্তের মতো দুঁদে অভিনেতাদের সঙ্গে একই দৃশ্যে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করার পরেও কিন্তু নিজেকে একজন আমআদমিই মনে করেন মলয়। হাসতে হাসতে বলে দেন, আমি তো আম আদমিই ছিলাম। সত্যজিৎ রায় আমাকে তারকা করে দিয়েছিলেন।’‌ দীর্ঘদিন ধরেই ডানলপে একটি জিমন্যাসিয়ামে প্রশিক্ষণ দেওয়াই তাঁর পেশা।
মলয় বলছিলেন, ‘‌দেখতে দেখতে চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেল, এখনও বিশ্বাস করতে পারি না, অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করেছি!‌’‌ কিন্তু তারপর কি আর কখনও টলিপাড়া খুঁজেছে গুণময় বাগচীকে? মলয়ের আক্ষেপ, ‘‌কাজের সন্ধানে বেশ কয়েকবার স্টুডিও পাড়ায় গিয়েছিলাম। পরিচালক, প্রযোজকদের সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু ওঁরা খোশামোদি চান। সেসব আমার দ্বারা হয়নি।’‌ আর সন্দীপ রায়? মলয়ের জবাব, ‘‌উনি ব্যস্ত মানুষ, দু’‌–একবার কথা হয়েছিল। তারপরে আমি আর বিরক্ত করিনি।’‌ কথায় কথায় উঠে এল মগনলাল মেঘরাজের কথা। যেন চকচক করে উঠল মলয়ের চোখমুখ। বললেন, ‘‌উৎপল দত্ত তো নিজের শট না থাকলেও প্রায়ই আসতেন সেটে। শ্যুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা দিতেন মানিক জেঠুর সঙ্গে।’‌

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর চিত্রনাট্য আজও আগলে রেখেছেন মলয় রায়

শুধুই কি স্মৃতি?‌ অজস্র সাদা কালো ছবি, জয়বাবা ফেলুনাথের শ্যুটিংয়ে ব্যবহৃত হলুদ নোটবই তো আছেই। আর আছে একটা সাদা ফুলস্কেপ পাতায় লালকালিতে লেখা জয়বাবা ফেলুনাথের একপাতা স্ক্রিপ্ট। যে হাতের লেখা খোদ সত্যজিৎ রায়ের। সে সব দেখাতে দেখাতেই উগরে দিলেন ক্ষোভ। বললেন, ‘‌আরও অনেক ছবি ছিল। অনেকে দেখতে আসত। তাদেরই কেউ কেউ আমার অলক্ষ্যে অনেক ছবি সরিয়ে ফেলেছে। আরো ছবি ছিল, কাদের কখন দেখিয়েছি, সরিয়ে ফেলেছে।’‌ সত্যজিৎ রায়ের কাছে পৌঁছনো থেকে শুরু করে অটোগ্রাফ দেওয়া সবটাই মনে আছে তাঁর। মলয় বললেন, ‘‌সৌমিত্র আমার বাবার (‌বিখ্যাত ব্যায়ামবীর ও প্রথম বাঙালি মিস্টার ইউনিভার্স মনতোষ রায়)‌ কাছে যোগ ব্যায়াম শিখতেন। তিনিই আমার হাত ধরে সত্যজিৎ রায়ের কাছে গিয়েছিলেন। প্রথম দিন ওঁর বাড়িতে ঢুকে দেখেছিলাম চারপাশে একগাদা বইয়ের মধ্যে একটা রকিং চেয়ারে বসে রয়েছেন তিনি।’‌
বাইসেপসের আস্ফালন, ভুরু নাচানো থেকে হাঁ করায় সবকিছুতেই মাসলের গুরুত্ব বোঝানো কিংবা সেই অমর সংলাপ ‘‌এদিকে চারশো ওদিকে চারশো’‌— সব কিছুই মলয়ের স্মৃতিতে তাজা। বলছিলেন, ‘‌আমার দৃশ্যগুলো সবটাই কলকাতার ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে শ্যুট করা হয়েছিল। সন্তোষদাকে কোলে নেওয়ার দৃশ্যটায় চারবার টেক দিতে হয়েছিল। চিত্রনাট্য অনুযায়ী সন্তোষ দত্তকে সোজা কোলে তুলে, চারপাক ঘুরিয়ে ধুপ করে ফেলে দিতে হবে খাটে। এদিকে, সন্তোষদার তো ওজন কম ছিল না। ভুঁড়িও ছিল। আমার হাতের বুড়ো আঙুলটা গেল মচকে। সন্তোষদারও কোমরে চোট লেগেছিল।’‌ আর সিনেমায় যে বলেছিলেন, দাঁত দিয়ে লোহা বেঁকাতে পারেন?‌ প্রশ্নটা করতেই হাসিমুখে মলয়ের জবাব, ‘‌সত্যিই পারতাম।’‌
ডানলপে তাঁর জিমে বসে আলাপচারিতায় সময় যেন টাইমমেশিনে সওয়ার হয়ে পিছনের দিকে ছুটছে। সত্যজিতের স্মৃতিচারণায় মলয় বলে চললেন, ‘‌ওঁর চোখ ছিল এক্স রে মেশিনেক মতো। প্রথম দিন চোখের দিকে তাকাতে পারি নি। মনে হচ্ছিল আমার ভেতরের সব কথা উনি বের করে নিচ্ছেন। আমি বডিবিল্ডিংয়ের মধ্যে বড় হয়েছি, কিন্তু উনি প্রত্যেকটা অঙ্গভঙ্গি এমন নিখুঁত ভাবে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যেন ব্যাপারটা জলভাত।’‌
“কাশীতে এসে তো বিশ্বনাথের দর্শন সবাই পায়, কিন্তু বিশ্বশ্রীর দর্শন পায় কজন?’‌ গুণময় ওরফে মলয়কে বলেছিল ফেলুদা।
বিশ্বশ্রীর দর্শন করতে কাশী যাওয়ার দরকার নেই, সেদিনের জয়বাবা ফেলুনাথের সেটের গুণময় বাগচি আর আজকের বছর সত্তরের ইয়ং ম্যান মলয় রায় এখনও যুব সমাজকে বডিবিল্ডিংয়ে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন বিটি রোডের ডানলপ মোড়ে তাঁর বডিফিট এন্ড মাল্টিজিমে।
সত্তরের প্রবীন, এই বর্ষীয়ান মানুষটি চান যাতে তাঁর এলাকার একজন বেকার যুবকও নেশা না করে, বাজে কাজে লিপ্ত না হয়। তাই আরো বেশি সংখ্যক যুবককে শরীরচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য সরকারের কাছ থেকে সহায়তা আশা করেন সত্যজিতের গুণময় বাগচী। যাঁর জীবনের মূলমন্ত্র এখনও সেই সাধনা আর নিয়মানুবর্তিতা।