রক্তে নাচ,শেখান থেকেই বেড়িয়ে এসেছে শিল্পসত্ত্বা! আর নাচ যেখানে এক্সপ্রেশনের মায়াজালে জড়িয়ে থাকে,দর্শকের নজর তা আকৃষ্ট করবেই। এমনই এক মেয়ের গল্প বলবো আজ,নাম লাবণ্য ঘোষ। মায়ের অধরা স্বপ্নের চাবিকাঠি এখন কলকাতার লাবণ্যের কাছে,মা যেটা করতে পারেনি,মেয়ে তা করে দেখিয়েছে।এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম লাবণ্যর সাথে-

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় – নাচটা কি ছোট থেকেই?
লাবণ্য ঘোষ- আমার মা ছোটবেলায় নিজে নাচ করতেন কিন্তু তাঁর পেশাগতভাবে কোনদিনও নাচ নিয়ে এগোনো হয়নি। মা বলে মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে হলে তাকে মা নাচ শেখাবেন। মায়ের অপূর্ণ সাধ যে আমি পূরণ করতে পারছি, এটাই আমার প্রথম বড় পাওনা।

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় – ইন্সপিরেশন কে? নাচের হাতেখড়িটা কীভাবে হলো?
লাবণ্য ঘোষ – আমার যখন দু বছর বয়স তখন গড়িয়াতে আমাদের বাড়ির পাশেই একটি নাচের স্কুলে মা আমাকে নাচ শিখতে নিয়ে যান । কিন্তু বাবার বদলির চাকরি হওয়ায় আমাদের চলে যেতে হয় ভুবনেশ্বর। সেখান থেকেই আমার ওড়িশি নাচ শেখার শুরু।আমার গুরুমা শ্রীমতী রাজশ্রী প্রহরাজের কাছে। আমার নৃত্যজীবনের ভিত্তিস্থাপন করেছেন উনিই।
বাবার বদলির চাকরি হওয়ায় নানা সময়ে নানা জায়গায় থেকেছি কিন্তু নাচ কখনো বন্ধ হয়নি। অবশেষে কলকাতা আসার পর আমি স্বনামধন্য নৃত্যশিল্পী শ্রীমতি নন্দিনী ঘোষালের কাছে দীর্ঘ ৭ বছর ওড়িশি শিখি এবং কলকাতা ও বিভিন্ন রাজ্যের একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করি। পুরস্কার ও পাই।
বর্তমানে আমি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যবিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী এবং গুরু শ্রীমতী পৌষালি মুখার্জির তত্ত্বাবধানে শিক্ষা গ্রহণ করছি। তবে আমার প্রথম গুরু আমার মা I নাচের হাতে খড়ি মার কাছেই ই।
ইনস্পিরেশন বলতে আমি প্রত্যেক শিল্পীর থেকে কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করি| আমার মনে হয় সবার থেকেই কিছু না কিছু শেখার আছে|
তবে আমি মাধুরী দিক্ষীত এর বড়ো ফ্যান|ওডিসি নৃত্যশিল্পী Smt Sujata Mahapatra র বড় ভক্ত আমি।

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়- নেশাটাকেই কি পেশা তে নিয়ে যাবে? না অন্যকোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে?
লাবণ্য ঘোষ -আমি আমার নাচ নিয়েই রবীন্দ্রভারতী ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করছি | পরবর্তীকালে নেশা কেই পেশা করার ইচ্ছে আছে |এছাড়া আমি নাচ শেখানো শুরু করেছি | আমি চাই আমার শিল্পের মাধ্যমে মানুষ আমাকে চিনুক যাতে আমার অবর্তমানেএও মানুষ আমাকে আমার কাজের মাধ্যমে মনে রাখেন।

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় – নাচ করতে গিয়ে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে?
লাবণ্য ঘোষ -অনেকবার, অনেক রকম ভাবে। কখনো উচ্চতা নিয়ে সমস্যা হয়েছে কখনো আমি একক ভাবে নৃত্য পরিবেশন করায় কথা শুনতে হয়েছে।
আমি জেনেছি, বুঝেছি খুব কম মানুষ তাঁর উল্টো দিকের মানুষটির মন থেকে উন্নতি চান।এমনকি অনেক তথাকথিত কাছের মানুষদের কাছ থেকেও আমাকে নানান কটু কথা শুনতে হয়েছে ছোটবেলা থেকে। একসময় আমি সিদ্ধান্ত ও নিই যে আমি নাচ করব না। কিন্তু আমার বাবা মা পাশে ছিলেন বলেই আমি আবার নিজের মন কে নাচের প্রতি স্থির করতে পেরেছি।
পড়াশুনা এবং নাচ আমি একসাথে করি।যখন আমার পরীক্ষার আগের দিন নাচের অনুষ্ঠান থাকত আমি মেকাপ করতে করতে পড়েছি।
কোন কিছুকেই আমি অবজ্ঞা করিনি। কিন্তু নাচ আমার কাছে সব কিছু তাই নাচ কেই জীবনে সব থেকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছি।
একসময় আমাকে বলা হয়েছিল আমি নাচটা ঠিক করে করলেও Expression ঠিক মত দিতে পারি না। তারপর জেদ নিয়ে আমি সেই বিষয়ে মনোযোগ দিই, এখন সবাই আমাকে ‘Expression Queen’ বলে ডাকেন। এটাই আমার প্রাপ্তি।
আমি জানি যত খারাপ কথা, অহেতুক নিন্দা ও হিংসা বিদ্বেষের জবাব একদিন আমি আমার কাজ দিয়েই দেবো।
ইনফ্যাক্ট এখনো আমাকে কি ভাবে ডিমোটিভেটেড করা যায় এই চেষ্টা অনেকেই চালিয়ে যাচ্ছেন।

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় – নাচ তোমাকে অনেক কিছুই দিয়েছে আশা করি! এরকম কিছু ভালো মুহুর্ত, কিছু প্রাপ্তি যদি শেয়ার করো।
লাবণ্য ঘোষ -খুব কম বয়সে আমি দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতা ও ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টার (EZCC) তে Graded Artiste হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি।

প্রতিটি পুরস্কারই আমার কাছে মনে রাখার মত।
যেমন আমি যুগলশ্রীমল এক্সেলেনস অ্যাওয়ার্ড পাই পর পর দুবার, সংযুক্তা পাণিগ্রাহী মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, রাজ্যসঙ্গীত আকাদেমিতে পর পর দুবার দ্বিতীয় স্থান পাই আমি, এছাড়াও ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট একাডেমীর ডান্স ড্রামা মিউজিক ও ফাইন আর্টস আয়োজিত ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামে প্রথম স্থান, ২০১৪ ত্রিধারা উৎসবে দ্বিতীয় স্থান, পঞ্চম বার্ষিকী কটক উৎসবে শ্রেষ্ঠ ওড়িশি নৃত্য শিল্পী মনোনিত হই।
মুরারী স্মৃতি সংগীত সম্মিলনীতে প্রথম স্থান,সমগ্র ভারত নৃত্য প্রতিযোগিতা ২০১৪ তে ওড়িশি নৃত্যের প্রথম স্থান,ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স এর ২০১৬-১৭ দ্বিতীয় স্থান,ভারত সংস্কৃতি উৎসব ২০১৪ প্রথম স্থান,পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত একাডেমী আয়োজিত ওড়িশি নৃত্য প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান পাই।
এক একটি প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার আমাকে এগিয়ে দিয়েছে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় – এক্সিবিশন শুরু করেছো,মানুষের ফিডব্যাক কেমন?
লাবণ্য ঘোষ -আমার আনন্দের মুহূর্ত এটাই যে আমার কোরিওগ্রাফি মানুষ ভালোবেসে নিজে থেকে দেখে শিখে পরিবেশন করছে..ভারতবর্ষ ছাড়াও বাংলাদেশ এবং আরও অনেক দেশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।
এখন আমি নাচ শেখানো ও নৃত্য প্রদর্শনী শুরু করেছি। সকলেই সানন্দে অংশগ্রহন করছেন এটাই ভীষণ আনন্দের।

কিছুদিন আগেই আমার কিছু নাচের ভিডিও 1 Million + view পেরিয়েছে। সকলের এই ভালোবাসার আমি যেন মান রাখতে পারি এটাই আমার প্রার্থনা।
অনেকেই আমাকে জানান যে আমার নাচের জন্য তাঁদের বাজে দিন কাটলে বা শরীর খারাপ এর মধ্যে একটু হলেও পসিটিভিটি পেয়েছেন |এগুলোই খুব ভালো লাগে| Because as an Artiste my only motive was to spread positivitie vibes to people through my artform, especially in these tough times.
আর আমি জীবনে এমন কিছু করে যেতে চাই যাতে আমি না থাকলেও আমার কাজটা থেকে যায়। অনেকটা পথ চলা বাকি, আশাকরি সবার আশীর্বাদ পাবো।

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় – তুমি অনেকের ইন্সপিরেশন, তোমাকে দেখে অনেকে শিখছে,তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবে?
লাবণ্য ঘোষ -আমি সবাই কে বলবো, Follow your passion, dance, sing paint do whatever you want to do for yourself.
People will automatically connect to you.
Be dedicated and true to your own self and rest falls in track.
Life becomes beautiful when you have Art and an artistic approach in life.

শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় -মায়ের অপূর্ণ আশা পূরণ করতে পেরে এখন কেমন লাগে?

লাবণ্য ঘোষ -মা-র ইচ্ছে মতো আমি নাচ নিয়ে এগোতে পারছি এটাই আমার প্রথম বড় পাওনা | তবে এখনো অনেকটা পথ চলা বাকি আশা করি সবার আশীর্বাদ পাবো।