‘বিসর্গ’এর পর অরুণাভ খাসনবিশের পরবর্তী ছবি ‘লালাবাই’। এদিকে শাহজাহান রিজেন্সি নিয়ে ব্যস্ত কলকাতা। এরই মধ্যে একটু নিরিবিলিতে কথা হলো তাঁর সাথে। রাত দশটা নাগাদ মাংস রাঁধতে রাঁধতে ফোনে দেবশ্রুতির সাথে প্রাণ খুলে আড্ডা দিলেন অরুনাভ।
• আর্টিস্ট বাঁচান আপনি?
অরুণাভঃ- না, সেটা তো দর্শন বাঁচায়। আমি তো চাই সব আর্টিস্টরা মরে যাক। এই পৃথিবীতে আর্টিস্ট হয়ে বেঁচে থাকা খুব মুশকিল। একমিনিট ধরো, হেডফোনটা লাগাই। বলো…
• মানসিক ভারসাম্যহীনদের ইন্টারভিউ, ভীষণ বেখাপ্পা একটা ভাবনা এখনকার গতে বাঁধা শিল্পের নিরিখে…
অরুণাভঃ- ‘‌হেডকোয়াটার’‌ অনুষ্ঠানটা দীপাংশুর ভাবনা ছিলো। আমারও মনে হয়েছিল এটা করা উচিৎ। এমন এমন তথ্য উঠে এসেছিল, যে মনে হচ্ছিল ওরাই স্বাভাবিক। আমরাই আসলে অস্বাভাবিক।
• তাহলে বন্ধ করে দিলেন কেন?
অরুণাভঃ– দুটো এপিসোড দেখানোর পর, দর্শকদের সেরকম সাড়া পাচ্ছিলাম না। তাই বন্ধ করতে হল।
• ‘‌হেডকোয়াটার’‌ করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
অরুণাভঃ- ঠিক ভুল ভেবে কাজ করিনি। দ্বিতীয়বার কলকাতায় এসে কাজ করার সময় মনে হয়েছিল, ‘‌হেডকোয়াটার’‌–এর থেকে ভাল আর কিছুই হতে পারে না।
• দ্বিতীয় বার?
অরুনাভঃ- হ্যাঁ, আমি তো চলে গিয়েছিলাম কলকাতা ছেড়ে, সন্ন্যাস নিয়েছিলাম।
• সন্ন্যাস?
অরুণাভঃ- নির্বাসন নেওয়া বলা ভাল।
• কেন?
অরুণাভঃ- কেন মানে, আমার মনে হয়েছিল আমার আরও পড়াশোনা করা দরকার। ছবি তৈরি করা কঠিন মনে হচ্ছিল। তাই সব ছেড়ে দিয়ে ২৯ দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে শেষে শিলিগুড়ি ফিরে গেলাম। তারপর আড়াই বছর আর কিছুই করিনি।শুধু পড়েছি, শিখেছি, সিনেমা দেখেছি…


• হঠাৎ এরকম মনে হওয়ার কোনও না কোন কারণ তো আছে…
অরুণাভঃ- আমি অনেকদিন ধরেই ছবির কাজের সাথে যুক্ত। যেহেতু সিনেমার প্রতি ভালবাসাটা সেই ছোটবেলা থেকেই, তাই ছবি বানানোর উদ্দেশ্যেই কলকাতায় এসেছিলাম, সেটা ২০০৮ সাল। তখন রুদ্রর সাথে পরিচয় হয়। রুদ্রনীল ঘোষ। রুদ্রনীল ঘোষ, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের সাথে কাজ করি ‘‌হাওয়াবদল’‌–এ। সহপরিচালক হিসাবে। কিন্তু আমার সিনেমার হাতেখড়ি যে ছবিটা দিয়ে সেটাই আবার আমার ছবি না তৈরি করার কারণ।
• ‘‌হাওয়া বদল’‌?
অরুণাভঃ- না ওটা ২০১৩, আমার প্রথম কাজ ২০১০ এ। ছবিটার নাম ‘‌ভালবাসা অফরুটে’‌।

• তোমার লেখা ছিল?
অরুণাভঃ-না না, ওটা আমার লেখা হতেই পারে না। যারা আমার কাজ দেখেছেন বা আমাকে চেনেন তাঁরা বুঝতেই পারবেন যে এটা আমার কাজ নয়। ফুটবল নিয়ে গল্প। শ্বাশত চট্টপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত অনেকেই ছিলেন সেই ছবিতে। কিছুটা লোভে পড়েই করেছিলাম কাজটা। কারণ আমি সিনেমায় গল্প দেখানো ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারি না। অথচ সেই ছবিটা করতে করতে আমার মনে হতে শুরু করে, আমি যে কাজগুলো করতে এসেছি শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায়, সেগুলো একেবারেই আলাদা। তাঁর সাথে আমার কাজের কোনও মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ফলত আমি খুব যন্ত্রণা পাচ্ছিলাম। শেষে বাধ্য হই সব ছেড়ে বেরিয়ে আসতে।
• নির্বাসনটা ক’‌দিনের?
অরুণাভঃ- ২৯ দিন সময় লেগেছিল নিজেকে সব কিছুর থেকে সরাতে। কাজকম্ম, বন্ধু বান্ধব, ক্যামেরা, স্ক্রিন, আলো, প্যাক আপ সব , সবকিছু থেকে নিজেকে ছাড়াতে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। অবশেষে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে গেলাম। তারপর আড়াই বছর শুধুই পড়াশোনা।
• কী কী পড়লেন?
অরুণাভঃ- সব সব। হিন্দুত্ববাদ, বেদ–বেদান্ত, বিভিন্ন ধর্ম, আত্মজীবনী, শুধুই পড়েছি।
• তারপর কবে ফিরলেন?
অরুণাভঃ- ২০১৭ তে ফিরে আসি। যেহেতু সিনেমার প্রতি প্রেমটা বহুদিনের তাই নিজের মত করে কিছু কাজ করার কথা ভাবি।
• মাঝে প্রায় আড়াই বছরের ব্যবধান, অসুবিধা হয়নি?
অরুণাভঃ- সেরকম হয়নি কিছু। আমার এক পূর্বপরিচিত বন্ধু প্রেমাশিষ মুখার্জি আমাকে সাহায্য করেন এবং তারপরই সন্দেশ টিভি তৈরি করি আমরা।


• কিন্তু ‘‌হেডকোয়াটার’‌ তো দর্শকরা দেখলেন না…
অরুণাভঃ- হ্যাঁ। কলকাতা নিল না ঠিকই, তবে হেডকোয়াটারের পরাজয় ‘‌বিসর্গ’‌ তৈরি করার পরিকল্পনাকে তরান্বিত করল।
• ‘‌বিসর্গ’‌ কতটা সমাদর পেয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
অরুণাভঃ- ‘‌বিসর্গ’ আমার অনেকদিন আগের ভাবনা। ছবিটার প্রাথমিক কয়েকটা স্ক্রিনিং হয়েছে, কলকাতা চলচিত্র উৎসবে প্রবলভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কতকগুলো বৈদেশিক চলচিত্র উৎসবে ‘‌বিসর্গ’ নির্বাচিত হয়েছে, যদিও এখনও ফলাফল বের হয়নি। তবে আমার মনে হয় নিশ্চয়ই ‘‌বিসর্গ’ বিদেশেও বেশ সমাদৃত হবে। তবে ছবিটা কবে রিলিজ করবে বা আদৌ করবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত এখনও আমরা নিইনি।
• দ্বিতীয় ছবির কাজও তো শুরু হয়ে গেছে…
অরুণাভঃ- হ্যাঁ, সেটা নিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ততা রয়েছে। যেভাবে গতানুগতিকতায় এগোচ্ছে সবাই, সেখানে নতুন কিছু দেখানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সবাই তো একই রকম কাজ করছে। নতুন কী দেখবেন? একই গল্প ,দুঃখবিলাস, নতুন তো কিছু নেই।
• তুমি কীভাবে ভাঙবে এই গতানুগতিকতা?
অরুণাভঃ- অবশ্যই কাজ করে যেতে হবে। একের পর এক কাজ, যা সিনেমার একটা নতুন দিক খুলে দেবে আমজনতার কাছে। আর্ট এবং এন্টারটেইনমেন্ট দুটো দিককেই মেলাতে হবে।


• ‘লালাবাই’ মানে তো ঘুমপাড়ানি গান? তাহলে ছবিটা কি ঘুম নিয়ে?
অরুণাভঃ-না, এটা একজন লেখকের জার্নির গল্প। বোধিসত্ব, যিনি একটা রাইটার্স ব্লকের(একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে শিল্পী নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন না) মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তিনি নিজে সেটা বুঝতে পারেন না। একদিন একটা মেয়ে আসে তার জীবনে, সংস্থিতা,  একজন গ্রাফোলজিস্ট (হাতের লেখা বিশারদ), যার কাজটাই হল রাইটার্স ব্লক সারানো। সেই মেয়েটি সম্পুর্ন ভাবে রিসার্চ করেই আসে ওর কাছে। আস্তে আস্তে সংস্থিতা ওর বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বোধিসত্ব-র মানসিকতার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে। শেষে বোধিসত্বকে তার নিজের মানসিক গভীরতার ঠিক কতটা ভেতরে নিয়ে যেতে পারে সেটাই ছবির উপজীব্য বিষয়।
• বাহ্‌। আচ্ছা তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?
অরুণাভঃ- মা , বাবা, আমি।


• আজ তুমি চিত্রপরিচালক, কিন্তু একটা সময় যখন কলকাতায় চলে এসেছিলে, এমন একটা কাজ করতে যার ঝুঁকি প্রচুর, তখন মা–বাবা কতটা সমর্থন করেছিলেন তোমাকে?
অরুণাভঃ- আমি খুবই ভাগ্যবান, যে আমার মা–বাবা আমাকে মানসিক ভাবে যথেষ্ট সমর্থন করেছেন। আসলে বাবা নিজেও একজন শিল্পী ফলে বাবা বুঝতে পেরেছিলেন আমার লড়াইটা।
• আচ্ছা আমার তো এখনও ‘‌বিসর্গ’‌ দেখা হয়নি, কবে দেখব?
অরুণাভঃ- যেদিন ইচ্ছে হবে তোমার।