শ্রেয়সী দত্ত:‌ লম্বা, ফর্সা, সুদর্শন, মেধাবী। এগুলোই প্রাথমিক চাহিদা। এর সঙ্গে গান গাইতে জানা কিংবা গিটার বাজানোর মতো গুণ থাকলে তো সোনায় সোহাগা!‌ না, বিয়ের বাজারে পাত্র খোঁজার শর্ত নয়। কলকাতার স্পার্ম ব্যাঙ্কে এখন তুঙ্গে শৈল্পিক গুণ থাকা স্পার্ম ডোনারদের চাহিদা। সুদর্শন কিংবা উচ্চশিক্ষিত স্পার্ম ডোনারদের চাহিদা বরাবরই বেশি। তবে তার সঙ্গে ‘‌ক্লায়েন্ট’‌–দের এখন নয়া আবদার, যদি গাইয়ে, গিটার–বাদক কিংবা ছবি তোলায় পারদর্শী হন, তাহলে তাঁরা অতিরিক্ত টাকা দিতেও পিছপা হবেন না তাঁরা। এটাই এখন নাকি ট্রেন্ড, জানাচ্ছেন কলকাতার বিভিন্ন বন্ধ্যাত্ব নিরাময় কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা।
২০১২–তে সুজিৎ সরকারের ‘‌ভিকি ডোনার’‌ দিল্‌ জিতে নিয়েছিল দর্শকদের। স্পার্ম ডোনারদের নিয়ে এরকম খুল্লমখুল্লা তথ্য এর আগে কখনও দেখানো হয়নি কোনও ভারতীয় সিনেমায়। তবে বহু ভুল ধারণা ভেঙে দিলেও, স্পার্ম ডোনারদের প্রায় কেউই এখনও প্রকাশ্যে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে রাজি নন। নাম প্রকাশ করা যাবে না, এই শর্তে একজন স্পার্ম ডোনার বললেন, ‘‌সিনেমাটা দেখার আগে আমার এই বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণাই ছিল না। ভাবতাম, স্পার্ম দিতে গেলে হয়তো মা হতে ইচ্ছুক এমন কোনও মহিলার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে হবে। ভিকি ডোনার দেখার পরে ভুল ভাঙে। এমনকী এর বিনিময়ে যে টাকা পাওয়া যায়, সেটাও প্রথম জানতে পারি ওই সিনেমা দেখেই।’‌
কত টাকা পাওয়া যায় স্পার্মের বিনিময়ে?‌ সেটা নিয়েও রয়েছে অনেক রাখঢাক। ডোনারদের ছাড়া কারও কাছে এই তথ্য ফাঁস করতে চান না কোনও বন্ধ্যাত্ব নিরাময় কেন্দ্রের কর্মীরাই। তবু জানা গেল, ‘হাই প্রোফাইল ডোনার’‌ যাঁরা (‌যাঁদের স্পার্মের গুণগত মান ভাল এবং যাঁরা সুপুরুষ ও উচ্চশিক্ষিত)‌‌,‌ তাদের ক্ষেত্রে দেয় পারিশ্রমিক শুরু হয় ২০০০ টাকার থেকে। এমনকী, ৫০০০ টাকা পারিশ্রমিক ছাড়া স্পার্ম দিচ্ছেন না কোনও ডোনার, এমন ঘটনাও বিরল নয়। সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন এমন ডোনারও রয়েছেন এই শহরেই। যাঁদের স্পার্মের গুণগত মান ততটাও ভাল নয়, তাঁদের জোটে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা।
একটি বন্ধ্যাত্ব নিরাময় সংস্থার কর্মী জানালেন, ‘‌কে স্পার্ম দিচ্ছেন, এবং কে সেই স্পার্ম নিচ্ছেন, সেই তথ্য আমরা কখনওই ফাঁস করি না। ডোনাররাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের পরিচয় জানাতে চান না। সাধারণত, স্পার্ম দিতে সবচেয়ে বেশি আসেন কিশোর কিংবা কলেজপড়ুয়ারা। সম্ভবত কাঁচা টাকা রোজগারই তাঁদের লক্ষ্য থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের কাছ থেকে আমরা স্পার্ম নিই না। কারণ কলেজের গণ্ডি না পেরলে আমরা কারও কাছ থেকে স্পার্ম নিতে চাই না। দুর্গাপুজোর আগ দিয়ে কিংবা বর্ষবরণের উৎসবের সময়ে সবথেকে বেশি স্পার্ম ডোনারদের ভিড় হয়। এছাড়া বেশি সংখ্যায় স্পার্ম ডোনার আসেন মাসের শেষের দিকে।’‌ তবে বয়স অনধিক চল্লিশ, বিবাহিত এবং সন্তান রয়েছে এমন পুরুষদের স্পার্মের গুণগত মানই সাধারণত ভাল হয়। তবে ওই ডোনারের কোনও যৌনরোগ আছে কি না, সেটা ভাল করে যাচাই করে নেওয়া হয়। এছাড়া হেপাটাইটিস, ব্লাড সুগার, ব্লাড প্রেশার— ইত্যাদিও পরখ করে নেওয়া হয়। জিনগত সমস্যা থাকলেও খারিজ করা হয় ডোনারকে। আবার কলকাতায় অন্য কোনও কাজে এসে স্পার্ম ডোনেট করে যান, এমন বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যাও কম নয় বলে দাবি উত্তর কলকাতার একটি বন্ধ্যাত্ব নিরাময় কেন্দ্রের।
তবে বাঙালি স্পার্ম ডোনারদের সবথেকে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় উচ্চতা নিয়ে। ক্লায়েন্টদের গড়পড়তা দাবি থাকে পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চি থেকে ছ’‌ফিট উচ্চতার ডোনার। অনেক ডোনারই উচ্চতার বিচারে আটকে যান। স্পার্মের গুণগত মান খারাপ না হলে একমাসে সর্বোচ্চ দু’‌বার‌ও স্পার্ম ডোনেট করা সম্ভব। সেই স্পার্ম
১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্তও সংরক্ষণ করা সম্ভব। যত্ন করে রাখা হয় ডোনারদের ডেটাবেসও।
তবে সামাজিক জড়তা ও লোকলজ্জার ভয় এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি কলকাতার স্পার্ম ডোনাররা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডোনারের কথায়, ‘‌শুরুতে আমি স্রেফ নেশার পয়সা জোগারের জন্যই স্পার্ম ডোনেশন শুরু করেছিলাম। এখন এই কাজটা আমার রোজগারের অঙ্গ। আর এক ডোনারের কথায়, ‘‌অর্থের জন্য আমি কখন‌ই স্পার্ম ডোনার হ‌ইনি । সন্তানহীন মা–বাবদের সাহায‍্য করব বলেই আমি স্পার্ম ডোনেট করেছি। আমার স্ত্রী এই বিষয়ে অবগত। এটা নিয়ে তার কোনও অভিযোগ নেই।’‌ ‘আপনার ঔরসজাত সন্তানের সন্ধান কোনও দিনও আপনি পাবেন না, এই বিষয়টা খারাপ লাগে না? কখনও মনে হয় না, যে শিশু আমার স্পার্মের থেকে জন্ম নিল, তাকে একবার দেখি,’ জবাবে এক স্পার্ম ডোনারের বক্তব্য, ‘‌‌আমি ছ’‌বছর ধরে স্পার্ম ডোনেট করছি। শিশুকে দেখার ইচ্ছে একেবারে হয়নি বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু ক্লিনিকেই কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকে। সেখানে ভাল করে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ানো হয় বলে পরে অসুবিধা হয় না।’‌