তমাল পাল:‌ সারা বছর ফোয়ারা তো ছোটেই। তবে পুজো আর শীতের মরসুমে চাহিদা যেন একটু বেশিই ঊর্ধ্বমুখী থাকে। কলকাতার সুরা বাজারে এই দুই সময়ে চাহিদা সবথেকে বেশি। ঠিক কী ধরনের মদে বাঙালির রসনাতৃপ্তি ঘটে, কলকাতা জুড়ে কোন ধরনের মদের বিক্রি সবথেকে বেশি, সেই খোঁজেই পথে নেমেছিল নিউজপোল। গোটা শহর ও শহরতলির ৮৭টি মদ বিক্রির দোকান ঘুরে জানা যাচ্ছে বিস্ময়কর তথ্য!‌ হুইস্কি বা রাম নয়, বিদেশি মদকে পিছনে ফেলে শীতের মরসুমেও বিক্রিতে শীর্ষস্থান ধরে রাখছে দেশি মদ। যা সাধারণভাবে বাংলা নামেই পরিচিত। মদ বিক্রেতাদের দাবি, ‘‌দাদা’‌, ‘‌জোশ’‌, ‘‌উড়ান’‌, ‘টারজান’‌, ‘‌পিনকন’‌, ‘‌ক্যাপ্টেন’‌, ‘‌ওয়ান্ডার’‌–দের দাপটে অনেকটাই পিছনে পড়ে থাকছে ‘‌ওল্ড মঙ্ক’‌ কিংবা ‘‌ব্লেন্ডার্স প্রাইড’‌, ‘‌রয়্যাল স্ট্যাগ’‌–রা।
মদ বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, পাঁচ থেকে ১০ বছর আগেও ছবিটা অন্যরকম ছিল। তখন গোটা বছর গড়ে সবচেয়ে বেশি টাকার বিক্রি হতো বিয়ার। শুধু দুর্গাপুজোর মরসুমে বিক্রির শীর্ষে উঠত হুইস্কি। শীতে রাম। তখন সারা বছর মোট চাহিদার মাত্র ৫ শতাংশ ছিল বাংলা মদের বাজার। বাকি ৯৫ শতাংশের মধ্যে ৭ শতাংশ ভদকা, ২০ শতাংশ হুইস্কি, ১৫ শতাংশ ছিল রামের বাজার। বাকি ৫৩ শতাংশ বাজার ধরে রেখেছিল বিয়ার। শীতের সময় রামের বিক্রি একটু বেড়ে ২০ শতাংশ হয়ে যেত। কমতো হুইস্কির বিক্রি। ৪০ শতাংশ ক্রেতা শীতেও বিয়ার কিনতেন। পার্কস্ট্রিটের একটি এফএল শপের কর্মচারীর কথায়, ‘‌বিয়ারের দাম গত পাঁচ বছরে অনেকটা বেড়েছে। ফলে ক্রেতারা শীতে বিয়ার কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন। আশ্চর্যজনকভাবে সেই জায়গা দখল করছে বাংলা মদ।’‌ শ্যামবাজারের এক এফএল শপের কর্মচারী বললেন, ‘‌বিদেশি মদের বিক্রি রাতে বাড়ে। কিন্তু বাংলা মদ সারা বছর গোটা দিন ধরে বিক্রি হচ্ছে।’‌ বাজার এখন বাংলার পক্ষেই। কারণ চলতি বছরের শীতে এই ৮৭টি দোকানের হিসেব অনুযায়ী বাংলা মদের বিক্রি মোট বাজারের ৩২ শতাংশ!‌ দ্বিতীয় স্থানে রাম। তাদের দখলে বাজারের ২৮ শতাংশ। রাম-প্রেমীদের ৯৮.‌২ শতাংশ ক্রেতাই পছন্দ করেন ওল্ড মঙ্ক–কে।
তিন নম্বরে হুইস্কি। তাদের দখলে বাজারের ২২ শতাংশ। ৭ শতাংশ মানুষের প্রথম পছন্দ ভদকা (‌৭শতাংশ)‌। বাকিরা এখনও আস্থা রাখেন বিয়ার এবং জিনে।
কিন্তু কেন বিদেশি মদ ছেড়ে দেশি মদে আস্থা রাখছেন কলকাতার সুরারসিকরা। উত্তর জানতে মদ কেনার সময় টলিগঞ্জের একটি এফএল শপের সামনে আলাপ জমানো গেল রজত সাহার সঙ্গে। পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী রজত বললেন, ‘‌আমি আগে বিয়ারই পছন্দ করতাম। ৭০–৮০ টাকায় আগে বিয়ার পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকার নীচে ভাল বিয়ার পাওয়া যাচ্ছে না। তার থেকে কম খরচে এই দেশি মদই ভাল।’ বিক্রি এমনই যে, রাতের দিকেও বিভিন্ন এফএল শপের সামনে দেখা যাচ্ছে ডাবওয়ালাদের!‌ দেশি মদ ও ডাবের জলের মহিমার কথা তাঁদেরও তো অজানা নয়!‌‌
আবার অনেক ক্রেতা বলছেন স্বাদবদলের কথা। পেশায় ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সুমেধা (‌নাম পরিবর্তিত)‌ বললেন, ‘‌হুইস্কি আর রাম তো গোটা বছরই খাই। তাই মাঝে মাঝে মুখের স্বাদবদলের জন্য দেশি মদ কিনি।’‌ ট্যাক্সিচালক দীননাথ পাসোয়ানের যুক্তি, ‘‌এত কম দামে ভাল মানের দেশি মদ পাওয়া যাচ্ছে। কেন বিদেশি মদ খেতে যাব?‌’‌ তবে বিয়ারের দাম বাড়ার আক্ষেপ শোনা গেল তাঁর গলাতেও।
দমদমের একটি এফএল শপের মালিকের কথায়, ‘‌যদি খোঁজ নেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে গোটা কলকাতা শহরে এক কোটি টাকার ওপরে দেশি মদ বিক্রি হয় গোটা বছরে। এর ওপরে লাইসেন্স বিহীন দেশি মদের ঠেকগুলির বিক্রি তো আছেই। সবটা যদি যোগ করা হয়, তাহলে বিদেশি মদকে একাই হারিয়ে দেবে আমাদের বাংলা মদ!‌’‌‌ তবে বাকি মদের বিক্রি একেবারে কমছে না। বিদেশি মদের যে ব্র্যান্ডগুলির বিক্রি একটু একটু করে হলেও বাড়ছে সেগুলি হল, অফিসার্স চয়েস, ইম্পেরিয়াল ব্লু, রয়্যাল স্ট্যাগ, রয়্যাল চ্যালেঞ্জ। মহিলা ক্রেতাদের মধ্যে অবশ্য দেশি মদ এখনও সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাঁদের বেশিরভাগের কাছে এখনও প্রথম পছন্দ ফ্লেভার্ড ভদকা এবং জিন।
ফিল্মের গানে জিন শেরি শ্যাম্পেন রামের মতো অভিজাতদের সঙ্গে দেশি মদের ঠাঁই হয়নি একাসনে। তবু বেয়ারা চালাও ফোয়ারা বলে অভিজাত পার্টিতেও কি দেখা যাবে দেশি মদ?‌ বাংলার জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়ছে, তাতে যদি অভিজাত বিদেশি মদের সঙ্গে একই সারিতে দেশি মদকেও দেখা যায়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে কি?‌