কথা ভট্টাচার্য:‌— শিয়ালদহ-‌লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনের বহড়ু স্টেশনে নেমে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের হাঁটাপথ। নাম করলেই স্থানীয় বাসিন্দাদের যে কেউ দেখিয়ে দেবেন দোকান দুটো— শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। বিশেষত এই শীতের মরসুমে তো দোকানে তিলধারণের জায়গা নেই। থাকবেই বা কী করে, জয়নগরের মোয়া নামে যা বিশ্ববিখ্যাত, তার আসল উৎস তো এখানেই!‌ বাঙালির শীতকাল জয়নগরের মোয়া বাদ দিয়ে ভাবা যায় না, অথচ মোয়ার আসল উৎপত্তি এই বহড়ুতে হলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই বহড়ু সম্পর্কে জানেন না। উলটে মোয়ার আঁতুড়ঘর হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে জয়নগর। সেটা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
স্থানীয় ধ্রুবচাঁদ হালদার কলেজের পড়ুয়া ঋপণ দাসের কথায়, ‘‌কলকাতা কিংবা গোটা দেশে জয়নগরের মোয়া বলে যেটা বিক্রি হয়, সেটার সঙ্গে জয়নগরের কোনও সম্পর্কই নেই। এর উৎপত্তি বহড়ুতেই। কিন্তু বহড়ুর থেকে জয়নগর বড় এবং তুলনামূলকভাবে পরিচিত এলাকা। বহড়ু বললে হয়তো অনেকে এলাকাটা বুঝতে পারেন না। হয়তো সেই কারণেই জয়নগরের নাম টেনে মোয়ার নামকরণ করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে আমাদের দাবি, এই মোয়াকে বহড়ুর মোয়া বলেই প্রচার করা হোক।’‌
আসল জয়নগরের মোয়া কোথায় পাওয়া যাবে, প্রশ্নটা করতেই স্থানীয় বাসিন্দারা একবাক্যে দুটো নামই জানালেন। পেশায় কাপড়ের ব্যবসায়ী রতন মণ্ডলের কথায়, ‘‌এখানে মিষ্টির দোকান অনেক আছে। কিন্তু আসল মোয়ার রেসিপি জানেন দুটোমাত্র দোকানের কারিগররা।’‌ দোকানের নাম?‌ সেই শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। রতনের কথায়, ‘‌কলকাতা বা অন্য অনেক জায়গায় জয়নগরের মোয়া বলে যেটা বিক্রি করা হয়, সেটা আসল মোয়াই নয়। কেউ যদি আমাদের এই এলাকার মোয়া একবার খান, তাহলে আর কখনও অন্য মোয়া মুখে তুলবেন না।’‌ জয়নগরের নাম করে বাইরে বসে মোয়া বানানো হয়, স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে ক্ষোভ হয় না?‌ জবাবে রতন হাসতে হাসতে বলে দিলেন, ‘‌নাহ্‌, বরং হাসি পায়। কারণ, যাঁরা খাচ্ছেন তাঁরা পয়সা খরচ করে ঠকছেন। ওঁদের কীই বা বলতে পারি?‌’‌ তবে যতই ‘‌ডুপ্লিকেট’‌ মোয়া বাজারে আসুক না কেন, তারজন্য বহড়ুর মোয়ায় বিক্রি একটুও কমে না। কত টাকার বিক্রি হয় শীতের মরসুমে?‌ বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক গণেশ দাসের দাবি, ‘‌এই সময়টায় দিনে হাজার প্যাকেট তো বটেই। প্রতি প্যাকেটে থাকে ১০টি মোয়া। ওজন পাঁচশো গ্রাম। দাম নির্ভর করে গুণমানের ওপরে।’‌ জানা গেল, দেড়শো থেকে চারশো টাকা পর্যন্ত দাম হয় মোয়ার প্যাকেটের। শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বিক্রির হিসাবও এর থেকে সামান্য বেশি।
মোয়ার আসল উৎপত্তিস্থল নিয়ে কে কী বললেন, সেটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের অন্যতম মালিক বাবলু ঘোষ। তিনি বললেন, ‘‌মোয়া তৈরির কোনও গোপন রেসিপিই নেই। আমাদের মোয়া স্বাদের কারণেই সকলের থেকে আলাদা। আমরা যে গুণগত মানের কাঁচামাল ব্যবহার করি, যতটা যত্ন নিয়ে মোয়া বানাই, সেটা অন্য এলাকার কোনও দোকান করতে পারবে না।’‌ কিন্তু জয়নগরের মোয়া নাম দিয়ে যে খাস কলকাতার বুকেও মোয়া তৈরি হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে?‌ বাবলুর সাফ জবাব, ‘‌লোকে জানেন কোনটা আসল কোনটা নকল। কে কোথায় মোয়া বানিয়ে সেটা আমাদের এলাকার মোয়া বলে চালাচ্ছেন, আমরা সেটা নিয়ে ভাবি না। বহড়ুর মোয়া যাঁরা একবার খাবেন, তাঁরা বারবার ফিরে আসবেন। অন্য কোনও মোয়ায় স্বাদের সেই ম্যাজিকটা ক্রেতারা পাবেন না। সেই হিসেবে আমাদের কারিগররা ম্যাজিশিয়ান।’‌
কেন এই দুটো মিষ্টির দোকানকেই আসল মোয়ার প্রাপ্তিস্থান বলে ধরা হয়, সেটাও জানালেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী প্রণব সাহার কথায়, ‘‌মোয়ার দোকান অনেক হয়েছে। হয়তো হবেও। কিন্তু এই দুটো দোকানের মতো কাঁচামাল আর কোনও দোকান ব্যবহার করে না। স্বাদে গন্ধে অন্য মোয়ার সঙ্গে এদের ফারাক অনেকটাই। জয়নগরের তরফে হয়তো দাবি করা হয়, বহড়ুর মোয়া আসল নয়। কিন্তু আমাদের স্থানীয় দোকান শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে মোয়ার জিআই শংসাপত্র রয়েছে।’‌
শীতের শুরু থেকেই চালু হয়ে যায় মোয়া বানানোর কাজ। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় মোয়া বানানো ও বিক্রির কাজ। বহড়ু জুড়ে পড়ে যায় সাজোসাজো রব। মোয়া তৈরির কাজে লেগে পড়েন দুই দোকানের জনা ৩২–৩৩ কারিগর। দু’‌টি দোকানেই রয়েছেন মোট ৪জন প্রধান কারিগর। শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে একজন এবং বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে রয়েছেন তিনজন প্রধান কারিগর। জানা গেল, দু’‌টি দোকানের প্রধান কারিগররাই বংশানুক্রমিকভাবে মোয়া তৈরির কাজ করে আসছেন। এর মধ্যে শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের প্রধান কারিগর হিসাবে কাজ করেন খোদ সেই দোকানের মালিক রঞ্জিৎ কুমার ঘোষ। কত টাকা বেতন দেওয়া হয় মোয়ার কারিগরদের, সেটা খোলাখুলি জানাতে চান না কোনও দোকানের মালিকই। ব্যবসায়ে মন্ত্রগুপ্তি বজায় রাখা হয় কঠোরভাবে।
তবে, খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, মোয়ার কারিগরদের নিয়েও চলে দড়িটানাটানি। এই পরিস্থতিতে যাতে কোনও ভাবেই নিজের কর্মচারী বেহাত না হয়ে যান, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন দোকানের মালিকরা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি— এই তিনমাসের জন্য তাঁদের এত টাকাই দেওয়া হয়, যে বছরের বাকি সময়টা তাঁদের কোনও কাজ না করলে চলে। শুধু তাই নয়, প্রতিবছরেরই মরসুমের শুরুতে আগের মরসুমের থেকে কিছুটা হলেও পারিশ্রমিক বাড়াতে হয় তাঁদের। এছাড়াও বছরের যে কোনও সময়ে যে কোনও পারিবারিক প্রয়োজনে মোয়ার কারিগররা পাশে পান দোকানের মালিকদের। পারিশ্রমিকের টাকার পরিমাণটা ঠিক কত?‌ অঙ্কটা সরাসরি না বললেও আভাস পাওয়া গেল। মোয়ার মরসুমের শেষে পারিশ্রমিক পেয়ে অটোরিকশা কিনে ফেলেছেন কারিগর, এমন উদাহরণও রয়েছে। আবার এ–ও দাবি করা হল, রাজ্য সরকারের নিচুস্তরের মাসমাইনের থেকে মোয়া কারিগরদের পারিশ্রমিক বেশি। এঁদের ৮০ শতাংশই স্থানীয় বাসিন্দা।
তবে শ্রমিকদের একাংশের রয়েছে হতাশাও। তাঁদের দাবি, বহড়ুর মোয়া (‌যেটাকে তাঁরা দাবি করেন আসল মোয়া বলে)‌ বানানোর কারিগররা আসেন বংশপরম্পরায়। কিন্তু এখন যাঁরা মোয়া বানান, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম মোয়া বানানোর কাজে উৎসাহী নয়। বরং তারা কম উপার্জন করলেও চাকরি করতে বেশি আগ্রহী। এছাড়া প্রাকৃতিক কারণেই মোয়া বানানোর মূল উপাদান নলেন গুড় উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। যে ধানের খই দিয়ে মোয়া তৈরি হয়, সেই কনকচূড় ধানের জোগান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। মোয়ার কারিগরদের প্রায় সকলেই চান, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও মোয়া তৈরির বিদ্যা শিখুক। কিন্তু আদৌ কেউ শিখবেন কি না, সেটা নিয়েই একটা বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে।
আসল মোয়ার আয়ু কি আর মাত্র কয়েকবছর?‌ সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে বহড়ু।