রিচা চৌধুরী — ‘গ্রহের ফের’, ‘বশীকরণ’, ‘ব্যর্থপ্রেম’, ‘দাম্পত্য কলহ’, ‘মুঠকার্নি’ (ইচ্ছাপূরণ)‌— সবই হবে গ্যাঁটের কড়ি খসালেই। ভাবখানা এমন, যেন চাইলে আপনাকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দিতে পারেন ওঁরা!‌ সারিয়ে দিতে পারেন যে কোনও দুরারোগ্য অসুখও। সঙ্গে অবশ্য শর্ত থাকছে, ‘যদি রোগ হয় গ্রহের ফেরে’। তারকা বা নেতানেত্রী নন, তবু ওঁদের ছবি রোজই দেখা যায় সংবাদপত্রের পাতায়। জ্যোতিষীদের রমরমা এবং তাঁদের কাছে প্রতারিত হওয়ার উদাহরণ কম নয়। তবু হুঁশ ফেরে কি আমজনতার? ফেরে যে না, সেটা প্রমাণ হবে তাঁদের বিজ্ঞাপনের বহর দেখলেই। শুধুমাত্র বাংলায় সবথেকে বেশি প্রচলিত তিনটি খবরে কাগজে মাসে কয়েক লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপন দেন তাঁরা। এর পাশাপাশি টিভি চ্যানেল ও হোর্ডিংয়ে মুখ দেখানো তো আছেই। সব মিলিয়ে জ্যোতিষের ব্যবসায় এই জ্যোতিষীদের বিনিয়োগের পরিমাণটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।
কী পরিমাণ অর্থ শুধু খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করেন এই জ্যোতিষীরা?‌ সেটা নিয়ে এঁরা মুখ খুলতে চান না কেউই। তিনটি বহুল প্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে ওপরে একমাস ধরে নজর রেখেছিল ‘নিউজপোল’। ৬ই ডিসেম্বর থেকে ৬ই জানুয়ারি, এই সময়কালের মধ্যে তিনটি বহুল প্রচলিত সংবাদপত্রে সবচেয়ে বেশি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন যাঁরা, বেছে নেওয়া হয়েছিল তাঁদেরই। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একমাসে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন শ্রী দেব (প্রায় তিন লক্ষ টাকা) , তারপর আছেন শুভব্রত শাস্ত্রী (প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা), খনা মা (প্রায় দেড় লক্ষ টাকা), শ্রী দীনেশ আচার্য (প্রায় ৫০ হাজার টাকা) এবং দেবব্রত শাস্ত্রী (প্রায় ৫৫ হাজার টাকা)।
নিউজপোলের তরফে সাহায্যপ্রার্থী (‌ওঁদের ভাষায় ক্লায়েন্ট)‌ সেজে ফোনও করা হয়েছিল এই জ্যোতিষীদের। সেখানে খুল্লমখুল্লা অসুখ সারিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দেবব্রত শাস্ত্রী। বলছেন, ‘রোগ যদি গ্রহের ফেরে হয়, তাহলে সারিয়ে দেবো।’ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা শুনছেন তো? ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, দুর্ঘটনা, শারীরিক সমস্যা কিংবা জিনগত কারণ ছাড়াও যে রোগ হতে পারে, সেরকমই দাবি করছেন এই জ্যোতিষী। তবু, বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ছাড়া কি কোনও রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব? কিংবা তুকতাক, কবচ–তাবিজ, পাথর কিংবা তন্ত্রমন্ত্রের সাহায্যে রোগ সারানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়াটা কি আইনসম্মত? আইনজীবী সৌরভ মল্লিক বলছেন, ‘কোনও জ্যোতিষীও এভাবে রোগ সারানোর কথা বলতে পারেন না। যদি বলেন, তাহলে সেটা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’‌
শুধুই কি অসুখ? জ্যোতিষের ক্যারিশমায় নাকি কেটে যেতে পারে বন্ধ্যাত্বও!‌ গ্রহের ফেরে হওয়া যে কোনও রোগের মূল থেকে উপড়ে আনেন ‘‌জলে ভেসে তপস্যায় সিদ্ধা’‌ খনা মা। না, ছাপার ভুল নয় বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে খনা মা নাকি জলে ভেসেই তপস্যা করেন। খনা মা অবশ্য সরাসরি ফোনে কথা বলেন না। তার জন্য আছেন সহকারী। ফোন করতেই যিনি গড়গড় করে বলে গেলেন, সন্তানহীনতার কারণ হল গ্রহের ফের। এই ফের কেটে গেলেই ভূমিষ্ঠ হবে সন্তান। হাতের রেখা আর কোষ্ঠীবিচারে নতুন প্রাণ সৃষ্টিও নাকি সম্ভব!‌ তার জন্য এসে কথা বলতে হবে খনা মা–র সঙ্গে। পারিশ্রমিক ১০০০ টাকা। কিন্তু দক্ষিণা বিফলে গেলে কী হবে, সেটা জানতে চাইলেই বিরক্তি প্রকাশ করে ফোন কেটে দেন সহকারী। ডিসেম্বর–জানুয়ারি মাসে দেড়লক্ষ টাকা যিনি শুধু খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনেই খরচ করতে পারেন, তাঁর যে ভক্তের অভাব নেই, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় খনা মা–র সহকারীর হাবেভাবে।
স্বামী বা প্রেমিককে আঁচলে বেঁধে রাখাও সম্ভব বলে দাবি করেন চন্দন শাস্ত্রী। তবে তার আগে আপনি কতদিনের জন্য আপনার স্বামীকে ট্যাঁকে গুঁজে রাখতে চান সেটা জানাতে হবে। তিন থেকে চার বছরের বশীকরণ থেকে ‘‌লাইফটাইম’‌— থাকছে সব রকমেরই অফার!‌ স্বামী বা প্রেমিক ছাড়া অন্য কোনও ব্যক্তির বশীকরণ সম্ভব? চন্দন শাস্ত্রীর‌ সটান জবাব, ‘‌হ্যাঁ’‌। এরপরেই নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক পরিচয় দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বশীকরণ করে আমাদের দলের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করতে চাই। পারবেন?‌’‌ প্রশ্ন শুনে দীর্ঘ আলোচনার পরে চন্দন শাস্ত্রীর দাবি, ‘‌দশ কোটি টাকা খরচ করলে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকেও বশীকরণ করা সম্ভব।’‌ বাকি কথা বলার জন্য বারাসতে চেম্বারে এসে দেখা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
তবে আমজনতার জন্য বশীকরণের খরচ অনেকটাই কম। তিন বা চার বছরের জন্য আছে ৩,১০০ টাকার প্ল্যান আর লাইফটাইমের জন্য খরচ করতে হবে ৪,১০০ টাকা। সময় লাগবে তিন থেকে চার দিন। তবে যাঁদের ধৈর্য কম তাঁদের জন্য আছে ‘‌রাজমোহিনী বশীকরণ’‌। ‘মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান করে দেবেন স্যার’। জানালেন চন্দন শাস্ত্রীর সহকারী বাবু। তার খরচ ৩.৬৫১ টাকা।
মাসে প্রায় এক লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপন দেন অঘোরী তান্ত্রিক শুভব্রত শাস্ত্রী। বললেন, ‘‌যে কোনও সমস্যার সমাধান হবেই। স্ট্যাম্প পেপারে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে পারি।’ কালাজাদুর মৃত্যুভয় কাটাতে সিদ্ধহস্ত বাবা কামাল পাশা। বিজ্ঞাপনে খোলাখুলি জানালেন ব্ল্যাক ইলাম (কালাজাদু) মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাঁর কাছে সমস্যার সমাধান উন্নততর পদ্ধতিতে সম্ভব। ইন্টারনেটের যুগে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠালেই, মিলবে অনলাইন সমাধান। বিজ্ঞাপন খাতে তাঁর খরচ মাসে ৬০/৭০ হাজার টাকা। তবে ফোনে বেশি কথা বলতে চান না। সরাসরি চেম্বারে ডাকাটাই তাঁর দস্তুর।
এভাবেই কখনও বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের বশীকরণ, কখনও চিকিৎসার বদলে তাবিজ–কবজ দিয়ে চিকিৎসার মতো অবৈজ্ঞানিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে রমরমিয়ে চলছে বিভিন্ন ‘‌বাবা’‌ এবং ‘‌মা’‌–র কারবার। ‘মা উগ্রতারার সাধক’, ‘কালাজাদুর রাজা’ , ‘মহা তন্ত্রবীর’, ‘ জিন দ্বারা বশীকরণে সিদ্ধ’ — এই সমস্ত বিশেষণের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সমাধানের আসল উপায়। মনোবিদদের মতে, মানসিক দুর্বলতার থেকেই অলৌকিক উপায়ে সমাধান খুঁজতে বিজ্ঞাপন দেখে হাতে ফোন তুলে নিচ্ছে আমজনতা। কতটা সুফল আসছে, সেটা খোঁজ নিয়েও দেখছেন না প্রায় কেউই।