অর্পণ গুপ্ত: কলকাতা। ফুটবলের মক্কা। ভারতীয় ফুটবলের সমস্ত উত্থান পতনের সাক্ষী এই তিন শতকের শহর। কল্লোলিনীর বুকে আরও এক ইতিহাসের সাক্ষী থাকল সারা বিশ্ব। সেই ইতিহাসের নায়ক আদিল খান। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার আটবছর পরে দলে ফিরেই দেশের হয়ে শুধু গোলই করলেন না, বাংলাদেশের সঙ্গে ফিফা কোয়ালিফায়ারের ম্যাচে লজ্জার হার থেকে বাঁচালেন ভারতকে। দেশের হয়ে করা আদিলের এই একমাত্র গোলটি বাদ দিলেও খেলার ফল বাংলাদেশের পক্ষে যেতেই পারত। যদি না ৭৩ মিনিটে গোল লাইন ক্লিয়ারেন্স আসত এই আদিলের পা থেকেই!

১৫ অক্টোবর ভারত-বাংলাদেশের ফুটবল দ্বৈরথের পারদ চড়েছিল বহুদিন আগে থেকেই। ফেডারেশন ক্লাবজোট দ্বন্দ্ব, আইলিগ-আই এস এল বিবাদ ভুলে ষাট হাজারি যুবভারতী যেন হয়ে উঠল ফুটবল ঈশ্বরের রত্ন সিংহাসন। কলকাতার তিন প্রধানের সমর্থকদের মিলিত জনস্রোত যেন যুবভারতীমুখী দুপুর থেকেই। ক্রিকেট নিয়ে বিবাদ থাকলেও বহুবাংলাদেশী সমর্থক কিন্তু হাজির ছিলেন আজ যুবভারতীতে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও হাসি-সেলফিতে মেতেছিলেন তারা। ম্যাচের শুরুতে দু’টি বিশাল টিফো, অগুনতি ফ্ল্যাগ, ভাইকিং ক্ল্যাপ, ম্যাক্সিকান ওয়েভ আর ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে যুবভারতী তখন যেন মায়াবী রূপকথার স্বর্গোদ্যান। এরপর সার বেধে খেলোয়াররা গাইলেন জাতীয় সংগীত। আমার সোনার বাংলার মেঠো সুর থেকে জনগনমন অধিনায়কের চিরন্তন কোরাসে গমগম করে ওঠে ফুটবলের মক্কা।

কিন্তু খেলার শুরুতেই ছন্দপতন। বাংলাদেশের সাদউদ্দিনের গোলে ৪২ মিনিটে প্রথমেই পিছিয়ে পড়ে ভারত। গুরপ্রীতের আউটিং এর ভুলের সুবাদে গোল করে যান সাদউদ্দিন। কিন্তু মাঝমাঠে অনিরুদ্ধ থাপা নিষ্ক্রিয় থাকায় ডানা মেলতে পারছিলেন না সামনে থাকা সুনীল উদান্তারা। একের পর এক কর্নার ফ্রি-কিক পেয়েও যেন গোলের মুখ খুলল না। ডিফেন্সে সন্দেশ ঝিংগমের অনুপস্থিতি কিন্তু এখনও ঢাকতে পারেন নি ভারতের দুঁদে কোচ ইগর স্টিমাচ। এরপরের ওমান বা কাতার ম্যাচে কিন্তু আদিল ও আনাসকে দিয়ে সন্দেশের শূন্যস্থান ঢাকা আরও কঠিন হবে ইগরের জন্য। হাফটাইমের পরেও খেলার চিত্রনাট্যে তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না। মনবীরের একের পর এক গোল মিস যেন ক্রমশ ভেঙে দিল ভারতের মনোবল। সমর্থকদের চিৎকার যেন মনে বিঁধছিল কলকাতায় খেলে যাওয়া বুড়ো ঘোড়া সুনীলের। ভারতের পক্ষে তাই গোলের মুখ খুলতে লেগে গেল ৮৭ মিনিট। গোলের পর যেন সঞ্জীবনী মন্ত্রে জেগে উঠল যুবভারতী, ঘুমন্ত দৈত্যের গর্জনে তখন শেষবার যেন মরণকামড় দেবার চেষ্টা করলেন সুনীল-উদান্তারা কিন্তু হল না। খেলা শেষ হল ১-১ গোলে।

তবে ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। ফলাফল হয়ত সেভাবে স্বস্তি দিল না ভরা যুবভারতীকে কিন্তু ভারতের মাটিতে ফুটবলের আঁতুরঘর যে এখনো কলকাতাই তা প্রমাণ হয়ে গেল আরও একবার, রাতের কালো আকাশে কিছুটা ফিকে তারার মতো জ্বলে রইল ভারতের কোয়ালিফাইং রাউন্ড পেরোনোর স্বপ্ন। এবং তা থাকল ওই আদিলের হাত ধরেই।