সায়ন: ইতিহাস এক বিষাদের ধ্রুপদী রাগ। তাঁর মতো নীলকন্ঠকে কোথায় আর খুঁজে পাওয়া যায়? সেই দেখে আমাদের চোখে আসে অশ্রু ঠোঁটে লাগে এক হাসির প্রলেপ। অন্নদাশংকর রায় এক পথিক। ‘পথে প্রবাসে’ তার চলমান নিঃশ্বাস এক ক্লান্তিহীন মানবতার খোঁজ।

সংকটাপন্ন পৃথিবীর বুকে মৃত্যুর কারাগারের প্রতিটা শিক কিন্তু শুধুই ভাইরাস নয়। প্রেমহীনতাই মানুষের আয়ুর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। মানুষের জন্য ধর্ম খুঁজে ফেরা এক অনন্ত জীবনের ইতিহাস লেখা। ভারতবর্ষের ধর্ম আর ক্ষমতার বিপন্ন লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্লান্ত মনন আশ্রয় নেয় অন্নদাশংকর- এর কাছে , “যে দেশে বহু ধর্ম সে দেশের মূলনীতি কী হওয়া উচিত? এ প্রশ্নের উত্তর পাকিস্তান একভাবে দিয়েছে। ভারত দিয়েছে অন্যভাবে।…. ভারতের মতে সব ধর্মই সমান, সব ধর্মই সত্য, সংখ্যাগুরুর মুখের চেয়ে একটি ধর্মকেই রাষ্ট্রধর্মে পরিণত করলে আর সব ধর্মের উপর অবিচার করা হবে, সুতরাং সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সর্বোদযে়র বিচারে সকলের প্রতি সমদর্শিতার খাতিরে ভারতকে হতে হবে সেকুলার স্টেট; যে রাষ্ট্র ধর্মের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ।”

অন্নদাশংকর রায় গভীর অতলের কাছে পৌঁছে জান নিত্যদিনের ভাষায়। মানবিক এই নির্মাণ তাঁকে অনেকবেশি জনগণমনের কাছে স্থান করে নিতে পারেন। মহাকালের সন তারিখের ফাঁকে যে অন্ধকার তাকে অবলিলায় প্রশ্ন করতে পারেন: “তেলের শিশি ভাঙল বলে/ খুকুর পরে রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা/ ভারত ভেঙে ভাগ করো/ তার বেলা?”

কাজী আবদুল ওদুদকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একজন মানুষের মধ্যে থেকে লুকিয়ে থাকা বিশ্ববোধকে প্রকাশ করেন জনতার দরবারে। অন্নদাশংকর রায় লিখছেন: “দশ বছর আগে ওদুদ সাহেব যে প্রত্যযে় উপনীত হয়েছিলেন তা যে কোনো একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদীর প্রত্যয়, যথা জবাহরলালের। একে বলা যেতে পারে সেক্যুলার মনোভাব। এই মনোভাবের প্রতিবাদ কেবল মুসলমান সমাজে নিবন্ধ নয়, হিন্দু সমাজেও পরিব্যাপ্ত ছিল ও আছে। কাজী সাহেবের পাঁচটি প্রস্তাবের মধ্যে চারটি- শেষ চারটি- কি হিন্দু জনমত নির্বিবাদে গ্রহণ করবে? ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উদ্দেশ্য শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়। জাতিগঠনও বটে। সে কাজের প্রায় সবটাই বাকি। ধর্মের গায়ে আঁচটি লাগবে না, সমাজের গায়ে আঁচড়টি লাগবে না, অথচ জাতিগঠন আপনা-আপনি হয়ে যাবে, এও এক প্রকার সম্মোহন। সম্মোহিত হিন্দুকে এ কথা সমঝানো শক্ত । সে জাতিভেদও রাখবে, জাতিগঠনও করবে, যত রকম উল্টোপাল্টা উদভট ব্যাপারে গোঁজামিলকে বলবে সমন্বয় বা যত পথ তত মত।”

জগতের চিরন্তন প্রেমিক অন্নদাশংকর রায় রাজনীতি ও জীবনকে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে রেখে বিচার করেননি। সাহিত্য ও মানবের মধ্যে সমস্ত ভেদরেখা মুছে দিতে পেরেছেন বলেই তিনি শিল্পী, সময়ের স্রোতধারায় বারবার তাঁর মনন আমাদের পথচলার মশাল হয়ে জ্বলে। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস হলেও সৃষ্টির মধ্যে সদা জীবন্ত এক প্রাণ অন্নদাশংকর রায়।