নিউজপোল ডেস্ক: সারা পৃথিবীতে একই মানুষের মধ্যে চিকিৎসক ও সাহিত্যিক সাত্তার উদাহরণ কয়েক বার দেখা দিয়েছে। বিখ্যাত সাহিত্যিক আন্তন চেখভ (১৮৬০-১৯০৪) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। আমাদের এই বাংলাতেও এমন নজির বার কয়েক দেখা দিয়েছে। যেখানে একই ব্যক্তি সত্ত্বাকে ধারণ করে আছে দুই ভিন্ন প্রান্তের পেশা। আন্তন চেখভ স্বয়ং এই বিষয়ে একটি মজার স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘Medicine is my lawful wife, and literature is my mistress’ অর্থাৎ চিকিৎসা আমার বউ আর সাহিত্য হল আমার প্রেমিকা।

বাংলা ভাষার অন্যতম কথাসাহিত্যিক বনফুলের ক্ষেত্রেও এ কথা বিশেষ প্রজজ্য। তাঁর আগে তারকনাথ মুখোপাধ্যায়, বনবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ পেশায় ডাক্তার হলেও নেশায় ছিলেন আপাদমস্তক সাহিত্যিক। বনফুলের প্রকৃত নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। পেশায় ডাক্তার হলেও আশি বছর জীবন যাপন করা বলাই অনেকটা সময় নিয়োগ করেছিলেন সাহিত্য সাধনায়। ডাক্তারি পড়ার সময়ই বনবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় বনফুলের। সমমানসিকতার কারণেই দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে।

ডাক্তারি ও সাহিত্যকে একযোগে চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুজ বনফুলকে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন বনবিহারী। পারিবারিক কারণেই ডাক্তারিতে ভর্তি হন বলাইচাঁদ। তাঁর বাবা সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ডাক্তার। তিনি পূর্ণিয়া জেলার মণিহারীর ডিস্ট্রিক বোর্ডের হাসপাতালে ডাক্তারি করতেন। পরে মেডিক্যাল অফিসার হয়েছিলেন। বাবার জীবন নিয়ে বনফুলের ‘উদয় অস্ত’ নামের একটি উপন্যাস আছে।

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৯ জুলাই। ওই একই বছর জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুই মহৎ কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশ। প্রথম জীবনে কবিতা রচনায় মননিবেশ করেন তিনি এবং সেই সময়ই ‘বনফুল’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে বনজঙ্গল তাঁর প্রিয়। মণিহারতে যে বাড়িতে থাকতেন তার কাছাকাছি ছিল গভীর জঙ্গল। একটি ছোট লাঠি হাতে নিয়ে চলে যেতেন জঙ্গলের গভীরে। সেই কারণে বাড়ির কাজের লোকেরা নাম দিয়েছিলেন ‘জংলিবাবু’। বন চিরকালই তাঁর কাছে ‘রহস্য নিকেতন’। সে জন্য ছদ্মনামের ক্ষেত্রে তিনি ‘বনফুল’ নামটি নির্বাচন করেন। পরে গল্প-উপন্যাসে মন দেন। ভুবন সোম, স্বপ্ন সম্ভব, জলতরঙ্গ, দুই পথিক-সহ একাধিক উপন্যাস লিখেছেন তিনি।

একদিন শিক্ষক চারুচন্দ্র রায়চৌধুরী বাংলা ক্লাসে সবাইকে ‘গরু’ বিষয়ে গদ্যে বা পদ্যে essay লিখে আনতে বললেন। তখন বলাইচাঁদ লেখেন, “মানুষ তোমায় বেজায় খাটায়,/ টানায় তোমায় লাঙল গাড়ি,/ একটু যদি দোষ করেছো/ অমনি পড়ে লাঠির বাড়ি।/ আপন জিনিস বলতে তোমার/ নেই কিছু এই বিশ্বেতে,/ তোমার বাঁটের দুধ টুকু তা-ও/ বাছুর তোমার পায় না খেতে।/ মানুষ তোমার মাংস খাবে/ অস্থি দেবে জমির সারে,/ চামড়া দিয়ে পরবে জুতো/ বারণ কে তায় করতে পারে?/ তোমার পরেই এ অত্যাচার/ হে মরতের কল্পতরু।/ কারণ? নহ সিংহ কি বাঘ,/ কারণ তুমি নেহাত গরু।” কবিতার বয়ানে ‘গরু’ নিয়ে এই লেখাটি লিখে কুড়িতে কুড়ি পেয়েছিলেন সাহিত্যিক বনফুল।

তখনকার মনুষ্য সমাজে গরুদের কি করুণ অবস্থা ছিল তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় লেখাটিতে। বিজেপি শাসিত বর্তমান ভারতে বাস করলে রীতিমতো তাজ্যব বনে যেতেন বনফুল। কেননা এখন গরুর গায়ে বসেছে আধার নম্বর! যেখানে গরুর মাংস কেনার অপরাধে পিটিয়ে খুন করা হয় মুসলিম যুবক তাবরিজ আনসারিকে। এমনকি এও শোনা যায়, গোমূত্র পান করলেই নাকি সেরে যাবে করোনা!

তথ্যঋণ: বনফুল, প্রশান্তকুমার দাশগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি