“দেবী বিশালাক্ষীকে একটিবার দেখিতে পাওয়া যায় না? হঠাৎ সে বনের পথে হয়ত গুলঞ্চের পাতা পাড়িতেছে – সেই সময় –
খুব সুন্দর দেখিতে, রাঙা পাড় শাড়ী পরনে, হাতে গলায় মা-দুর্গার মত হার বালা।
– তুমি কে?
– আমি অপু।
– তুমি বড় ভালো ছেলে। তুমি কী বর চাও?”

সায়ন

মানুষের কালেরযাত্রা স্মৃতির পথে আচ্ছন্ন , রহস্যময় আর অব্যক্ত। ‘পথের পাঁচালী’র ষোড়শ পরিচ্ছেদের যে অংশটি তুলে ধরলাম – অপু কি কোনও বর চাইতে পেরেছিল? পারে নি। এমন এক স্মৃতিকথনকার বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় আমাদের বাংলা সাহিত্যের আশ্রয়। আধুনিক সাহিত্যের ভাষা ও কথন যখন যুদ্ধ সন্ত্রাস ভাইরাসের করাল থাবার নিচে অন্ধকার ঘরে বন্দি হয় আমাদের মনে পরে স্মৃতি-ক্ষমতার অবচেতনাময় মানব এসে দাঁড়ায় ” নদীর ধারের অনেকটা জড়িযা় সেকালের কুঠিটা যেখানে প্রগৈতিহাসিক যুগের অতিকায় হিংস্র জন্তুর কঙ্কালের মতো পডি়যা়ছিল, গতিশীল কালের প্রতীক নির্জন শীতের অপরাহ্ন তাহার উপর অল্পে অল্পে তাহার ধূসর উত্তরচ্ছদবিশিষ্ট আস্তরণ বিস্তার করিল।”

ইতিহাস শুধুমাত্রই এক অতীত নয়। মৃত্যুর মধ্যে কখনই শেষের দিনের কথা লেখা থাকে না। সেখানেই ‘পথের কবি’ তাঁর অস্মিতা ও দ্রাঘিমারেখা মিলিয়ে দিতে পারেন মানবের বিশ্বপ্রকৃতি সত্ত্বা । আমাদের বিপন্ন আধুনিকের অবিশ্বাসের সামনে একজন অপু যখন দেখে
Here lies Edwin Lermor
The only Son of John & Mrs. Lermor,
Born May 13,1853,Died April 27, 1860

সে দেখার মধ্যে কোনও বিলীনরেখা থাকে না, আমাদের চলমান ভাঙনকে তুচ্ছ করে সামনে যে ‘বুনো সোঁদাল গাছ’টি থাকে তার ” …..চৈত্র বৈশাখ মাসে আড়াই বাঁকীর মোহনা হইতে প্রবহমান জোর হাওয়ায় তাহার পীত পুষ্পস্তবক সারা দিনরাত ধরিয়া বিস্মৃত বিদেশী শিশুর ভগ্ন-সমাধির উপর রাশি রাশি পুষ্প ধরাইয়া দেয় । সকলে ভুলিয়া গেলেও বনের গাছপালা শিশুটিকে এখনও ভোলে নাই।”

বিভূতিভূষণ পৃথিবীর এমন এক কবি যিনি তার কাব্য লিখেছেন আখ্যানে গল্পে উপন্যাসের পাতায় পাতায় । কত অনায়াসে মাটির বুক থেকে তুলে দিলেন দেশের নাম, আসলে দেশ তো শুধুমাত্রই একটি নাম , কিন্তু মা’যে়র পরিচয় হল মাটি শুরু ও শেষের একমাত্র আশ্রয় । সে নাম লেখা আছে ইছামতির তীরে বাঙালির নিভৃত আশ্রয়ে, পলতে মাদার গাছের লালফুলে, মাডি়ঘাটা কিংবা চাঁদুডি়যা ঘাটে, বুনো তিৎপল্লার লতার হলদে ফুলে। সেখানে মানুষ তার আপন হৃদয়ের কাছে খুঁজে পেয়েছে মনের মানুষের গান, ভাষা আর বিশ্বাস ।

তাই বিভূতিভূষণকে বানিয়ে লিখতে হয় নি কিছুই, শুধুমাত্র হিংস্র পৃথিবীর দিকে ক্লান্ত চেয়ে থাকা তখন একজন কথাকার ‘স্মৃতির রেখা’ দিনিলিপি খন্ডে ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯২৭ এ লেখেন ” .. – সন্ধ্যার পর এই থানার আয়না বসানো টেবিলটার ধারে বসে লিখছি – এ সব যেন কোথায় এসে পড়েছি! – সেই – সেই সময় পাকাটি হাতে শিবাজীর মতো যুদ্ধ-যাত্রা মনে পড়ে- সেই মার তালের বড়া ভাজা, কলকাতা থেকে এসে খাওয়া- বাবার দেশভ্রমণের বাতিক- সেই বড় দিনের সময় আমবনের কাছে বেড়ানো – কত পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে ।”

তাহলে কি আমরা বাস্তবের থেকে সরে গিয়ে বেঁচে থাকবো? আমাদের ক্ষতিকর বর্তমানের বিরুদ্ধে একটা অন্য পরিসর তৈরি করবো? একে কল্পনাবিলাসিতার সঙ্গে গুলিয়ে দিতে পারে চিন্তাহীন সমাজ, কিন্তু না তা তো নয় – ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত জীবনবাস্তবের মধ্যে অদেখাকে দেখার একটা পথ খুলে দিতে সক্ষম এই বিভূতি আখ্যান । নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন সমাজ সমস্যা জর্জর তীক্ষ্ণ তীরের ওপারে দাঁড়িয়ে বিভূতিভূষণ এর লেখা পড়ে “আমরা জ্বালা ভুলে গেলাম, অভিযোগ ভুলে গেলাম, তিক্ততা ভুলে গেলাম । মনে হল , ‘এখনো অনেক রয়েছে বাকী’।

শহরের জীবনে যখন নিরবিচ্ছিন্ন ক্ষতির খতিয়ান- তখন এই বাংলাদেশেরই গ্রামপ্রান্তে একটা ‘সব পেয়েছি-র জগৎ’ আছে। সেখানে দারিদ্র, দুঃখ, বেদনা, শোক সবই আছে, কিন্তু তাদের সমস্ত কিছুতে এমন একটি মধুমান প্রশান্তি বিকীর্ণ হয়ে রয়েছে যে তার আশ্রয়ে এখনো নিশ্চিন্তে নিমগ্ন হয়ে থাকা যেতে পারে।”

আমাদের মানবাধিকার লাঞ্ছিত এই সংস্কৃতির বেদনার ইতিহাস, স্রোত বয়ে ‘আরণ্যক’- এ সত্যচরণ’র কন্ঠে প্রতিধ্বনি হচ্ছে, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর প্রয়াণ কালবেলাকে সাক্ষী রেখে সেই আখ্যানের নাট্যরূপ আজও দেখছি প্রাচীনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা আধুনিকের অবয়ব- “দেখিতে পাইলাম যাযাবর আর্য্যগণ উত্তর-পশ্চিম গিরিবর্ত্ম অতিক্রম করিয়া স্রোতের মত অনার্য্য-আদিম-শাসিত প্রাচীন ভারতে প্রবেশ করিতেছেন….ভারতের পরবর্তী যা কিছু ইতিহাস – এই আর্যসভ্যতার ইতিহাস- বিজিত অনার্য্য জাতিদের ইতিহাস কোথাও লেখা নেই – কিংবা সে লেখা আছে এইসব গুপ্ত গিরিগুহায়, অরণ্যনীর অন্ধকারে, চূর্ণয়মান অস্থি-কঙ্কালের রেখায়। …. ইতিহাসের এই বিরাট ট্রাজেডি যেন আমার চোখের সম্মুখে সেই সন্ধ্যায় অভিনীত হইল- সে নাটকের কুশীলবগণ একদিকে বিজিত উপেক্ষিত দরিদ্র অনার্য্য নৃপতি দোবরু পান্না, তরুণী অনার্য্য রাজকন্যা ভানুমতি, তরুণ রাজপুত্র জগরু পান্না – একদিকে আমি , আমার পাটোযা়রী বনোযা়রীলাল ও আমার পথপ্রদর্শক বুদ্ধু সিং।”

লেখক এবং থিয়েটারকর্মী