তমাল পাল: বিটি রোড ধরে ডানলপ মোড় থেকে সোদপুরের দিকে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বেন তিনি। কামারহাটি পৌরসভার সামনে রাস্তায় যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। এমনিতে পরিতোষ সরকারকে দেখে বোঝার জো নেই যে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন। একাধিকবার চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে গিয়ে নিরাময়ের চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই। এলাকায় তিনি পরিচিত ‘‌পাগল সঞ্জয়’‌ হিসেবে। তবে মানসিক রোগী হলেও গত বারো বছর ধরে ওই এলাকাতেই যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন পরিতোষ ওরফে সঞ্জয়। প্রথমে কাজ করতেন নিজের ইচ্ছায়, মনের খেয়ালে। পরে তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে সঞ্জয়কে ডেকে চাকরি দিয়েছে কামারহাটি পৌরসভা। তবে সঞ্জয় যেহেতু যান চলাচল সামলানোর কাজটাই করতেন, তাই স্থানীয় পুলিশের কাছে অনুরোধ করে সঞ্জয়কে ট্র্যাফিক সামলানোর কাজে সামিল করে নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল পৌরসভার তরফে। সেই অনুরোধ রেখেছে বেলঘরিয়া থানা। ওই থানার কর্মীরাও নাকি সঞ্জয়কে নিজেদের সহকর্মী বলেই মনে করেন। বিপদে–আপদে তাঁর পাশেও দাঁড়ান।
অফিসের ব্যস্ত সময় হোক, কিংবা হোক দুপুর অথবা রাত— সব সময়ই যান চলাচলের চাপ থাকে বিটি রোডে। বিশেষত বিটির রোডের রথতলা মোড়ের জ্যাম তো নিত্যযাত্রীদের কাছে দৈনন্দিন আতঙ্ক। বছর বারো আগে একদিন হঠাৎই নিজের খেয়ালে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিলেন সঞ্জয়। ময়লা ছেঁড়া পোশাকে বছর পঁয়ত্রিশের সঞ্জয়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখে প্রথমে পাত্তা দেননি কেউই। পরে যখন তাঁরা দেখেন, রীতিমতো পোক্ত হাতে যানজট সামলাচ্ছেন সঞ্জয়, তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সকলেই। সাড়ে চারফুটের এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে দেখে হাসাহাসিও করেছিলেন অনেকে। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও তাঁর যানচলাচল নিয়ন্ত্রণে কোনও খুঁত ছিল না। সঞ্জয়ের কাজ দেখে চমকে যান এলাকাবাসী। সেখান থেকেই শুরু। ওই মোড়ের যানচলাচলের দায়িত্ব এরপর থেকে পাকাপাকিভাবে নিজের ঘাড়েই তুলে নিয়েছিলেন তিনি। কেন হঠাৎ যানচলাচল নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা জেগেছিল?‌ প্রশ্ন করলে কোনও উত্তর দেন না সঞ্জয়। তাকিয়ে থাকেন ফ্যালফ্যাল করে। তবে সঞ্জয়ের প্রতিবেশী তারক বলের কথায়, ‘‌কী ভেবে সঞ্জয় এই কাজ শুরু করেছিল, সেটা আমরা কেউই জানি না। এমনকী ওর বাড়ির লোকও জানে না।’‌ কামারহাটি পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডে বিশ্বনাথপল্লীতেই সঞ্জয়ের বসবাস। বাড়িতে রয়েছেন অসুস্থ বৃদ্ধা মা এবং ভাই। বাবা প্রয়াত হয়েছেন বছর চারেক আগে।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে রীতিমতো দক্ষ হাতেই ট্র্যাফিক সামলান সঞ্জয়। বরং অনেক ‘‌স্বাভাবিক’‌ কর্মীর থেকেও বেশি দক্ষতায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় তাঁকে। সপ্তাহে সাতদিনই নিজের ইচ্ছায় কাজ করতেন তিনি। এমনও নাকি হয়েছে, টানা ২৪ ঘণ্টা সঞ্জয়কে কাজ করতে দেখেছেন এলাকাবাসী। এতক্ষণ ধরে কাজ করতে ভাল লাগে?‌ এতক্ষণে প্রথমবার মুখ খুললেন সঞ্জয়। জড়ানো কণ্ঠস্বরে বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, ‘‌ভাল লাগে। তাই কাজ করি।’‌ কামারহাটি পৌরসভার কর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দা ইন্দ্রনীল গুহরায় বলছেন, ‘সঞ্জয় যানজট সামলানোর কাজ করলেও, ওর বেতন হয় আমাদের পৌরসভার নিকাশি বিভাগ থেকে। ওর দৈনিক বেতন ২৫০ টাকা। মানসিক সমস্যা থাকলেও কেউ কোনও দিন ওকে কাজে ফাঁকি দিতে কিংবা কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দেখেনি। আমাদের উদ্যোগে ওর চিকিৎসাও করানো হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে যখন ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ওর মধ্যে কোনওরকম অস্বাভাবিকতা দেখা যায় না। কাজে ভুলও করে না। কোনও দিন কারও ক্ষতিও করেনি।’‌
বেতন নিয়ে অবশ্য তিলমাত্র মাথাব্যথা নেই সঞ্জয়ের। এমনকী, অনেক সময়ই ‘‌পাগল’‌ বলে বিদ্রুপ করেন। কিন্তু তার জবাবেও কোনও দিন রেগে যেতে দেখা যায়নি সঞ্জয়কে। বরং এলাকায় তুমুল জনপ্রিয় তিনি। তবে কারও সঙ্গে কিছুতেই নাকি কথা বলতে চান না সঞ্জয়। একমাত্র ময়লা উর্দি পরে কাজ করতে বললেই বিরক্তি প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘‌ময়লা উর্দি পরে আমি কাজ করতে পারব না। সকলে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে কাজ করেন। আমিও আমার কাজটা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরেই করব।’‌ বারংবার চিকিৎসা করিয়ে সঞ্জয়কে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে চিকিৎসায় লাভ হয়নি। স্বাভাবিক কথাবার্তা তিনি আজও বলেন না। তীব্র অনীহা অপরিচিত কারও সঙ্গে বাক্যালাপে। জীবনে কোনও চাহিদাও নেই তাঁর। শুধু যেন পরিচ্ছন্ন উর্দি পরে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দাঁড়াতে পারেন কামারহাটি পৌরসভার সামনে— সঞ্জয়ের জীবনে চাহিদা বলতে এইটুকুই।