অরিঘ্ন মিত্র:‌ কণ্ঠস্বর খুব একটা স্পষ্ট নয়। কী বলতে চাইছেন, সেটা বুঝতে একটু সময় লেগে যায়। একটু দ্রুত কথা বলতে গেলেই জড়িয়ে যায় শব্দ। কিন্তু নীরবে মুখ বুজে কাজ করাই যাঁর স্বভাব, কণ্ঠস্বরের প্রতিবন্ধকতা তাঁকে আটকাতে পারে না। জীবনযুদ্ধে কোনও সিনেমার নায়কের মতোই তাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বালির প্রিয়রঞ্জন সরকার। করছেন এমন এক কাজ, যা দেখে সকলের মাথায় শ্রদ্ধায় নুয়ে আসবে। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবসের মতো দিনে প্রচুর মানুষ, বিভিন্ন অফিস, ক্লাব, স্কুল–কলেজে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু সেই পতাকা তোলার পর সেই পতাকার কতটুকু মর্যাদা তাঁরা দিতে পারেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ১৫ই আগস্ট কিংবা ২৬শে জানুয়ারির পরের দিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় অবহেলায় ছিঁড়ে গিয়ে নর্দমায় অথবা রাস্তায় পরে থাকে আমাদের জাতীয় পতাকা। সেই জাতীয় পতাকার মর্যাদারক্ষা করতে এগিয়ে আসেন প্রিয়রঞ্জন, পাড়ায় যিনি পরিচিত মনুদা নামে। বিগত ন’‌বছর ধরে ঘুরে ঘুরে রাস্তা–নর্দমায় পড়ে থাকা পতাকাগুলি তুলে আনেন তিনি।


অথচ এই কাজের শুরুটা সহজ ছিল না। ৩২ বছরের প্রিয়রঞ্জন বলছিলেন, ‘‌আমি আর পাঁচজন মানুষের মতো কথা বলতে পারি না। সেই কারণে ওইভাবে পতাকা কুড়িয়ে নিতে দেখে কেউ আমাকে পাগল বলতো। কেউ ভাবত, আমি বোধহয় কাগজকুড়ানি। কেউ কেউ আবার বিদ্রুপও করতেন। কয়েকবার তো চোর সন্দেহে আমাকে আক্রমণও করা হয়েছে।’‌ তবু হাল ছাড়েননি প্রিয়রঞ্জন যখনই কোনও বাধার সামনে পড়েছেন, ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েছেন, তিনি আসলে কী করছেন। তাতে সুফলও মিলেছে। প্রিয়রঞ্জন বলছিলেন, ‘‌অনেকে আমাকে পাগল বলেন। কিন্তু আমি মনে করি, দেশের জাতীয় পতাকাকে যাঁরা সম্মান জানাতে পারেন না, ব্যবহারের পরে যাঁরা মাটিতে–নর্দমায় অযত্নে ফেলে দেন, তাঁরাই আসলে উন্মাদ।’‌
শৈশব থেকেই ভিন্নভাবে সক্ষম হওয়ার জন্য নানা অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়েছে প্রিয়রঞ্জনকে। তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান। মা আভা সরকার একাই অনেক লড়াই করে চার পুত্রসন্তানসহ তাঁকে বড় করেছেন। ছেলে স্বরযন্ত্রের সমস্যার জন্য প্রতিবেশীরা বিদ্রুপ করতেন তাঁদের। স্কুলে ভর্তি করতে গিয়েও বেগ পেতে হয় আভাকে। প্রথমদিকে কোনও স্কুল ভর্তি নিতে চায়নি প্রিয়রঞ্জনকে। বাড়িতেই মা অনেক চেষ্টায় অল্প অল্প কথা বলতে সেখান। অস্পষ্ট ভাবে হলেও ওভাবেই কিছু কিছু করে কথা বলতে শুরু করেন তিনি। অস্ত্রোপচার করলে হয়তো এই স্বরযন্ত্রের সমস্যা ঠিক হয়ে যেত, কিন্তু তার ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা ছিল না তাঁর মা–র। তাই অস্ত্রোপচারও করানো যায়নি। অস্পষ্ট ভাবে কথা বলতে শুরু করার পরে অনেক কষ্ট করে প্রিয়রঞ্জনকে একটি স্কুলে ভর্তি করাতে সক্ষম হন আভা। কিন্তু সেখানে গিয়ে সহপাঠীদের বিদ্রুপের সামনে পড়তে হয়েছিল তাঁেক। হাসতে হাসতে প্রিয়রঞ্জন বলছিলেন, ‘‌কথা বলার সমস্যা ছিল বলে সহপাঠীরা আমাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করতো। তবে কিছু কিছু সহপাঠী আমার পাশেও দাঁড়িয়েছিল। আমার মা এবং সহপাঠীদের একাংশের সমর্থন আমাকে অনেকটাই মানসিক জোর দিয়েছিল।’‌ সেই জোরকে সম্বল করেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রবেশ করেন প্রিয়রঞ্জন। বালি অ্যাথলেটিক ক্লাবে ফুটবল খেলাও শুরু করেন।


জাতীয় পতাকার সম্মানরক্ষার এই কাজের শুরু কীভাবে?‌ প্রিয়রঞ্জন জানালেন, ‘শৈশবে মা–র সঙ্গে ‌একদিন রাস্তায় হাঁটার সময় দেখেছিলাম, মা রাস্তা থেকে একটি পতাকা কুড়িয়ে নেন। দেরি করে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম বলে তখনও জানতাম না, ওটাই আমাদের জাতীয় পতাকা।’‌ বালক প্রিয়রঞ্জন মা–কে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি ওভাবে রাস্তা থেকে পতাকা কুড়িয়ে নিলেন?‌ ‘‌জবাবে মা আমাকে বলেছিল, এটা আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা। তুমি যেমন আমাকে মা বলে ডাকো, আমাকে ভালবাসো, এই দেশও তোমার আর একজন মা। একেও ভালবাসবে। আমার শরীরে যেমন শাড়ি আছে, ধরে নাও এই পতাকাটা তোমার ওই মা–র শরীরে শাড়ি। যখন যেখানে দেখবে এই শাড়িটা অযত্নে পড়ে আছে, তখনই তুলে নেবে।’ এই শিক্ষা গেঁথে গিয়েছিল প্রিয়রঞ্জনের মনে। পাশাপাশি ভারতীয় সেনার প্রতিও চূড়ান্ত শ্রদ্ধাশীল প্রিয়রঞ্জন। তিনি বললেন, ‘‌ভারতীয় সেনারা দেশের জাতীয় পতাকার সম্মানরক্ষার জন্য অসীম পরিশ্রম করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা পতাকার সম্মান রাখতে পারলে আমরা সাধারণ মানুষরাই বা পারব না কেন?‌ এই চিন্তাটাও কিন্তু আমাকে জাতীয় পতাকা নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’‌ দেশসেবামূলক কাজ করলেও কোনও রকম রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না প্রিয়রঞ্জন। মনে করেন ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি যাঁরা করেন, তাঁরা প্রকৃত দেশপ্রেমী নন। বললেন, ‘‌ছোট থেকে আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিক্ষা পেয়ে এসেছি। এই দেশ হিন্দু–মুসলিম সকলের। দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে যাঁরা বিভাজনের রাজনীতি করেন, তাঁরা স্বাধীনতার মানেই বোঝেন না। দেশের ভালর জন্য প্রত্যেক নাগরিকের নিজের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। নিজের মতপ্রকাশ করলেই যদি আমাকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই তকমা আমি মাথা পেতে নিতে রাজি।’


বালির শান্তিরাম বিদ্যালয় থেকে পাশ করে হুগলী জেলার ভদ্রেশ্বরে সুকান্ত কলেজে স্নাতকস্তরের পড়াশোনার জন‍্য ভর্তি হন প্রিয়রঞ্জন। সেই সময় থেকে একা সাইকেলে লোহার রডে বস্তা ঝুলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন স্বাধীনতা দিবস কিংবা প্রজাতন্ত্র দিবসের পরের দিনগুলোতে। সকাল বেলায় বেরিয়ে বালি, লিলুয়া, ডানকুনি এবং চারপাশের হুগলী জেলার কিছুস্থান থেকে রাস্তায় পরে থাকা জাতীয় পতাকা তুলে নিয়ে আসতেন বাড়িতে। পাঁচবছর ধরে একা একাই এই কাজ করতেন তিনি। ধীরে ধীরে তাঁকে দেখে এগিয়ে আসেন আরও কিছু মানুষ। সাড়া পেয়ে কলেজের কিছু বন্ধুদেরও তাঁর সঙ্গে পথে নামার আহ্বান জানান প্রিয়রঞ্জন। বন্ধুকে ফেরাননি সহপাঠীরা। এগিয়ে আসেন তাঁরাও। করার সময় তাঁকে রাস্তায় দেখে রাস্তাতেই কিছু মানুষ এগিয়ে আসেন এবং তাঁর সঙ্গী হন। মায়ের পরামর্শে কলেজের কিছু বন্ধুদের এই কাজের জন্য আহ্বান করেন। এখন প্রিয়রঞ্জন এবং তাঁর সঙ্গীরা স্বাধীনতা দিবস কিংবা প্রজাতন্ত্র দিবসের পরের দু’‌–তিনদিন ধরে মিছিল করে বেরিয়ে আলাদা আলাদা দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে পড়ে থাকা পতাকা সংগ্রহ করেন। প্রিয়রঞ্জন বললেন, ‘‌ছেঁড়া হোক বা আস্ত— পতাকা যেভাবে পাই, সেভাবেই তুলে নিই। এই কাজ করতে গিয়ে দেখেছি জাতীয় পতাকা কেউ টুকরো করে ছিঁড়ে দিয়েছে। কেউ কেউ আবার পতাকার ওপর গুটখা–পানের পিক ফেলেছেন। অনেকেই একদিনের জন্য লোক দেখানো দেশপ্রেমে বিশ্বাস করেন। তাই জাতীয় পতাকা নিয়ে ছেলেখেলা করেন। এইসব করতে গিয়ে তাঁরা দেশমাতাকে অপমান করেন, সেটা কেউ বোঝেন না।’ আমজনতার কাছে প্রিয়রঞ্জনের অনুরোধ, ‘‌যদি সম্মান না করতে পারেন, তাহলে পতাকা ব্যবহারের কী দরকার? আমার এই কাজের জন্য কোনও সংবর্ধনা চাইনা। যারা মনে করেন আমায় সংবর্ধনা দেওয়া উচিৎ, তাঁরা যেন নিজেরা অঞ্চলে এই কাজের উদ্যোগ নেন।‌’‌