শবনম দত্ত, লন্ডন-  বাঙালির সুইস ব্যাঙ্কে টাকা নেই, বাঙালির অলিম্পিক্সে গোল্ড মেডেল নেই, বাঙালির আরও কত কিছু যে নেই,  সেসব গুনে শেষ করা যাবে না। এক্ষুনি বলবেন তো, বাঙালির কী কী আছে সে লিস্ট ঢের বেশি লম্বা? আমিও মানি সে কথাটা। আর তার চেয়েও যেটা বেশি মানি, সেটা হল, বাঙালির সবচেয়ে বড় থাকাটা হল দুর্গাপুজো। বছরের এই পাঁচটা দিন আমরা রূপকথায় বেঁচে নিই। স্হান-কাল-পাত্রের হিসেবে রূপকথার রং বদলায় এই যা। কিন্তু রং ফিকে হয় না। আর তাই বোধহয় প্রবাসের কয়েকজন পাগল বাঙালি ছুটির বা বসের চোখরাঙানির তোয়াক্কা না করে, দেশ থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পারে বসে প্রতিমা থেকে নীল পদ্ম, নবপত্রিকা থেকে গণিকালয়ের মাটি, সবকিছু জোগাড় করার ঝক্কি নিয়ে মেতে ওঠেন পুজোয়। হোক না সে সুদূর বিলেত। কলকাতার তুলনায় লন্ডনের পুজোয় চাকচিক্যে কমতি থাকতে পারে। কিন্তু, উন্মাদনায় যে তিলমাত্র ফারাক পাবেন না, একথা বাজি ধরে বলতে পারি।

প্রবাসের পুজো আমি প্রথম দেখেছিলাম ইংল্যান্ডের পেট বরাবর থাকা লিডস শহরে। তারপরের বেশ কয়েক বছর কাটে নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক, কলম্বাসের পুজো দেখে। তারপর পড়াশোনা করতে পৌঁছে গেলাম ইংল্যান্ডে। এক সেপ্টেম্বরের শীত শুরু হয়ে যাওয়া বৃষ্টিভেজা দিনে। তিন সপ্তাহের মাথায় পুজো। গদগদ হয়ে আবিষ্কার করলাম লন্ডনে পুজো হয় কোলকাতার মতন পাঁচ দিন ধরে। প্রবাসের অনেক পুজোই দায়সারা ভাবে সপ্তাহান্তের দু’দিনে সারা হয়। লন্ডন কিন্তু ওসবে বিশ্বাস করে না। পাঁচদিনের পুজো মানে এখানে পাঁচদিনের পুজোই। উইকেন্ড পুজো করে শর্টে সারিতং নয়।

প্রথম দেখেছিলাম স্লাও হকি ক্লাবের বিবিএ-র পুজো। ওই পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা চন্দ্রদীপদা, যাদবপুরের অ্যালামনি, পূর্বপরিচিত। গিয়ে মনে হল গল্পের বইয়ে পড়া পুজোর মধ্যে ঢুকে পড়েছি। কোলকাতাতেও কোনওদিন এ অভিজ্ঞতা হয়নি যে কাকিমা-মাসিমারা বাড়ি থেকে মিষ্টি, নোনতা সব কিলোদরে বানিয়ে এনেছেন এবং চেনা অচেনা প্রত্যেককে বলছেন, ‘ভোগের দেরি আছে, একটু খেয়ে নাও।‘ সেই শুরু। তারপর গত সাত বছরের মধ্যে একবারই খালি যেতে পেরেছিলাম কোলকাতার পুজোতে। বাকি কেটেছে লন্ডনের পুজোতেই। লন্ডন জুড়ে না হোক ১৫-২০ টা পুজো হয়ই। পুজোর সংখ্যা আরও বেড়েছে শেষ ক’বছরে। কোলকাতার মতো এখানেও সব পুজোর কিছু না কিছু নিজস্বতাও আছে। চোখ, নাক, কান একটু খুলে রাখলেই সেটা ধরা দেয়। হাউন্সলোর পুজো শুরু হল আমারই চোখের সামনে, ২০১২ তে। আমারই প্রাক্তন পেশায় থাকা জনতার হাত ধরে। মানে, যাঁদের আপনারা আইটি-র ভাইটি বলে চেনেন, তাঁরাই এ পুজোর হোতা।

ইলিংয়ের পুজোতেও প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের অবদান প্রচুর। এ পুজোগুলোয় জেন ওয়াইয়ের উচ্ছাস আপনাকে ছোঁবেই। অন্যদিকে হ্যারোর পুজো মানে বনেদিয়ানার ছোঁয়া একটু সিনিয়ারদের হাত ধরে। স্লাওয়ের পুজোর কথা তো আগেই বলেছি। হ্যাম্পস্টেড হিথের পুজোয় আন্তরিকতাটুকু চুঁইয়ে পড়ে যখন পুজো কমিটির প্রতিটি লোক এসে জনে জনে বলে যান, ‘না খেয়ে যাবেন না কিন্তু।‘ ইলফোর্ডের পুজোর ঘরোয়া মেজাজ আপনাকে জারিয়ে নেবেই। সবটুকুই কি আলো? একটু আঁধার তো থেকেই যায়, তাই না? দুনিয়ার নিয়মই তো তাই। তাই বোধহয় নর্থ লন্ডনের অন্যতম বড় পুজো ক্যামডেন মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধির উপর ভরসা না রাখতে পেরে ঢোকার মুখে চাঁদা নিয়ে জবরদস্তি করে। এ বছর তো রীতিমতন এন্ট্রি ফ্রি নিচ্ছে। তা সে যাক। সবটুকুই কি আর মনমতো হয়? এ বছরের মতো আমার পুজো দেখা শেষ। জানি না, পরের বার পুজোতে দেশে যেতে পারব না এখানে থাকব। তবে আশা করব লন্ডনের পুজোর আরও শ্রীবৃদ্ধি হবে, আমাদের ছানাপোনাগুলো ক্রিসমাস আর হ্যালোউইনের পাশাপাশি দুর্গাপুজোটাকেও বুকের ভেতর পাবে। আর আজ থেকে একশ বছর পরেও দূর্গাপূজার রূপকথাটা বেঁচে থাকবে এমন করেই।