তমাল পাল:‌ তিনি কাজ করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন দিনের যতটা বেশি সম্ভব, যত বেশিজনের সম্ভব চিকিৎসা করতে। কিন্তু তাঁর কাজের চাপ নেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রাণশক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে পারতেন না সহকর্মীরা। বরং সৌরেন্দ্রমোহন গোস্বামীর এই বেশি কাজ করার চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে রীতিমতো বিরক্তই হতেন সহকর্মীরা। সেই কারণই কর্মক্ষেত্রে বারবার সহকর্মী ও কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূল হতে হয়েছে তাঁকে। ফল হিসেবে অজস্রবার একের পর এক হাসপাতাল থেকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে সৌরেন্দ্রমোহনকে। তবুও থামেননি ৫৯ বছরের এই চিকিৎসক। সরকারি চিকিৎসার পরিকাঠামোর উদাসীনতায় বিরক্ত হয়ে সরকারি চাকরি ছেড়েছেন ঠিকই তবে নিজের উদ্যোগে করে বেড়াচ্ছেন নানারকম সমাজসেবামূলক কাজ। শুধু পুজোর মরশুমই নয়, গোটা বছরই প্রতি সোমবার কুমোরটুলিতে মৃৎশিল্পীদের চিকিৎসা করেন তিনি। তাও আবার একেবারে নিখরচায়!‌


সৌরেন্দ্রমোহন মনে করেন, বর্তমানে রোগীর অনুপাতে এ রাজ্যে চিকিৎসকদের সংখ্যা খুবই কম। তাই সঠিক পরিষেবা দিতে হলে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকদের কাজ করতে হবে ঝড়ের গতিতে। দিনে গড়ে দু’‌টি অস্ত্রোপচার করেন সৌরেন্দ্রমোহন। পাশাপাশি দেখেন জনা পঁচিশেক রোগীও। ১৯৮৫ সালে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করার পরে শল্যচিকিৎসায় এমএস পাশ করেন এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে। এরপরে এমসিএইচ করেন এনআরএস হাসপাতাল থেকে এবং ডিজিও করেন তাঁর পুরনো হাসপাতাল আরজিকর থেকে। কিন্তু তারপরেও প্রাইভেট প্র্যাকটিস না করে বেছে নিয়েছিলেন সরকারি হাসপাতালকেই। সৌরেন্দ্রমোহন বললেন, ‘‌আমার সব সময়েই মনে হতো, সরকারি হাসপাতালে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ চিকিৎসাপরিষেবা নিতে আসেন, তাঁদের ঠিক মতো সময় দিয়ে দেখতে হলে আমাদের আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে। নিজেদের কাজের গতি বাড়াতে হবে। আমি চাইতাম যত বেশি সংখ্যাক রোগীকে একদিনে দেখতে পারি। কিন্তু এই মানসিকতায় হাসপাতালের অনেকেই বিরক্ত হতেন।’ আর এই মানসিকতার কারণেই বারবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চক্ষূশূল হতে হয়েছে সৌরেন্দ্রমোহনকে। কখনও‌ এনআরএস কখনও এসএসকেএম, আবার কখনও মেডিক্যাল কলেজ তো কখনও লেডি ডাফরিন হাসপাতাল কিংবা হাওড়া জেলা হাসপাতাল— বারবার বদলির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। হাসতে হাসতে সৌরেন্দ্রমোহন বলছিলেন, ‘‌আমি একজন চিকিৎসক। অলসের মতো বসে থাকা আমার কাজ নয়। যত বেশি মানুষের যত দ্রুত চিকিৎসা করা সম্ভব, আমি সেটাই করব। আসলে আমি যদি বেশি কাজ করি, তাহলে তো হাসপাতাল, নার্স, ওটি টেকনিশিয়ান— সবাইকেই বেশি কাজ করতে হবে। এটাই অনেকের পছন্দ হতো না।’‌ সৌরেন্দ্রমোহনের আক্ষেপ, তাঁর এই বেশি কাজ করার প্রবণতাকে ভাল চোখে দেখেনি স্বাস্থ্যভবনও। সৌরেন্দ্রমোহনের দাবি, ২০১৩ সালে তাঁকে ডেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, বেশি কাজ করা না থামালে কোনও প্রত্যন্ত গ্রামে বদলি করে দেওয়া হবে তাঁকে। তাতেও দমেননি সৌরেন্দ্রমোহন। হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন, ‘‌করে দিন। আমার কোনও আপত্তি নেই।’‌ তবে সহকর্মীদের অসহযোগিতা ও দীর্ঘসূত্রিতায় বিরক্ত হয়ে ২০১৫ সালে কোন্ননগরের হারানচন্দ্র ব্যানার্জি লেনের বাড়িতেই প্রাইভেট প্র্যাক্টিস শুরু করেন।


সৌরেন্দ্রমোহন ২০০৩ সাল থেকে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী সমিতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, ‘শিল্পীরা তো সারা বছরই কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকেন, তাই আলাদা করে ওঁরা আর কাজ ফেলে চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে পারে না। তাই প্রতি সোমবার শিল্পীদের চিকিৎসার জন্যই কুমোরটুলিতে আসা। আর এই সময়ে শিল্পীরা ছাড়াও, যাঁরা ঠাকুর বহন করে মণ্ডপে নিয়ে যান, তাঁদের প্রায়শই হাত, পা কেটে যায় প্রায়। অনেকে ভারী প্রতিমা তুলতে গিয়ে আঘাতও পান। তাই আমি মহালয়া থেকে প্রতিদিন ক্যাম্প করে ওঁদের চিকিৎসা করি।’‌ কুমোরটুলিতে চিকিৎসা করার জন্য কোনও পারিশ্রমিক নেন না সৌরেন্দ্রমোহন। ওষুধও বিতরণ করেন বিনামূল্যে। কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক রঞ্জিত সরকার বলছেন, ‘ডাক্তারবাবু (‌সৌরেন্দ্রমোহন)‌ যে শুধু শিল্পী কিংবা প্রতিমাবাহকদের চিকিৎসা করেন, সেটাই নয়। স্থানীয় মানুষ, যাঁরা অন্য পেশার দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাও বিনামূল্যেই করেন।’‌