নিউজপোল ডেস্ক: তখনও উত্তমকুমার হিসেবে পরিচিতি হয়নি তাঁর। পাড়ার লোকজন তাঁকে অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় নামেই চেনে। কিন্তু তখনও, পুজোর সময় ভবানীপুরের গিরীশ ভবনের ঠাকুরদালানে মঞ্চেই পাওয়া যেত তাঁকে। সেখানেই অভিনয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল উত্তমকুমারের।

প্রতিবছরই পুজোর সময়ে ঝাড়পোঁছ করে ঠিকঠাক করা হয় এই ঠাকুরদালান। এখনও বাঁধা হয় অস্থায়ী মঞ্চ। জগদ্ধাত্রী পুজোর রাত্রে মুখোপাধ্যায় বাড়ির যাত্রাপালার প্রথা আজও চলছে বহাল তবিয়তে। দুর্গা পুজোর সময় থেকেই শুরু হয় মহড়া। সেই সময়, পাড়ার বাকি তরুণদের মতো, উত্তরকুমারও খুবই উৎসাহী ছিলেন নাটক-থিয়েটার-যাত্রা নিয়ে। এই গিরীশ ভবনের ঠাকুরদালানের যাত্রায় প্রতি বছর অংশগ্রহণ করতেন মহানায়ক। পুজোর সময় থেকেই তোড়জোড় পড়ে যেত কাজের। শুধুই কি যাত্রার মহড়া? পাশাপাশি ছিল শাড়ি-ধুতি এবং অন্যান্য ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়ে অস্থায়ী মঞ্চ বাঁধার কাজ। সংলাপ মুখস্থ করা, অঙ্কের পর অঙ্ক ঝালিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলত দেদার আড্ডা। সঙ্গে অবশ্যই অগুন্তি পেয়ালা চা।

এই মঞ্চে নিজের অভিনয়ের জোরে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেওয়াই অভিনেতা হওয়ার ভরসা জুগিয়েছিল সেদিনের অরুণকুমারকে। তাঁর অভিনয়ের দক্ষতা অত অল্প বয়েসেও মন কাড়ত দর্শকদের। শুধু অভিনয়ই নয়, ধীরে ধীরে সমস্ত দায়িত্বই ন্যস্ত হল তাঁর কাঁধে। চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা বাছাই করে নেওয়া, দিনের পর দিন নির্দেশনা দিয়ে মহড়া করানো থেকে জগদ্ধাত্রী পুজোর রাতে পর্দা ওঠা পর্যন্ত সমস্ত কিছুই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করতেন উত্তমকুমার। সেই সময়কার বহু জনপ্রিয় যাত্রাপালাই অভিনীত হয়েছে এই মঞ্চে— ব্রজের কানাই, স্বয়ংসিদ্ধা, গয়াসুর বোধ, নটি বিনোদিনী ইত্যাদি।

পরবর্তীকালে খ্যাতি এসেছে দু’হাত ভরে। কিন্তু নিজের অভিনয়ের এই শিকড়কে কখনওই ভুলে যাননি উত্তমকুমার। অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে আসা ছাড়াও, পেশাগত সাফল্যের শীর্ষে থাকাকালীনও তিনি চলচ্চিত্রের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন এখানকার যাত্রা অনুষ্ঠানে। ১৯৭৫ সালে শেষবারের মতো এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করেন উত্তমকুমার। ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির মহানায়ক। ঠিক সেই পুজোর আগেই মুক্তি পেয়েছিল তাঁর ছবি ‘সন্ন্যাসী রাজা’। ১৯৮০ সালে, প্রয়াত হন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার। কিন্তু ভবানীপুরের গিরীশ ভবনের এই ঠাকুরদালান আজও বুকে করে রেখেছে তাঁর স্মৃতি। একটি সাধারণ ছেলের অসাধারণ হয়ে ওঠার লোকগাথা।