অর্পণ গুপ্ত:‌ অনুচ্চারিত সত্য সামনে আনা? নাকি নিখুঁত বুনোটের চিত্রনাট্যে ফেলে দেওয়া সত্যের ছাঁচ, যা কি না দর্শক নিজেই নিজের চোখ দিয়ে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নেবেন? এই আলো আঁধারির দ্বন্দ্বই কিন্তু ইউ এস পি হয়ে থাকল সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের বহুপ্রতীক্ষিত ছবি গুমনামিতে।

নেতাজি অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান সূত্রের খোঁজে যে তিনটি কমিশন গঠিত হয়েছিল তার প্রথম দু’‌টি হল সাহানাওয়াজ কমিশন ও খোসলা কমিশন। এই দুই কমিশনের রিপোর্টেই বলা হয়েছিল তাইহোকু বিমান দূর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর কথা। কিন্তু মুখার্জি কমিশনের রিপোর্টে আসে উত্তরপ্রদেশের গুমনামি বাবা হয়ে নেতাজির ফিরে আসার প্রসঙ্গ।


এই মুখার্জি কমিশনের রিপোর্টই হয়েছে গুমনামির চিত্রনাট্যের মূল কাঠামো। চন্দ্রচূড় রায়ের নেতাজি কমিশন গঠন ও নিজের সর্বস্ব দিয়ে নেতাজি গবেষণায় জড়িয়ে পড়া আসলে নিজের ভেতর নিজেকে অবিরাম খুঁজে চলার এক দুরন্ত মার্গ। এখানেই ক্রমশ অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অভিনয় দক্ষতার ম্যাজিকে সম্মোহিত হয়ে যান দর্শক। নেতাজির চরিত্রে প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়ের মেক আপ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। প্রসেনজিৎও যথাযথ। বরং প্রশংসার দাবিদারই বলা চলে। তবে চন্দ্রচূড়ের জোরালো সংলাপের পাশে বেতাজির স্বকণ্ঠে রাখা সংলাপগুলি বেশ দুর্বল।


সংলাপ বরাবরই সৃজিতের ‘‌প্লাসপয়েন্ট’‌। সেখানে নেতাজির মতো চরিত্রকে হাতের মুঠোয় পেয়েও এতোটা ‘‌ক্যাজুয়াল’‌ কেন সৃজিৎ?‌ এক যে ছিল রাজার আবহসঙ্গীত যেখানে চমকে দিয়েছিল, সেখানে গুমনামীবাবার কপালে আবহসঙ্গীতে এত হেলাফেলা কেন?‌ এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু অধরাই রয়ে গেল।
যদিও এই কাহিনীতে কিন্তু মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট সম্পূর্ণ হয়েও হল না। বরং আরও বেশি করে উঠে এলেন অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষ। যাঁদের যোগফলেই কাহিনীর নায়ক চন্দ্রচূড় ধর। অনুজ ধরের কনুনড্রমের গন্ধ লেগে রইল চিত্রনাট্যের পরতে পরতে। এক অন্ধকার রাজনৈতিক রহস্য,তিরিশের দশকে ভারতের বিপ্লবের আইকন হয়ে ওঠা সুভাষের কংগ্রেস থেকে ইস্তফা ও জাপান থেকে অন্তর্ধান আজও এক বিষ্ময়। দেশের প্রতিটি মানুষ এই অন্তর্ধানের রহস্য উন্মোচনের অপেক্ষায় রয়েছেন বহুবছর ধরে, সৃজিত এই পর্দা উন্মোচন না করে বরং পর্দার ভেতর থেকে ক্রমশ গাঢ় করে ফুটিয়ে তুলেছেন এক প্রকাণ্ড অবয়ব, এক দীর্ঘ ছায়া। যা দর্শককে পর্দায় আকর্ষণ করে রাখে গল্পের একেবারে গভীরে থাকা রহস্যে। এক অনুচ্চারিত সত্যের নিরন্তর প্রতীক্ষায়। সেই চৌম্বক আকর্ষণ ধরে রাখতে ‘‌ফার্স্টবয়’‌ কিন্তু পেরেছেন।

‘‌বাইশে শ্রাবণ’‌–এর মতো ওভারসিজ পিচে দুরন্ত সেঞ্চুরি না হলেও মন্থর পিচে তথ্য ও বিশ্লেষণের সঙ্গে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অভিনয় বাজিমাত করেছে। কিন্তু সংলাপ ও আবহ সঙ্গীতের দুর্বলতা কিন্তু নজর এড়াবে না সমালোচকদের। তবে এক্ষেত্রেও অ্যাডভ্যান্টেজ নেতাজি। এই তিনটি অক্ষরই দর্শক টানার ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা সুবিধা করে দেবে পরিচালককে নির্দ্বিধায়। সেটার কাঁধে ভর করেই সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় এবারের মতো উৎরে গেলেন।

নিউজপোল রেটিং:‌ ★★★★★★/১০