স্বর্ণালী তালুকদার:‌ পেঁচার ডাক নাকি অশুভ। নিশাচর এই পাখিটি নাকি শয়তানের দাসী!‌ আবার, পেঁচার ডাক নাকি বয়ে আনে দুঃসংবাদ। আবার কালাজাদুতে করতেই সাহায্য করে পেঁচা। এরকমই নানা কুংসস্কার রয়েছে এই পাখিটিকে নিয়ে। আবার সেই পেঁচায় মঙ্গল ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে গেল এই প্রাণী?‌ কীভাবেই বা পেয়ে গেল দেবীর বাহনের পদ?‌
পৌরাণিক কাহিনী বাদ দিলেও এর পিছনে রয়েছে নিতান্তই বৈজ্ঞানিক কারণ। বাঙালির সভ্যতার উন্মেষ অনেকটাই কৃষিভিত্তিক। কৃষিসম্পদে ফুলেফেঁপে ওঠাটাকেই বরাবর বাঙালি তাদের প্রাথমিক সমৃদ্ধি হিসেবে মনে করেছে। এমনকী লক্ষ্মীপ্রতিমার সঙ্গেও ধানের ছড়ার (‌যা কিনা বাংলা প্রধান কৃষিজ ফসল)‌ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ধান এবং অন্যান্য ফসল রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই পেঁচা। নিশাচর এই পাখি কীটপতঙ্গের বিনাশে সিদ্ধহস্ত। শুধু কীটপতঙ্গই নয়, রাতের বেলায় শস্যক্ষেত্রে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো ছোট ছোট ইঁদুর, খরগোশ, বেজির মতো প্রাণীকে নিজের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এরা শস্যের ক্ষতি করে থাকে। খাদ্যশৃঙ্খলার সর্বোচ্চ খাদক পেঁচা পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রক। বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষে বসে থাকা এই শিকারী পাখি স্বভাবে লাজুক এবং নির্জন অঞ্চলের গাছের কোটরে বসবাস করতে ভালোবাসে।
কীটপতঙ্গের বিনাশ ছাড়াও শস্যের ফলন উন্নত করার বিষয়েও পেঁচার অবদান আছে। ফসলের মূল শত্রু মেঠো ইঁদুর শিকার করার বিষয়ে পেঁচার থেকে ভাল শিকারি আর হয় না। একটি পেঁচা বছরে গড়ে তিন হাজার ইঁদুর মারার ক্ষমতা রাখে। একটি পূর্ণবয়স্ক পেঁচা থাকা মানে বছরে ৩৫ লক্ষ টাকার ফসল নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া। কী করে এই বিপুল পরিমাণ শস্য বাঁচায় পেঁচা?‌ প্রকৃতিই তাকে এই ক্ষমতা দিয়েছে। পেঁচা তার মাথাকে ১৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত দু’‌দিকে সমানভাবে ঘোরানোর ক্ষমতা রাখে। যার ফলে সে তার কাঁধের পেছনেও তাকিয়ে কোনও বস্তুর চলনকে চিহ্নিত করতে পারে। শুধু তাই নয়, খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ খাদক হওয়ায় খাদ্যশৃঙ্খলের একাধিক শাখায় এর অবাধ বিচরণ। সাপ থেকে শুরু করে বেজি— সবধরনের প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। আর এইভাবে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।

পৃথিবী জুড়ে পেঁচার প্রায় ২০০ রকমের প্রজাতির বাস রয়েছে। যার মধ্যে সুমেরুতে বসবাসকারী তুষার পেঁচা বিরল প্রজাতির। বাংলার লক্ষ্মী পেঁচার আর এক নাম বার্ন আউল, যাকে আমরা মা লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে দেখতে পাই। বাংলা সাহিত্যে পেঁচা নিয়ে বহু কবিতা, গল্প লেখা হয়েছে। যদিও কালের নিয়মে সবই বিলুপ্ত হচ্ছে।

মিশরীয় সভ্যতায় M শব্দটির প্রতীক ছিল পেঁচা। গ্রীক পুরানে পেঁচা দেবীর এথেনার বাহন এবং জ্ঞানের দেবী হিসেবে পুজিত হতো। অন্ধকারে দেখতে পাওয়ার এই বিশেষ ক্ষমতাই শিক্ষাকে অন্ধকারের মধ্যেও আলোর দিশা দেখায়। তাই দেবী এথেনার প্রতিমূর্তি পেঁচা। শুধু তাই নয়, অধুনা গ্রীসের ১ ইউরোর মুদ্রায় দেখা যায় পেঁচার ছবি। যে লক্ষ্মী লাভের আশায় আমরা মা লক্ষ্মীকে পুজো করি, তার বাহন কিন্তু সেই কাজই করে। তাই পেঁচা মোটেও অশুভ নয়, বরং তার অতন্দ্র প্রহরার কারণে পরিবেশ এখনও সুরক্ষিত, আমাদের খাদ্য সুরক্ষিত।