অনিকেত মহাপাত্র: হাঁটছিলেন জীবনানন্দ দাশ। ১৮৩, ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে। সাল ১৯৫৪, ১৪ অক্টোবর। এই হাঁটার অভ্যেস ছিল কয়েক দশকের। বরিশালের রাস্তাতে হাঁটতেন। হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে যেতেন সাঁকো, নদী। আপন মনে হাঁটার সময় খেয়াল থাকত না কত দূর এলেন! তাঁর ঈষৎ মুখচোরা স্বভাবের কথা জানতো অনেকেই। তাই পরিচিত কেউ এলো কিনা, তাকে দেখে সামাজিকতার দায়ও ততটা ছিল না। কয়েক দশক পেরিয়ে কলকাতার রাস্তায় হয়তো সেই বরিশালের স্মৃতি জাগ্রত হয়েছিল। স্মৃতিকাতর তিনি।

কখন মানুষ এমন স্মৃতিতে ডোবে? যখন বর্তমানটা বোধহয় অতটা সুখের হয় না। তখন। অসুখী দাম্পত্য বেদনা দিয়েছে। তাঁর চারদিকে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস জুড়ে ছিল। এই কবি কোনওদিনই ঠিক মনের মতো হয়ে উঠতে পারেননি স্ত্রীর কাছে। সেই অর্থে রূপ ছিল না। ছিল না প্রতিভা নিয়ে জাহির। নিজের ঢাক নিজে পেটানোর যুগ তো খালি এখন নয়। এটি চিরকালের বাস্তবতা । অন্তর্মুখী স্বভাব দিয়ে আবৃত থাকতো তাঁর প্রতিভা। তাই দিনের শেষে তিনি ছিলেন এক অসহায় মানুষ, অযোগ্য স্বামী কিংবা বাবা। তাঁর স্ত্রীর নিজেকে বঞ্চিত ভাবার কারণে তৈরি হওয়া উত্তাপ তাঁকে পুড়িয়েছে।

আবার সমান্তরাল ভাবে সঞ্চারিত হয়েছে সন্তানের মধ্যে। তাঁদেরকেই-বা দোষী ঠাওরালে হবে কী করে! সংসার নামের বিষয়টির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কিছু প্রত্যাশা ও তার অপূর্ণতায় নেমে আসা প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক। জীবিকা কিংবা আর্থিক স্বাবলম্বনের ঋণাত্মক মাত্রাটি প্রায় সারাজীবন তাঁর পিছু তাড়া করেছে। চাননি কলকাতা ছেড়ে থাকতে। তাই অন্য প্রদেশে জীবিকার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। আর কলকাতা বা কলকাতা লাগোয়া অঞ্চলের বিভিন্ন কলেজে পড়িয়েছেন। কিন্তু আর্থিক দিক থেকে সুরাহা হয়নি। তাছাড়া পীড়িত হচ্ছিলেন জনৈক প্রতিবেশীর দ্বারা। যেন অন্ধকার ও বন্ধ ঘরে আটকে পড়েছেন কবি।

যে ঘরের দু’টি মাত্র জানালা। কবিতা অর্থাৎ কবিতা লেখা এবং হাঁটা। তাঁর সেই অন্ধকার ঘরে আটকে পড়ার ছাপ পড়ত কবিতায়ও। তাই তো এত বিষণ্ণতা কবিতায়, কবিতায়! এত ক্লান্তি! বাস্তবতাকে বিস্মৃত হবার যে তাড়না, তার আয়োজনে কোনও খামতি ছিল না। তাই দক্ষিণ কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ঘটে গেল ট্রামে কাটা পড়ার মতো বিরলতম ঘটনা। অন্তত কলকাতার ট্রামের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী। এটি কী দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা? সুইসাইড নোট রেখে যাননি কবি। কবিতাকে যদি সুইসাইড নোট ধরেন তাহলে বিষয়টি আলাদা। মৃত্যু-সচেতনতা তাঁর কবিতায় বহুভাবে এসেছে।

মৃত্যু-রেখাগুলিকে সযত্নে এঁকে ঢুকিয়ে রাখতেন তাঁর সেই বহুল-চর্চিত ট্রাঙ্কে। হয়তো কবিতা ছাড়িয়ে, ট্রাঙ্কের আগল এড়িয়ে সেই মৃত্যু চড়ে বসেছিল তাঁর কাঁধে। তাই এই বিরলতম দুর্ঘটনাকে বরণ করে নেওয়া। দক্ষিণ কলকাতার ট্রাম লাইন যেন হয়ে উঠেছিল যম-নগরীর দক্ষিণ দ্বার। যেন টাইম-মেশিনে করে অতীতে, কয়েক দশক পেরিয়ে চলে গিয়েছিলেন বরিশালের রাস্তায়। ভয়-ভাবনা কিছুই ছিল না। ট্রাম লাইন যেন সরু গ্রাম্য পথ। অতীত আর বর্তমানের সংঘর্ষ হল। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় যে হাজার বছরের পথ হাঁটার কথা বলা আছে তাতে পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশনের সময় ধরা নেই। তা ধরলে আরও হাজার বছর লেগে যাবে।

এই ক্ষেত্রেও যেমন মানস-ভ্রমণ আর বাস্তব-ভ্রমণের দ্বান্দ্বিক অবস্থানের বিষয়টি দেখা যায়, বরিশালের পথ আর শহর কলকাতার পথের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই। ট্রামের ঘণ্টার শব্দ, পথচলতি মানুষ ও চালকের চিৎকার কোনও কিছুই তাঁকে আর কলকাতার রাস্তার বাস্তবতা স্মরণে আনাতে পারেনি। তারা ভেবেছিল আহাম্মক কিংবা পাগল, নিদেনপক্ষে কালা। শরীর ঢুকে গিয়েছিল ক্যাচারের মধ্যে। টেনে -হিঁচড়ে বার করে আনতে হয়। পাঁজর, কোমর ভেঙে গেছে। সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত। ভর্তি করা হয়েছিল শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে। আর মারা যান অক্টোবরের ২২ তারিখ।

মৃত্যুর পরে যখন সেই সময়কার অনেক সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব জড় হন সেইদিন হয়তো তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশের প্রথম মনে হয় তাঁর স্বামী বড় সাহিত্যিক ছিলেন! না-হলে দিকপালেরা উপস্থিত হবেন কেন! তবে তাতেই শেষ নয়। মৃত কবির ভ্রাতৃ-প্রতিম জনৈক ব্যক্তিকে বলেন যে কবি সাহিত্য-ক্ষেত্রে হয়তো অনেক কিছু রেখে গেলেন কিন্তু আমাদের জন্য! এই বৈষয়িক জিজ্ঞাসা সত্য কিন্তু এর প্রাবল্য কবিকে সেই পথের দিকে নিয়ে গেছে, যে পথ যায় মৃত্যুর দিকে। কবি-স্বভাবের মধ্যে এর বীজ ছিল। তাঁর প্রতিবেশ সেটিকে ত্বরান্বিত করেছিল। হয়তো নীল মৃত্যুও তাঁর কাছে আর এক জীবন। যা আপাত-বাঁচা থেকে আরও নিবিড় ও আকাঙ্ক্ষিত।