অনিকেত মহাপাত্র: ‘রমতা যোগী আউর ব্যহেতা পানি’ এই কথাটি মনে প্রায়শ উঁকি দেয়। যে কোনও রকম সৃষ্টিকর্মের জন্য এক নিরাসক্ত মন দরকার। মনে ময়লা পড়ে না, স্রোতে শ্যাওলা পড়ে না যদি গতিশীল থাকা যায়। হয়তো মন ভ্রাম্যমাণ থাকে অনেক সময় কিন্তু দেহের স্থিতি কখনও কখনও মনকে শ্লথ করে দেয়। তাই ঘুরে বেড়াতে হয়। আর আমার নামেই আঁকা রয়েছে অস্থিরতার সংকেত। সমস্ত বিশ্বটাই বাড়ি।

সেই কারণেই এই কোভিড পরিস্থিতি ও একটি নির্দিষ্ট পরিসরে নিজেকে আটকে ফেলা আমার জন্য বড়ই যন্ত্রণার। কবে সব ঠিকঠাক হবে তার ইয়ত্তা নেই। সব মিলিয়ে অবস্থা সঙ্গিন। অগত্যা মুক্তির খোঁজ বিগত ভ্রমণ-অভিজ্ঞতায় ডুবে গিয়ে। তবে সহজ পথের পন্থী আমি নই। তাই বেশ রোমাঞ্চ জাগানো কোনও গন্তুব্যের কথাই বলব। রাজনীতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক -প্রেক্ষিত প্রভৃতির নিরিখে যে কাশ্মীর বহুচর্চিত সেই গন্তব্য নিয়েই আমাদের ভ্রমণ-লেখ।

গত বছর গ্রীষ্মে গেছিলাম কাশ্মীর। কলকাতা থেকে সোজা এয়ারে করে দিল্লি তারপর ওখান থেকে শ্রীনগর এয়ারপোর্ট। অপরূপা কাশ্মীর এখন আমার সামনে। চেক-আউট করার পর ওখান থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা ডাল-লেকের কাছে দিলাশা লজে। এই সময়টায় কাশ্মীর যেন টিউলিপ ঘেরা স্বর্গ। নিশাত বাগ সেজেছে ফুলে ফুলে। সাধে কি আর সম্রাট কিংবা সম্রাজ্ঞীরা কাশ্মীরকে চোখে হারাতেন। আর টিউলিপ বাগ ছেড়ে আসতে মনই চাইবে না। নানা রঙের টিউলিপ ফুটেছে। সঙ্গে অন্যান্য অনেক ফুল। বসন্তের অযুত আয়োজন নিয়ে যেন আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল কাশ্মীর।

এই যদি মার্চ-এপ্রিলের চিত্র হয় তাহলে অক্টোবর-নভেম্বরের চিত্র অন্যরকম। বরফ, আপেল ঘেরা কাশ্মীর। এবার গন্তব্য ডাল-লেক। ভাসমান বাজার বসে। চলে বিকিকিনি। আর হাউস-বোটে থাকার অভিজ্ঞতা বলে কিংবা লিখে বোঝাবার নয়। বাইরে থেকে দেখলে বুঝতেই পারবেন না এত আনন্দদায়ক ব্যবস্থা তার মধ্যে রয়েছে। মনে হবে কোনও এক হাভেলির একটি ছোট্ট অংশ।

গুলমার্গের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হল। এখানকার গণ্ডলা বা রোপওয়ে বিখ্যাত। সামনেই সারি সারি পর্বত-শৃঙ্গ। এবার পরের দিন চলে গেলাম সোনমার্গ। যাওয়ার পথটি অসাধারণ সুন্দর। দূরের পর্বতের শৃঙ্গগুলি যেন ভেসে আছে। আর কাছের পাহাড়ের গায়ে লেগে আছে বাড়িগুলি ছবির বইয়ের কোনও কোনও পাতা। ফুলে ফুলে ভরে আছে রাস্তার দু’পাশ কোথাও কোথাও। একটি দিন এখানে থাকা যেতেই পারে। জোজিলা পাশ রওনা হওয়া যায় এখান থেকে।

এই যাত্রায় অনেক রোমাঞ্চ অপেক্ষা করে থাকে। কাশ্মীর গিয়ে পহেলগাম যাবেন না তা কী করে হয়! দীর্ঘ পাইন বনের ভেতর দিয়ে যাত্রা। স্বর্গ যেন ছুঁয়ে গেছে– ওই সামনের পাইনের ডগাকে। অনিন্দ্যসুন্দর বেতাব ভ্যালি। সেখানে রয়েছে দীর্ঘ উইলো গাছের সমারোহ। এই সেই গাছ যার কাঠে তৈরি ব্যাট বিরাট কোহলিদের হাতে কথা বলে। আরু ভ্যালিতে গেলে দেখা যাবে গ্রামীণ কাশ্মীরের জন-জীবনের এক নিজস্ব চিত্র। পরিচিত হতে পারবেন, কিনতে পারবেন তাদের হাতের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্য। থেকেও যেতে পারেন একটি রাত এখানে।

এছাড়া চন্দনওয়ারি ঘুরে আসতে পারবেন। এখান থেকে শুরু হয় বহুচর্চিত, ঐতিহ্যবাহী অমরনাথ যাত্রা। কাছেই রয়েছে ভূর্জপত্রের বন। সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় প্রতিবেশ। এইবার শ্রীনগর ফেরার পালা। ফিরে বেশ কতকগুলি ফুলের বাগ দেখলাম। যেমন চশমেশাহি বাগ। রোডোডেনড্রন ফুলের আগুন লেগেছে উপত্যকায়। সেইসঙ্গে আবারও ডাললেকে ফিরে যাওয়া। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। সেইরাতে একঘন্টার জল-বিহার সারা জীবনের সম্পদ হয়ে থাকল। এই স্মৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এই অতিমারীর সময়।

মনে হচ্ছে আবারও ছুটে যাই। ট্রেন হোক বা এয়ার। হোটেল বা গাড়ি কিছু আগে থেকে বুক করার দরকার নেই। গিয়ে পৌঁছাতে পারলেই হল। ডাল লেকের কাছে রয়েছে সবরকম মানের অনেক হোটেল। এমনকি বাঙালি-কাশ্মীরী যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত হোটেল রয়েছে। বাঙালি খাবার নিয়ে যাদের আগ্রহ রয়েছে ঘুরতে গিয়েও তাদের কোনও অসুবিধে হবে না, অন্তত শ্রীনগরে। তাই অতিমারীর প্রকোপ কমলে একবার কাশ্মীর-যাত্রা করা যেতেই পারে। পুজোর ভ্রমণ না হয় পুজোর কিছু পরেই হোক।