তমাল পাল: ধর্ম বিভেদ আনে, আবার সেই ধর্মই ঘুচিয়ে দেয় বিভেদের বেড়াজাল। ঠিক এমনটাই ঘটছে আনোয়ার আলি, আলম শেখদের সঙ্গে। গোটা দেশ যখন সাম্প্রদায়িক উত্তজনার আগুনে পুড়ছে, তখন প্রায় সকলের অলক্ষ্যে, নীরবে ১৫ বছর ধরে কুমোরটুলির প্রতিমাবাহক হিসেবে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। শুধু আনোয়ার আলমরাই নন, এই মুহূর্তে কুমোরটুলিতে প্রতিমাবাহক হিসেবে কাজ করছেন আরও জনা পনেরো মুসলিম যুবক। দেখে শুনে মনে হতেই পারে, নেহাতই পেটের দায়ে, রুজির টানে পুজোর মরসুমে প্রতিমা বহন করে বিভিন্ন ক্লাবে পৌঁছে দেওয়াকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু সত্যিটা আরও হৃদয়স্পর্শী। শুধু প্যান্ডলে প্যান্ডেলে প্রতিমা পৌঁছে দিয়েই ক্ষান্ত হন না ওই যুবকরা। যে প্রতিমাগুলি তাঁদের কাঁধে ভর করে পূজামণ্ডপে পৌঁছেছে, সেগুলো সব ঠিকঠাক আছে কী না দেখার জন্য, দিন দু’য়েক পর থেকেই সেই সমস্ত প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে নিজের চোখে দেখেও আসেন আনোয়ার আলি, আলম শেখ, জামাল খানরা। মুসলিম হয়েও হিন্দদের উৎসবের সঙ্গে একাত্মবোধের কারণ কী? এই প্রশ্ন করলে কিন্তু বোকাই হতে হবে। বছর ত্রিশের জামাল শেখের সপাট জবাব কথায়, ‘আমরা বাঙালি। দুর্গাপুজো আমাদেরও উৎসব। এখানে হিন্দু, মুসলিম কোনও ভেদাভেদ নেই।’

কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সমিতির যুগ্মসম্পাদক রঞ্জিৎ সরকারের কথায়, ‘‌আমাদের এখানে প্রতিবছরই পুজোর আগ দিয়ে সোনারপুর, বাসন্তী, সরবেড়ে, লক্ষ্মীকান্তপুর, কাকদ্বীপের মতো এলাকা থেকে অজস্র প্রতিমাবাহক আসেন। আনোয়ার আলি, আলম শেখ, জামাল খানরাও প্রতিবছর আসেন। এখানে কোনও ধর্মীয় বিভেদ নেই, সকলে মিলেমিশে কাজ করেন। শুধু প্রতিমাবাহকই বা কেন, আমাদের এখানে যে প্রতিমাগুলি তৈরি হয়, তার বেশিরভাগের চুলই তো আসে ইসলাম ধর্মাবলম্বী শিল্পীদের কাছ থেকে। কাজের ক্ষেত্রে আমরা কোনও ভেদাভেদ করি না। হতে দিই না।’‌
এই প্রতিমাবহকরা কুমোরটুলিতে পরিচিত ‘‌মুটি’‌ নামে। মূলত সারাবছর কৃষিকাজ করেন এঁরা। পুজোর সময় কিছুটা অতিরিক্ত রোজগারের আশায় শহরে আসেন তাঁরা। সরবেড়ে থেকে আসা ৩২ বছরের আনোয়ারের কথায়, ‘‌আমরা দল বেঁধে গ্রাম থেকে শহরে আসি। সেই দলে হিন্দু–মুসলিম সকলেই থাকেন। আমি নিজে ১৫ বছর ধরে এই সময় কলকাতায় আসছি। স্থানীয় শিল্পীরাই থাকার জায়গা করে দেন, যত্নও করেন।’‌ আর এক প্রতিমাবাহক আশরাফ–উল–হকের কথায়, ‘‌মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছে দিয়ে পুজোর শেষে সাত থেকে আট হাজার টাকা রোজগার হয়।’ আশরাফদের কাজ শুরু হয় মহালয়া থেকে। মেরেকেটে পঞ্চমীর মধ্যেই শেষ হয়ে যায় প্রতিমা পৌঁছনোর কাজ। ‘‌তারপরে আমরা বিভিন্ন প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াই, সব ঠিক আছে তো,‌’‌ বললেন আশরাফ। আলম শেখ বলছিলেন, ‘‌আমাদের ধর্ম আলাদা বলে কখনও কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। প্রত্যেকটি পুজোর মণ্ডপে উদ্যোক্তারা আমাদের সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেছেন। এমনও হয়েছে, কাজে খুশি হয়ে বাড়তি পারিশ্রমিকও দিয়েছেন। পেটভরে খাইয়েছেনও।’‌ গোটা দেশে যখন একের পরে এক সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটছে, তখন ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়েও হিন্দু উৎসবে সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে কোনও সমস্যায় হয় না বলেই দাবি করছেন আনোয়ার। তিনি বললেন, ‘‌দেশে কোথায় কী হচ্ছে জানি না। তবে আমাদের গ্রামে এরকম কোনও ব্যাপার নেই। এখান থেকে যে অর্থ নিয়ে সপ্তমীর দিন বাড়ি ফিরে যাই, সেই অর্থ দিয়েই পুজোর উৎসবে অংশগ্রহণ করি। আমার সন্তানদের নতুন পোশাক কিনে দিই, পুজো দেখাতে নিয়ে যাই। আবার খুশির ইদেও হিন্দু–মুসলিমরা একসঙ্গে আনন্দ করেছেন। আমার গ্রামের বাসিন্দারাও জানেন আমি কী কাজ করতে কলকাতায় আসি। তাঁদেরও কোনও সমস্যা নেই।’‌