স্বর্ণালী তালুকদার:‌ ‘‌ঘুরতে থাক যতক্ষণ না মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিস।’‌
‘‌ফুচকা খেয়ে ঝাল লাগলে যেমন বড়বড় চোখ করে হাওয়া টেনে নিস, সেভাবে তাকা।’‌
কিংবা
‘‌সাঁতার জানিস না তো কী হয়েছে। অল্প জলে নাম, না হলে বিসর্জনের ছবিটা তুলব কী করে?‌’‌
গত সপ্তাহ দু’‌য়েক ধরে কলকাতার একটু বড় গঙ্গার ঘাটগুলোয় ঘুরে বেড়ালে এরকমই টুকরো কথোপকথন কানে ভেসে আসতে বাধ্য। সব থেকে বেশি ভিড় হয় বাগবাজার এলাকার ঘাটগুলোতে। সেখানেই হাতে ক্যামেরা নিয়ে ওইরকম নানা নির্দেশ দিয়ে চলেছেন ফটোগ্রাফাররা। মাথা পেতে সেই হুকুম মেনেও নিচ্ছেন জীবন্ত দুর্গারা। ঘাটের ভেজা সিড়িতে দাঁড়িয়ে, বসে কিংবা জলে নেমে, কখনও আবার শুয়েশুয়েই চলছে দেবীর বোধন। প্রি-ওয়েডিং, প্রি-হনিমুন ফটোশ্যুটের ধাঁচে এখন প্রি–পুজো ফটোশ্যুটও একটা ‘‌ট্রেন্ড’‌। কিন্তু কতটা ঝুঁকি এভাবে ছবি তোলা?‌ তার জন্য কী কী আইন মেনে চলতে হয়?‌ অবলম্বন করতে হয় কী কী সাবধানতা?‌ সে সবের প্রায় কোনও কিছুই কিন্তু এই ফটোগ্রাফার কিংবা মডেলদের কেউ জানেনই না। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও বিষয়টা আর নতুন কিছু নয়। বছরের এই সময়টায় ফটোগ্রাফারদের ‘‌হুজ্জুতি’‌–তে তাঁরাও রীতিমতো বিরক্ত। পাশাপাশি তাঁদের ভয়, যেভাবে অনুমতি ছাড়াই চলছে বিপজ্জনক ফটোশ্যুট, তাতে কোনও দিন না একটা বড় বিপদ ঘটে।


এই ধরনের শ্যুটের জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের থেকে। সুতানুটি আউট পোস্টের কর্তব্যরত অফিসার এস.‌ মুখোপাধ্যায় জানান, সংশ্লিষ্ট ঘাটে শ্যুটের জন্য আগে থেকে অনুমতি পত্রের ফর্ম ফিল আপ করতে হয়, যা বন্দর পুলিশের আধিকারিক সই করে উক্ত বিষয়ে সম্মতি দেন এবং স্থানীয় থানায় তার একটি কপি পাঠানো হয়। ফর্মে ঘাটের নাম, সময়, টিমের বিবরণ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তিনি আরও জানান, বিজ্ঞাপন হোক বা ব্যক্তিগত শ্যুট— তার কারণে ট্রাফিকে বিশৃঙ্খলা যাতে না তৈরি হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা হয় বন্দর পুলিশের তরফ থেকে। এ ছাড়াও ওই এলাকার শ্যামপুকুর থানায় এবিষয়ের অনুমতি নেওয়ার জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। যেখানে গিয়ে ফটোগ্রাফারকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট থানার আধিকারিকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়।


বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ‘অনুমতি’ নেওয়ার কথা ফোটোগ্রাফাররা জানেন না। মহালয়ার দিন এবং আগের দিনও ফটোগ্রাফারদের প্রশ্ন করে কোনও সদুত্তর পাওয়া গেল না। গিরীশ পার্ক থেকে ছবি তুলতে এসেছিলেন সৌভিক পাল। বললেন, ‘‌কে বলেছে ছবি তুলতে অনুমতি লাগে?‌ আমি ছোটবেলা থেকে এখানে আসি। কোনও অনুমতি লাগে না।’‌ বারাসত থেকে ছবি তুলতে আসা সন্তু হালদার বললেন, ‘‌ঘাটের কোন জায়গাটা বিপজ্জনক সেটা ভাল করে জানি। অনুমতি নেওয়ার কোনও দরকার নেই।’‌
যদিও এই এলাকাতেই গত বছর ঘটেছিল ছবি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা। এক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত বছর এভাবেই ছবি তুলতে গিয়ে বাগবাজার মায়ের ঘাটে প্রাণ হারিয়েছিলেন একজন। তবুও থামানো যায়নি ফটোগ্রাফারদের। দেদার ফটোশ্যুট, অনুপস্থিত পুলিশও।