নিউজপোল ডেস্ক: দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই আসে বলে লক্ষ্মীপুজো যে সেটারই একটা সম্প্রসারণ, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। বস্তুত, ব্যাপারটা সেরকম নয়ই। এই লক্ষ্মীপুজোর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির দুই সম্প্রদায়, ঘটি এবং বাঙালদের স্বাজাত্যাভিমান।
আজকের দিনে ঘটি বাঙালের ‘লড়াই’ সেই ভাবে জারি না থাকলেও, কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য এখনও থেকে গেছে অন্তরের অন্দরমহলে।
দেশভাগের পর নব্য ভারতে এসে এই বাংলার মানুষদের সঙ্গে উদ্বাস্তুদের সহাবস্থান খুব একটা সহজ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গীয়রা, যাঁদের কথ্য ভাষায় ঘটি বলে অভিহিত করা হয়, তাঁদের বেশিরভাগই নিজেদের পাড়ায় এই উদ্বাস্তুদের (বাঙালদের) বেশ ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’‌–কে উপদ্রবের চোখেই দেখতেন। তাঁদের অনেকেই মনে করতেন, বাঙালদের না আছে চালচুলো, না আছে কোনও কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এছাড়া, হঠাৎ করে দেশে একগুচ্ছ সহায় সম্বলহীন মানুষ এসে ভিড় করায়, চাকরি এবং জমি–বাড়ি দুই ক্ষেত্রেই বেড়ে গিয়েছিল প্রতিযোগিতা। সেটাও যে সকলের খুব একটা মনঃপূত হয়েছিল, তা নয়। এই ধরনের আর্থসামাজিক বিভেদের ফলেই তৈরি হয়েছিল ঘটি বাঙালের লড়াই এবং বিদ্বেষ।
শুধু মুখের ভাষা কিংবা আচারআচরণেই নয়, দুই দলের প্রভেদ ছিল ধর্মাচারণের ক্ষেত্রেও। লক্ষ্মীপুজোর ক্ষেত্রেই সম্ভবত ঘটি–বাঙালের পুজোর রীতিতে পার্থক্যটা সবচেয়ে প্রকট। প্রাথমিক ভাবে দেখতে গেলে, ঘটিদের ক্ষেত্রে কিন্তু বছরে বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্মীপুজো হয়ে থাকে। এমনকী, কালীপুজোতেও বহু পশ্চিমবঙ্গীয় পরিবারে লক্ষ্মীপুজো করা হয় আজও। বাঙালদের ক্ষেত্রে লক্ষ্মীপুজো মানে শুধুই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর প্রবর্তন হয় পূর্ব বাংলায় (অধুনা বাংলাদেশে)। সেখানেও অবশ্য কিছু বিভেদ রয়েছে, যেমন ঢাকা, বিক্রমপুর অথবা ময়মনসিংহ এলাকার রীতি এবং উপাচার কিন্তু খুলনা অথবা সিলেট অঞ্চলের থেকে একেবারেই আলাদা।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর খুব প্রচলিত বিধি হল ‘কলার ভেলা’ অথবা ‘ধানের গোলা’ বানানো। কলাগাছের কাণ্ডের খোলস দিয়ে বানানো এই কলার ভেলা বানানো হয় ব্যবসায় সাফল্য কামনা করে। ধানের গোলার আকৃতি তৈরি করা হয় ভাল ফসলের প্রার্থনা করে। সেইদিক থেকে দেখলে, দুটো জিনিসই উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো কিন্তু ধান কাটা এবং ফসল ঘরে তোলার সঙ্গে জড়িত। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার আগে আশ্বিনের পূর্ণিমায় আরাধনা করা হয় সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর। দ্বিতীয়ত, বাঙালদের ক্ষেত্রে লক্ষ্মী কিন্তু সর্ব অর্থে সমৃদ্ধির দেবী, শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের নয়। পুজোর দিনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আল্পনায় ঘরে ঢোকার মুখ করে আঁকা হয় দেবীর পায়ের ছাপ— সমৃদ্ধি যাতে প্রবেশ করে প্রতিটি ঘরে।
এছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল, ঘটিদের লক্ষ্মীপুজোয় সাধারণ নিরামিষ ভোগ দেওয়া হলেও, বাঙালদের পুজোয় ফল এবং খিচুড়ি অথবা পোলাও ছাড়াও থাকে মিষ্টি এবং আরও অন্যান্য রকমের ভোগ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মোয়া, মুড়কি ইত্যাদি। বিবাহিত মহিলাদের মাছ খাওয়ানোও কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর একটি বিশেষ প্রথা। বহু সময়ে এই পুজোয় উৎসর্গ করা হয় জোড়া ইলিশ মাছও। সুতরাং বাঙালদের ক্ষেত্রে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো কখনওই নিরামিষ নয়।
দেশভাগের সময় দেড় কোটি মানুষকে রাতের অন্ধকারে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল নিঃস্ব অবস্থায়। স্বাভাবিক ভাবেই, তাঁদের সঙ্গে সেই সময় এসেছিল নিদারুণ দারিদ্র। কিন্তু সেটার কারণে নিজেদের সংস্কৃতি ছাড়েননি সেইদিনের উদ্বাস্তুরা। বরং নতুন দেশে এসে এই ছোট, ঘরোয়া পুজোটাই হয়ে উঠেছিল তাঁদের ঐতিহ্যের প্রতীক। শুরুর সময় ছোট করে হলেও, ধীরে ধীরে যত সময় গেছে, জাঁকজমক বেড়েছে, তত প্রসার পেয়েছে এই পুজো। নিজেদের স্বকীয়তাটুকু বজায় রাখার মাধ্যম হিসেবে তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন লক্ষ্মীপুজোকে।