তমাল পাল:‌ প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে প্রচার চলছে দেশজুড়ে। দৈনন্দিন জীবন থেকে প্লাস্টিককে বাদ দেওয়া পক্ষে সওয়াল করছেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। ধীরে হলেও যে সেই প্রচারে ফল মিলছে, সেটাই প্রমাণ করে দিচ্ছে কলকাতার লক্ষ্মীপুজোর বাজার। লক্ষ্মীপুজোয় আল্পনা দেওয়ার রীতি বাঙালি পরিবারে কয়েকশো বছরের। চালের গুঁড়ো দিয়ে আল্পনা দেওয়ার সাবেক রীতিকে পিছনে ফেলে গত কয়েক বছরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল প্লাস্টিক স্টিকারের আল্পনা। কিন্তু ফের চাকা ঘুরছে। প্লাস্টিককে দূরে সরিয়ে এবার কাগজের আল্পনাকেই আপন করে নিচ্ছেন বাঙালিরা। কলকাতা শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ— ‘‌লেটেস্ট ট্রেন্ড’‌ এখন এটাই।বাগবাজারের একটি দশকর্মা দোকানের মালিক সাধন চক্রবর্তীর কথায়, ‘‌দুর্গাপুজোর সময় থেকেই দেখছিলাম, যে সমস্ত পুজোর পণ্যে প্লাস্টিক রয়েছে, সেগুলো নিতে চাইছেন না ক্রেতারা। জল খাওয়ার জন্য যে প্লাস্টিকের গ্লাস বিক্রি হয় পুজোর সময়, সেটার বদলে মাটির ভাঁড় খুঁজছেন এমন অনেক ক্রেতাও পেয়েছি। যদি খরচের হিসাবে মাটির ভাঁড়ের দাম বেশি পড়ে যায় বলে আমরা রাখি না, তবু এই ধরনের ক্রেতাদের দেখা কিন্তু আমরা আগে পাইনি। লক্ষ্মীপুজোর ক্ষেত্রেও এমনটাই হচ্ছে। প্লাস্টিকের স্টিকারের আল্পনায় মানুষ ধীরে ধীরে উৎসাহ হারাচ্ছেন। বদলে বেশি বিক্রি হচ্ছে কাগজের আল্পনা।’‌ ওই দোকানেই পুজোর সামগ্রী কিনতে আসা দেবজিৎ মণ্ডল বললেন, ‘‌ছোটবেলায় মা–কাকিমাদের দেখতাম চালের গুঁড়ো আল্পনা দিতে। কিন্তু পরে পরিশ্রম বাঁচাতে প্লাস্টিকের আল্পনার রেওয়াজ শুরু হয়। প্লাস্টিক যে পরিবেশের ক্ষতি করে সেটা জানতাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এতদিন সেভাবে গুরুত্ব দিইনি। পরে যখন দেখলাম কাগজের আল্পনা বিক্রি হচ্ছে এবং দামেও বিশেষ হেরফের নেই, তখন ভাবলাম এটাই কেনা যাক। পরিশ্রমও হবে না, কিছুটা হলেও পরিবেশরক্ষার কাজ তো হবে।’‌ হাতিবাগান বাজারের ব্যবসায়ী অরূপ দাস বলছেন, ‘গত ক’য়েক বছরে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিকের আলপনার চাহিদা ছিল। কিন্তু এবার তা কমায় আমরা আর প্লাস্টিকের আলপনা রাখছি না। তার বদলে কাগজের আলপনা এসেছে। সেটাই এখন ক্রেতারা ভাল ভাবে নিচ্ছেন। আমরা, ব্যবসায়ীরাও খুশি প্লাস্টিকের আলপনার বদলে কাগজের আলপনার চাহিদা দেখে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা জাগছে, এটা তো দেখতেও ভাল লাগে।’
প্লাস্টিক যাঁরা বর্জন করছেন, তাঁরা সকলেই যে কাগজের আল্পনা কিনছেন, এমনটা নয়। অনেকেই সাবেক চালের গুঁড়োর আল্পনাতেও ফিরে যাচ্ছেন। শ্যামবাজারের বাসিন্দা দেবস্মিতা দত্তের কথায়, ‘‌এবারে পুজোয় প্লাস্টিকের গ্লাস কিংবা আল্পনা যে ব্যবহার করব না, সেটা আগেই ঠিক করেছিলাম। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি, আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরোধিতা করছেন। পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও প্লাস্টিক বর্জন করতে বলেছেন। কিন্তু কাগজের যে আল্পনাগুলো দেখলাম, সেগুলো আমার খুব একটা পছন্দ হয়নি। তাই আমি নিজে হাতেই আল্পনা আঁকব। বছরে একটা দিন এটুকু কষ্ট করা যেতেই পারে।’‌
যাদবপুরের ক্রেতা সোমা মণ্ডল বলছেন, ‘প্লাস্টিকের কারণে পরিবেশের যে ভাবে ক্ষতি হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যেই সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমি সম্প্রতি বাজার করা থেকে অন্যান্য যে কোনও প্রয়োজনে প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি। পুজোর সময়েও দেখছি কাগজের আল্পনা বিক্রি হচ্ছে। তাই এটাই কিনলাম।’‌