নিউজপোল ডেস্ক:‌ মহাপ্রস্থানের পরে বিদেশে গিয়ে যে সংসার পেতেছেন সুভাষচন্দ্র বসু, সেটা জানতেন না তাঁর পরিবারের সদস্যরাই। বিয়ের কথা, সন্তানের কথা নেতাজির পরিবারের সদস্যদের চিঠি লিখে জানান সুভাষের স্ত্রী এমিলি শেঙ্কল। নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসুকে সেই আবেগঘন চিঠিতে কী লিখেছিলেন এমিলি?‌ তুলে দেওয়া হল তার হুবহু বঙ্গানুবাদ
‘‌মহাশয়,
একদম অপরিচিত মহিলার কাছ থেকে চিঠি পেয়ে হয়তো আপনি অবাকই হবেন। চিঠিটা লিখব কি লিখব না, সেটা ভাবতে ভাবতেই আমি অনেকটা সময় কাটিয়ে দিয়েছি। কারণ যে ব্যাপারগুলো নিয়ে আমি কথা বলব, সেটা একেবারেই একটা পারিবারিক বিষয়। তবে এই পরিবার যেমন আপনার, তেমনই আমিও এই পরিবারের একটা অংশ। এবার আমি আপনাকে পুরো ব্যাপারটাই গুছিয়ে বলছি। আপনার প্রয়াত ভাই সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে আমি ১৯৩৪ সাল থেকে কাজ করতে শুরু করি। তখন তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপরে একটি বই লিখছিলেন এবং আমি ওঁর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করছিলাম। আশা করি আপনি এটা জানেন যে ইউরোপে থাকাকালীন আমি ওঁর সঙ্গে কাজ করতাম।
১৯৪১ সালে আপনার ভাই ইউরোপে আসেন এবং আমাকে বার্লিনে এসে তাঁর সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। আমি সম্মত হই এবং ১৯৪২ সালের শরৎকাল পর্যন্ত আমি ওঁর সঙ্গে কাজ করি। সেই সময়েই উনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং আমি রাজি হই। চরিত্রগতভাবে সুভাষ একজন দেবতুল্য মানু্ষ এবং আমরা একে অপরকে ভালবেসেছিলাম। তবে জার্মান সরকারের কাছ থেকে বিয়ের অনুমতি পেতে কিছুটা কষ্ট হয়েছিল। আমি জন্মসূত্রে অস্ট্রিয়া বংশোদ্ভুত। কিন্তু জার্মানির নাগরিক হিসেবে কোনও বিদেশিকে বিয়ে করতে গেলে সরকারের ছাড়পত্র দরকার হতো। আমরা কেউই ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে চাইনি। আমরা গোপনেই ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করি। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া কেউ এই বিয়ের কথা জানত না।
১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর আমাদের একটি কন্যাসন্তান হয়। যদিও তার আগে সেপ্টেম্বরে আমরা ভিয়েনায় চলে এসেছিলাম। গোপনীয়তা বজায় রাখতে আমি বিয়ের আগের নামই ব্যবহার করতাম। আমাদের মেয়ের নাম অনিতা ব্রিজিট। অমিতা রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভিনদেশি নাম দেখলে জার্মান সরকার নড়েচড়ে বসতে পারতো। তাই রাখা হয়নি। জার্মানে ব্রিজিট সংক্ষিপ্ত করলে গীতা। দুর্ভাগ্য এটাই আমাদের মেয়েকে আপনার ভাই মাত্র একবারই দেখতে পেয়েছে। তখন ওর বয়স ছিল চারমাস। ১৯৪৩ সালে আপনার ভাই ইউরোপ ছেড়ে চলে যায়। পরে সে ভিয়েনা আসতে চেয়েছিল কিন্তু ততদিনে সে রহস্যজনক ভাবে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছে।
ভারতে আসার একদিন আগে সুভাষ আপনাকে একটি চিঠি লেখে। সেই চিঠির একটি প্রতিলিপি সে আমাকেও পাঠায়। সুভাষের মনে হয়েছিল, যদি তার কিছু হয়ে যায় কিংবা সেই চিঠি যদি আপনি না পান, তাহলে এই প্রতিলিপিটা আমার কাজে লাগতে পারে। চিঠিটা বাংলায় লেখা। সেখানে আমাদের বিয়ের খবর, মেয়ে হওয়ার খবর—সবই লেখা আছে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এখন এখান থেকে আপনাকে কোনও নথি আমি পাঠাতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়েই এই চিঠি লেখা। পরে যখন সম্ভব হবে, আমি চিঠির প্রতিলিপিও আপনাকে পাঠিয়ে দেবো। আমাদের মেয়ের ছবিও পাঠাবো।
আমি আপনাদের কাছ থেকে কোনও অর্থসাহায্য দাবি করছি না। আমি শুধু আমাদের মেয়ে এবং বিয়ের কথা আপনাদের জানাতে চাইছি। আশা করব, পরে আপনারা আমার মেয়েকে স্বীকার করবেন। আমি এখন একটি সংস্থায় করণিকের চাকরি করি। সেখানে আমাকে দোভাষীর কাজও করতে হয়। আমি মাসে ২০০ শিলিং বেতন পাই। এবং আমার মা–র সঙ্গে থাকি। বাবার পেনশনে ভালভাবেই আমাদের দিন চলে যায়।
অনিতা এখনও স্কুলে যাওয়ার মতো বড় হয়নি। ওর ছ’‌বছর বয়স হয়েছে। কয়েকদিন পরে ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। ওকে আমি যথাসম্ভব ভাল স্কুলে ভর্তি করব এবং ভাল করে পড়াশুনো শেখানোর চেষ্টা করব। অনিতা যথেষ্ট বু্দ্ধিমতী। আশা করি ও লেখাপড়াতেও ভালই হবে। ও ভারতে আসতে চায়, এবং একজন হিন্দু হিসেবে জীবনধারণ করতে চায়। আপনার জেনে ভাল লাগবে, অনিতাকে একদম ওর বাবার মতোই দেখতে। বিশেষত ঠোঁট, চোখ এবং নাকের গঠনের হুবহু মিল রয়েছে। তবে ওর চোখের মণির ও চুলের রং আলাদা। গায়ের রং–ও একটু বেশি ফর্সা। স্বভাবে ও বেশ নরম এবং সহৃদয়। ওর এই স্বভাবগুলোও সুভাষের সঙ্গে মেলে। অনিতা ধর্মপ্রাণ এবং প্রার্থনা করতে ভালবাসে। হয়তো ওর কিছু দোষ আছে। কিন্তু দোষগুণ মিলিয়েই তো মানুষ।
যদি আপনি এই চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার করে একটা উত্তর দেন, তাহলে খুব ভাল লাগবে। আপনি ও আপনার পরিবারের সদস্যরা কেমন আছেন?‌ যদি সুভাষের মা এখনও বেঁচে থাকেন, তাহলে ওঁকে আমার প্রণাম জানাবেন। আপনার ছেলে অমিয় কেমন আছেন?‌ সে কি ভারতে আছে না ইংল্যান্ডে।
ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে অনেক খবর পড়ি। ইচ্ছে করে ভারতে যাই, কিন্তু যুদ্ধের পরে এখন যা অবস্থা, তাতে বিদেশে যাওয়া সহজ নয়। আশা করি এই ডামাডোলের মধ্যে আপনাদের কোনও ক্ষতি হয়নি।
আপনার ভাইয়ের মৃত্যুর খবরও আমি শুনেছি। বলা বাহুল্য আমি শোকগ্রস্ত। কারণ আমি যে শুধু আমার ভালবাসার মানুষকে হারিয়েছি তাই নয়, গোটা দুনিয়াই তাদের প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পরে একজন ভারতীয় নারী যেভাবে থাকেন, আমি সেভাবে থাকতে পারছি না, এটা আমার দুর্ভাগ্য। এখানে এভাবে থাকতে গেলে কেউ আমার অনুভূতিটা বুঝতে পারবে না। কিন্তু আমার ও অনিতার স্মৃতিতে সুভাষ চিরজীবী হয়ে থাকবে। আপনি যদি আর কিছু জানতে চান, তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন। আমি অবশ্যই উত্তর দেবো। অনিতা বড় হলে ওকে জানাবো, ওর বাবা কত মহান মানুষ ছিলেন।
দয়া করে আমার শুভেচ্ছা নেবেন।
আপনাদের
এমিলি শেঙ্কল’‌