প্রজ্ঞাপারমিতা দত্ত:‌ সকলের সঙ্গে সহজভাবে মেলামেশা করতে পারেন না, এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। মনোবিদদের দাবি, মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা হীনমন্যতা থেকেই মিশুকে হয়ে উঠতে পারেন না অনেকে। কখনও রূপ, কখনও গুণ, কখনও আবার সামাজিত–অর্থনৈতিক অবস্থান আমাদের অনেক সময়েই সকলের সঙ্গে খোলামেলা মেলামেশা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এর ফলও আবার একএকজনের ক্ষেত্রে একএকরকম হয়। কেউ চুপচাপ হয়ে যান, কেউ আবার অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে দূরত্ব বজায় রাখেন। মনোবিদ আলফ্রেড অ্যাডলারের মতে এই মানসিক বৈশিষ্ট্যের নাম ‘ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স’ বা হীনমন্যতা। যাঁরা এই সমস্যায় ভোগেন, তাঁরা কখনও চান না, তাঁদের এই সমস্যার কথা কেউ বুঝতে পারুন। নানারকম ব্যবহারের মধ্যদিয়ে তাঁরা এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। সেই বৈশিষ্ট্য কী কী, দেখে নেওয়া যাক একনজরে।

১)‌ ব্যস্ততার ভান:‌ হীনমন্যতায় যাঁরা ভোগেন, তাঁরা কখনওই নিজের সম্পর্কে খুব বেশি কথা কাউকে জানাতে চান না। তাঁদের ভয়, এতে তাঁদের সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতা প্রকাশ পেয়ে যাবে। তাই ব্যস্ততার অভিনয় করে তাঁরা সামনের মানুষটিকে এড়িয়ে যান। বারবার ঘড়ি দেখা, দ্রুত কথা বলা, কথা শোনার ব্যাপারে অমনোযোগী ভাব— এসবই তাঁদের নিজের মনের ভাব লুকিয়ে ফেলার উপায়। এই আচরণে কেউ বিরক্ত হয়ে সরে যান। কেউ বা বিরক্ত না করতে চেয়ে সরে যান। অবশ্য এর আর একটা দিকও রয়েছে। সাধারণভাবে আমরা ধরে নিই, যিনি ব্যস্ত, তিনি আসলে সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই যিনি হীনমন্যতায় ভুগছেন, তিনি এভাবেও আত্মপ্রসাদ লাভ করার চেষ্টা করেন।

২)‌ অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ:‌ হীনমন্যতায় যিনি ভোগেন, তিনি অনেক সময়ই মনে করেন, কারও সঙ্গে অবজ্ঞাসূচক কিংবা অপমানজনক আচরণ করলে নিজেকে বড় দেখানো যাবে। এই আচরণের সময় অনেকেই নিজের জীবনের অনেক সাফল্যের গল্প জোর করে শোনাতে থাকেন। এই সময়ই নিজেকে বড় দেখানোর জন্য সামনের মানুষটির প্রতি অবজ্ঞাসূচক আচরণ করে বসেন তিনি। এতে নিজেকে হয়তো খুশি করা যায়, কিন্তু যার সঙ্গে এই আচরণ আপনি করলেন, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গিয়ে ঠেকে তলানিতে। সাধারণত কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের আচরণ বেশি করেন হীনমন্যতায় ভোগা মানুষরা। এটা তাঁরা ভুলে যান, জীবনের কোনওক্ষেত্রেই কাউকে ছোট করে নিজে বড় হওয়া যায় না।

৩)‌ নিজের সমস্যাকে বড় করে দেখানো:‌ বর্তমানে মানুষের হাতে সময় খুব কম। সকলেই নিজের নিজের কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। জীবনযাত্রার সফরে ছোটবড় নানারকম সমস্যা আমাদের সবার সামনেই আসে। যাঁরা হীনমন্যতায় ভোগেন, তাঁরা নিজেদের সমস্যাটাকেই বড় করে দেখান। এবং চেষ্টা করেন সামনের মানুষটিকেও বিশ্বাস করাতে, ‘‌আমার মতো কষ্টে আর কেউ নেই।’‌ এই ধরনের আচরণও সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। জোর করে নিজের কষ্টের গল্প কাউকে শোনাতে গেলে মাঝেমাঝে হয়তো কাউকে পেয়েও যাবেন। তবে নিশ্চিত থাকুন, এভাবে বেশিদিন কাউকে ধরে রাখতে পারবেন না। মনোবিদরা আরও বলছেন, আজকাল অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা ফাঁস করেন। এটাও একধরনের হীনমন্যতার প্রকাশ। আসলে নিজের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবেন আপনি নিজেই।

৪)‌ নিজেকে ‘স্মার্ট’ প্রমাণ করার চেষ্টা:‌ যাঁরা হীনমন্যতায় ভোগেন, তাঁরা আসলে নিজেদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে ঢাকার জন্য অনেক সময়েই এমন আচরণ করে থাকেন। তাঁরা আসলে প্রমাণ করতে চান, ‘‌আমরা কারও থেকে কম নই।’‌ কিন্তু এটা করতে গিয়ে অনেক সময়েই তাঁরা উদ্ধত আচরণ করে ফেলেন। কখনও আবার প্রসঙ্গ বহির্ভূত কথা বলে বা বিরক্তিকর আচরণ করে তাঁরা উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠেন। আরও দেখা গেছে, এঁদের এই আচরণের ফলে অনেকেই এঁদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দেন। ফলে সেটা তাঁদের আরও একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

৫)‌ অপেক্ষা করানো:‌ কোনও কাজে কোনও জায়গায় দেখা করতে গিয়ে অনেকেই অপরপক্ষকে অপেক্ষা করান। তাঁরা মনে করেন, অপরপক্ষের মানুষটি ধরে নেবেন, তিনি দেরি করছেন মানে, নিশ্চয়ই কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজে আটকে পড়েছেন। তার মানে, ওই ব্যক্তি কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, তাঁর গুরুত্বও নেহাত কম নয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সময়নিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং এতে আপনার ভাবমূর্তিই নষ্ট হয়। যদি কারও সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেরিও হয়ে যায়, তাহলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে কথোপকথন শুরু করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

হীনমন্যতা এমন এক সমস্যা, যা যে কোনও ব্যক্তির মানসিক গঠনকে নষ্ট করে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, কোনও মানুষই জীবনের সবক্ষেত্রে সফল হতে পারেন না। এই সহজ সত্যকে যদি আমরা মেনে নিই, তাহলে জীবনযুদ্ধ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। পাশাপাশি আশার আলো এটাও যে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কোনও না কোনও বিশেষ প্রতিভা থাকে। নিজের সীমাবদ্ধতাটাকে মেনে নিয়েই যদি সেই প্রতিভাবিকাশের দিকে আমরা মন দিই, জীবন অনেকটাই সুন্দর হয়ে উঠবে।