নিউজপোল ডেস্ক:‌ একটা গোটা রাত আতপ চাল ভিজিয়ে রাখা। তার পর তা শিলে বেটে জল দিয়ে পাতলা মিশ্রণ। আঙুলের কায়দায় সেই মিশ্রণ দিয়েই একের পর এক নকশা। কখনও মাছ। কখনও কুলো। কখনো লতাপাতার নকশা। কখনও আবার ধানের ছড়া। এই রঙ্গোলি, স্টিকারের যুগেও এই আল্পনার আবেদন এতটুকু কমেনি। সারা বছর হয়তো এখন আর আলপনা দেয় না বাঙালি বধূ। কিন্তু পুজো–পার্বণ আজও তাকে ছাড়া বেমানান। প্রাচীন কালে মাটির ঘর ঝেড়েপুছে গোবরের ছড়া দিতে বাঙালি মেয়ে–বউরা। তার পর চাল বাটা দিয়ে ঘরের দোর, দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলতেন একের পর এক নকশা। কখনো চাল বাটায় মেশাতেন হলুদ। কখনও আলতা। সেই দিয়ে আঁকা হতো রংবেরঙের আলপনা। কোনও নির্দিষ্ট নকশা বিধি ছিল না। নিজের মনে যা আসত, তাই তুলে ধরতেন। কখনও গাছের ফুল, পাতা জায়গা নিত সেই আল্পনায়। কখনও আবার সাঁওতাল মেয়েদের মাদল বাজিয়ে নাচ। কেন দেওয়া হতো এই আল্পনা?‌ মনে করা হয় দরজায় আল্পনা দেখলে অশুভশক্তি ঘরে প্রবেশ করে না। ফিরে যায়। এই আলপনার মাধ্যমে সংসারের সমৃদ্ধি ফুটে ওঠে।


আলপনার কিন্তু একটা বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কারণেই এর উপাদান চাল গুঁড়ো। আসলে ভূতযজ্ঞে এই চালগুঁড়ো নিবেদন করা হয়। দুনিয়ার ক্ষুদ্রতম প্রাণীও যেন খাদ্য থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটাই উদ্ধেশ্য ছিল মেয়ে–বউদের। তাই মূলত তাদের খাওয়াতেই চাল গুঁড়ো দিয়ে দরজায় আলপনা দেওয়া শুরু হয়। এই আল্পনা থেকেই পোকামাকড়, পিঁপড়ে এসে খুঁটে চাল খেয়ে যেত। তাছাড়া, গ্রামগঞ্জে বিশ্বাস রয়েছে, চালের গুঁড়ো বসন্ত রোগ সারায়। বসন্ত রোগের দাগ সারাতে শিশুদের মুখে চালের গুঁড়ো মাখানো হতো। তাই আলপনাতেও এর ব্যবহার শুরু হয়।
বাংলায় এই আলপনাকে শিল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠাকুরবাড়ির সমস্ত অনুষ্ঠানেই আঁকা হতো সুন্দর আলপনা। এমনকী শান্তিনিকেতনে সমস্ত অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ এই আলপনা। বলা যায় একে কেন্দ্র করেই বসেন শিল্পীগুণীজনেরা। শুরু হয় গানবাজনা। উল্লেখ্য ব্রতের সঙ্গেও অদ্ভুত যোগ রয়েছে আলপনার। শোনা যায়, অতীতে এই আলপনার মাধ্যমে মেয়ের মনের কথা প্রকাশ করত। তাই ব্রতর অঙ্গ হয়ে উঠেছে আল্পনা।