অর্পণ গুপ্ত: সময়ের একটা নিজস্ব বাঁধন আছে। সে বাঁধনে নেই যন্ত্রণা, রয়েছে নিঃস্বার্থ সমর্পণের দায়। সময়ের এই বাঁধনের সুতো ছুঁয়ে ফেলে আমাদের। ছুঁয়ে ফেলে প্রজন্মকে৷ শৈশবের ছেঁড়া ঘুড়ি-রঙিন বল পালটে যায় অফিস ব্যাগে। আমরা কেবল মাইলস্টোন পুঁততে থাকি।

লুকা মদ্রিচ ব্যালন ডি অর হাতে দাঁড়িয়েছিলেন মঞ্চে, প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার হাতে দাঁড়াচ্ছেন ভ্যান ডাইক। পিছনে একে একে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের মঞ্চ দেখে নিচ্ছেন ডি জং, ডি লিখট, এমবাপেরা। ঝলমলে মঞ্চের পিছনে আদিম ফুটবলীয় অর্কেস্ট্রা বাজছে।

মেজর কর্ডের জোরালো প্রোগ্রেশনের ভেতর মাইনর কর্ডদুটো কানের আরাম এখনও। এখনও প্রথম শেখা সরগম অবচেতনে গেয়ে ওঠে গায়ক…

১২ বছরের অভ্যাস! এক যুগের মিথ! এক প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্তরে স্তরে গড়েছে ইমারত। প্রত্যাশার ইমারত, ভালবাসার ইমারত, ভরসার ইমারত, বিশ্বাসের ইমারত…

একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা দুই বিস্ময় বালককে বানিয়েছে বিশ্বফুটবলের দুই সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। ১৯৫৬ সালে পেলে এলেন। বলতে গেলে এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। সে সময়ে ফুটবল পেল এক জীবন্ত ইতিহাসকে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি এলেন জর্জ বেস্ট। পেলে গগনের লাল সূর্য তখন কিছুটা অস্তমিত। ক্রুয়েফ এলেন। ফুটবল বয়ে চলল নিজস্ব ভঙ্গিতে।

আশির দশকের গোড়ায় আবার যেন বিপ্লবের শুরু। সাদাকালো টেলিভিশনের চিত্রনাট্যজুড়ে এলেন ফুটবলের আর এক ঈশ্বর। মারাদোনা যেন সবুজ পৃথিবীকে একাই মাঝামাঝি চিড়ে দিলেন তাঁর সেই ঐতিহাসিক দৌড় দিয়ে৷ জন্ম দিলেন, বলা ভালো ধর্মান্তরিত করলেন ব্রাজিল সমর্থকের একটা বড় অংশকে নীল সাদা পতাকায়। অস্তমিত মারাদোনার সময়ে এলেন রবার্তো বাজ্জিও। এরপর জিদান-রোনাল্ডো-গাউচোরা এলেন।

পেলে-বেস্ট-মারাদোনা-বাজ্জিও-জিদান হয়ে গাউচোর এই কিংবদন্তি বৃত্ততেও কোথাও লেগেছিল ‘খারাপ সময়’ শব্দবন্ধটুকু। কেরিয়ারের কোনও এক সময়ে এইসব বিস্ময়দের সাফল্যে থাবা বসিয়েছে সময়। ইউরোপের জনপ্রিয় ফুটবলপত্রিকা হয়তো এ জন্যেই রোনাল্ডো-মেসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে লিখেছিল, ‘আ রাইভ্যালরি দ্যাট ইজ বেয়ন্ড দ্য টাইম, বেয়ন্ড ইমাজিনেশন।’

সমস্ত কিংবদন্তির সাথে এখানেই হয়তো আলাদা হয়ে যায় বিশ্বফুটবলের দুই বিস্ময়ের ১২ বছরের অনন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস। এঁরা দুজন সময়ের সবুজ ঘাসের ওপর বলটাকে বসান, জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে দৌড় শুরু করেন তারপর সময়ের তেকাঠির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায় ফুটবল ঈশ্বরের বরমাল্য…

‘দ্য গ্রেটেস্ট রাইভ্যালরি দ্য ফুটবল হ্যাজ এভার সিন’, সঞ্চালিকার মুখ থেকে ভেসে আসতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে মঞ্চ।

২০০৭ সাল। শুরু হল ফুটবলের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর বর্ণময় অধ্যায়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে স্পোর্টিং লিসবন থেকে আসা ছেলেটা প্রথম দিন থেকেই হয়ে উঠলেন সেনসেশন। অন্যদিকে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি থেকে উঠে আসা লিও যেন ঐশ্বরিক প্রতিভার ডালি নিয়ে তৈরি হচ্ছিলেন এক কালজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসরে নামার জন্য। ম্যানচেস্টারে থাকাকালীন মেসি-রোনাল্ডো মুখোমুখি হলেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে৷ তখন দুই ফুটবল সেনসেশন সবে কুড়ি-বাইশের কোটায়। সারা বিশ্বে সেই শুরু হল তুল্যমূল্য লড়াই- দুই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সম্রাটের অধিকার দখলের লড়াই। একটু একটু করে ফুটবল বিশ্ব ভাগ হতে শুরু করল। মেসি আর রোনাল্ডো ধর্ম ধারণ করল কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীদের। নিয়তির টানেই যেন রোনাল্ডো এসে পড়লেন মাদ্রিদে। স্পেন-কাতালুনিয়া দ্বন্দ্বের ইতিহাসের সাথে মিশে গেল আর এক লড়াই। একটার পর একটা রেকর্ড। ২০০৮ থেকে ২০১৮- দশ বছর বিশ্বসেরার মুকুট রইল দুই ফুটবল সম্রাটের দখলে। দুজনের পরিসংখ্যান মেলালে প্রায় ১২০০-র ওপর গোল, হাজারের ওপর আসিস্ট, ১০টা ব্যালন ডি ওর, ফিফা দ্য বেস্ট আরও শয়ে শয়ে রেকর্ড। দেশের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার থেকে ক্লাবের কিংবদন্তি, প্রতিপক্ষের ত্রাস হয়ে ওঠা থেকে ক্রমাগত নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার খিদে রোনাল্ডো-মেসির নামে আছড়ে পড়ল ফুটবল সৈকতে।

মেসি-রোনাল্ডো দুটো নাম নেই আজ আর। সময়ের সেই অদৃশ্য বাঁধন পেরিয়ে তাঁরা ভেসে যাচ্ছেন মলয় বাতাসে। পেলে-মারাদোনা-ক্রুয়েফ-প্লাতিনি-বেস্ট-কাইজার-জিদান-বাজ্জিও-গাউচো- কেউ না!  ২০০৭-২০১৯, এক যুগ ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে নিজেদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স মেলে ধরে একে অপরকে ছাপিয়ে যাবার লড়াই কাউকে করতে হয়নি। ফুটবলের ইতিহাসে যুগে যুগে কিংবদন্তিরা এসেছেন কিন্তু একুশ শতকে প্রথমবার ফুটবল সাম্রাজ্য শাসন করলেন দুই রাজা, শাসন করলেন তাঁদের স্বকীয় ভঙ্গিতে, তাই হয়তো এই প্রজন্ম চাক্ষুষ করল ইতিহাস। আর তো কয়েকটা দিন।

ফুটবলের নতুন প্রজন্মকে হাত ধরে আসতে আসতে মঞ্চে নিয়ে আসেন দুই বিস্ময়। নিজেদের বিশ্বাস-ভালবাসা-অধ্যাবসায় আর প্রতিভা দিয়ে গড়া রাজসিংহাসন ছেড়ে দেন নতুন সম্রাটকে, কালের নিয়মে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যান আধা আধি ভেঙে যাওয়া দুই পৃথিবী, ফুটবল ঈশ্বর দূর থেকে মাথার টুপিটা খুলে আহ্বান করেন দুজনকে। কোটি কোটি ফ্যান- ক্রমাগত দুই রাজার তুলনা- একটার পর একটা ভেঙে যাওয়া স্কোরবোর্ড- বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফ্যান ফলোয়ার- সবকিছু থেকে অনেক দূরে যেন রাতের ডিনার টেবিলে মুখোমুখি বসেন মেসি-রোনাল্ডো। কাচের টেবিলে ছায়া পড়ে ফুটবলের। দুজনের অনন্ত বিস্ময়ের দুর্লঙ্ঘ যোগসূত্র, নীচে দেখা যায় নতুন প্রজন্ম মাঠে নামছে বল পায়ে। হেসে ওঠেন দুজনে। মোমবাতির আলোয় হাত ধরে থাকেন তাঁরা। এই সময়ের সুতোয় বাঁধা পৃথিবীর দুই অদম্য ফিনিক্স সময়ের জাল ছিঁড়ে হেঁটে যান অনন্তলোকের পথে।

ফুটবল প্রেমীরা বেঁচে থাকবে তাঁদের সেই ফেলে যাওয়া ঘ্রাণটুকু নিয়ে, আর তো কটা দিন।  এই শেষ অধ্যায়ে হয়তো দুজনে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা অনেক সোজা, অনেক….