অরিঘ্ন মিত্র:‌ সবার ঊর্ধ্বে দেশ এবং জাতীয় পতাকার সম্মান। এই চিন্তাকে মাথায় রেখেই গত সাত–আট বছর ধরে জাতীয় পতাকা কুড়িয়ে চলার কাজ করছেন প্রিয়রঞ্জন ওরফে মনু। স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশের নানা জায়গায় উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা। পরে সেগুলোই অযত্নে অনাদরে পড়ে থাকে রাস্তার ধারে। সেই পতাকাগুলোকে সযত্নে কুড়িয়ে রাখেন মনু। সামনেই প্রজাতন্ত্র দিবস। ফের উত্তোলন করা হবে জাতীয় পতাকা। এবারও সেই পড়ে থাকা পতাকাগুলো তুলে রাখতে প্রস্তুত মনু। নিউজপোলই প্রথম বাংলা সংবাদমাধ্যমে সামনে নিয়ে এসেছিল মনুকে। সঙ্গে সঙ্গেই ‘‌ভাইরাল’‌ হয়ে গেছিলেন তিনি। এবার এই পতাকা কুড়িয়ে নেওয়ার কাজের মাধ্যমেই সম্প্রীতির বীজ বপন করবেন সমস্ত ধর্মের মানুষদের মধ্যে। পাশাপাশি, ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যেও সৌহার্দ্য তৈরি কাজ করবেন মনু।
বালির বাসিন্দা এই যুবক বললেন, ‘‌ভারত মায়ের প্রকৃত সম্মান রক্ষা হবে তখনই, যখন আমরা এই দেশে সমস্ত হিংসা, ধর্মীয় ভেদভেদের রাজনীতি ভুলে ভালবাসার মেলবন্ধনে জড়িয়ে গিয়ে একসঙ্গে ভালবেসে থাকবো। আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের মারতে থাকি তাহলে কি ভারতমাতা সুখে থাকবে? পাশাপাশি, ফুটবল মাঠে বাড়তে
থাকা হিংসা নিয়েও উদ্বিগ্ন মনু। বললেন, ‘‌মাঠের খেলা হয় ৯০ মিনিটের। কিন্তু সেই খেলাকে কেন্দ্র করে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান দলের সমর্থকরা প্রায়শই নিজেদের মধ্যে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। আমি চাই মাঠের বাইরে এই দুই দলের সমর্থকদের শত্রুতা শেষ হয়ে যাক। আমাদের পরিচয়, আমরা ভারতবাসী। ঘটি–বাঙালির দ্বৈরথের প্রভাব যেন মাঠের বাইরে না পড়ে।’‌ তাই ২৭ জানুয়ারি হুগলী জেলার উত্তরপাড়ার প্যারিমোহন কলেজ থেকে কয়েকজন অনুগামীকে সঙ্গে নিয়ে একটি মিছিল করে মনু নেমে পড়বেন রাস্তায়। রাস্তায়, নর্দমায় পরে থাকা জাতীয় পতাকা গুলি তুলে আনবেন। কিন্তু এইবারের কাজে তিনি তাঁর মিছিলে সঙ্গে রাখছেন পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষদের। তাঁর মিছিলে থাকছেন বেলুড় মঠের মহারাজ, বালি অঞ্চলে মসজিদের ইমাম, স্থানীয় গির্জার ফাদার, জৈন পণ্ডিত এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক করে তিনি প্রকৃত ভারতের চরিত্র তুলে ধরতে চাইছেন। থাকবেন ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান ক্লাবের সমর্থকরাও। মনু বললেন, ‘‌স্বামী বিবেকানন্দ এবং রামকৃষ্ণদেবের অনুপ্রেরণায় আমি এই কাজ করছি। জাত, বিভেদ ভুলে স্বামীজি সমগ্র ভারতবাসীকে নিজের ভাই, বোন হিসেবে চিনতে শিখিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যত মত তত পথ। এই সমস্ত বাণীকে মাথায় রেখেই এই কাজ করছি।’ তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতিভেদের বিষ যেভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে তাতে ভারতবাসী সংঘবদ্ধ না হলে ভারতমায়ের অবমাননা হতেই থাকবে। ‘‌বন্ধুত্বের বার্তা দেওয়ার জন্য তাঁর মিছিলে মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলের ফ্যানক্লাব থেকে সমর্থকরা আসবেন এবং একসঙ্গে হাতেহাত ধরে পা মেলাবেন মোহন-ইস্টের জার্সি পরে,’ বললেন মনু।
নিউজপোলে তাঁর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর একটি রাজনৈতিক দল থেকে তাঁকে বারবার যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অনেক প্রলোভনও দেখানো হয়। কিন্তু তিনি এই কাজকে কোনও রাজনৈতিক দলের সুবিধার্থে ব্যবহার হতে দিতে চান না। তাই নিজের লক্ষ্য অবিচল থেকে এই কাজে কোনও রাজনৈতিক রঙ লাগতে দেন না তিনি। এই প্রথমবার হুগলি জেলায় জাতীয় পতাকা সংগ্রহ করার এই কাজ করতে চলেছেন মনু। রাজা রামমোহন রায়ের জন্মভূমিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গোটা হুগলিজেলা এক’মাস ধরে পরিক্রমা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।