ওরে নবমী নিশি না হও রে অবসান।
শুনেছি দারুণ তুমি না রাখ শতে মান।…

অমিতকুমার বিশ্বাস

পাশের বাড়ির গানপাগল বীরেনকাকা মাটির দাওয়ায় বসে আপনমনে গুনগুন করছেন এই গান। অন্ধকার রাতের নাভিমূল থেকে উৎসারিত এ-গানের মূর্ছনায় ভারী হয়ে আসছে প্রাক্ হেমন্তের শিরশিরে বাতাস। আজ নবমী। পঞ্চাশোর্ধ বীরেনকাকার অর্ধনত, ভাবোন্মাদ দু’টি চোখের পাতায় অন্ধকারেও জোনাকির মৃদু আলোর মতো দিপদিপ করছে দশমীর বিষাদচিহ্ন।

মন্দিরের ঘড়িতে ঢং ঢং করে জানান দিল রাত ছুটে চলেছে মহারাত্রির দিকে। শরতের ম্লান আকাশে চাঁদের কোনও ছিঁটেফোটাও নেই। অকালবর্ষায় তারাদের চেনা সে মজলিশও অবলুপ্ত। অতিমারীর ঘূর্ণিপাকে ডুবন্ত এই গ্রহটি যেন সদ্য মাতৃশোকে বিহ্বল, হতচকিত।অথচ প্রকৃতি এ বছরও ছিল অকৃপণ। নিজের ঝুলি এবারও সে দিয়েছে উজাড় করে। নদীর ধারে কাশফুলের হিল্লোল। গাঢ় নীল আকাশে পেঁজা মেঘের সাম্পান। সকালে কাঁচা হলুদের মতো সোনা রোদ। শুধু মানুষ নেই। নেই মানুষের মনের ঘরের আলো।

কোভিডের রোমশ থাবা এক মানুষ থেকে আরেক মানুষকে নিয়ে গেছে ৬ ফুট দূরে। মানুষের ছায়া সরে-সরে গেছে আরেক মানুষের থেকে। দূরে-দূরে থাকাই এখন দস্তুর। দূরত্বের মধ্যেই রয়েছে সভ্যতার আরোগ্যলাভের সম্ভাব্য প্রতিকার। মনে পড়ছে বিগত বছরগুলির জমকালো সব দিনের কথা। চতুর্থী থেকে শুরু হয়ে দেবীদর্শন পর্ব শেষ হত আমাদের একেবারে নবমীর বিষাদ সন্ধিক্ষণে। নতুন শারদীয়া পুজোবার্ষিকীর গন্ধে মনের ঢাকে বোধনের যে কাঠি একদিন পড়েছিল তাতে বেজে ওঠে বিসর্জনের তিরতিরে সানাই। রাত পেরোলেই সিঁদুররাঙা সব মেঘ। তার আড়ালে মহামায়ার ছলছল চোখের ছবি দর্পণজুড়ে। চোখ ছলছল আমাদেরও। আরও একটা বছরের অপেক্ষা। আরও একটা বছর শূন্য মণ্ডপের কৈলাসের পথ চেয়ে অপেক্ষার পাথর জমিয়ে রাখা।

রাতের অন্ধকার আর একটু ঘন হয়ে আসছে। বীরেনকাকা এবার মধুকবির কাব্যে সুর ধরেছেন…

“দ্বিগুন আঁধার ঘর হবে, আমি জানি,
নিবাও এ দীপ যদি!”-– কহিলা কাতরে
নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রাণী।”

আমার অপ্রশস্ত জানালায় এখন নবমীর কোলাহলহীন মন্দিরের হলুদ আলোর আবছায়া অন্ধকার। একটু দূর থেকে হলেও চোখে পড়ছে। শূন্য মণ্ডপে ঢাকি রেখে গেছে তার ঢাক। হাওয়ায় কাঠি নড়ে-নড়ে উঠছে, মৃদু আওয়াজ উঠছে নবমীর শূন্য মণ্ডপে। দশদিগন্ত ব্যাপ্ত করে আরও বিষাদ ছড়িয়ে পড়ছে শেষ শরতের হাওয়ায়। এমন নবমী নিশি কেউ কখনও দেখেছে কি পূর্বে? শারদোৎসবের ইতিহাস ঘাটলে এমন ছবি খুঁজে পাওয়া শুধু কঠিন নয় দুষ্করও বটে। যেখানে বিচ্ছেদ আছে, কাঁধে হাত রাখার মানুষ নেই। বুকে জড়িয়ে ধরার আকুতি আছে, চাহনিতে সম্মতি নেই। চোখের জল মুছে মায়ের ‘আসছে বছর আবার হবে’-র কোনও উপশম নেই। নেই নেই, শুধু নেই।

কার্তিকের রাত্রিজুড়ে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূ-কম্পনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে বিরাট এক শূন্যের আলোড়ন। সমস্ত থাকার মধ্যেও প্রাগৈতিহাসিক আর্কিওপ্টেরিক্সের বিশাল ডানায় বিষাদের ছায়া ফেলে নবমী নিশি বাঁশির করুণসুরের মতো একাকী বেজে যাচ্ছে। বীরেনকাকার জড়ানো গলা আবারও কানে আসছে। ‘যেও না নবমী নিশি, আজি লয়ে তারাদলে’…।