নিউজপোল ডেস্ক:‌ মাত্র ২৪ হাজার টাকা!‌ ওই টাকার একটা বিমা নিয়ে বচসার জেরেই জিয়াগঞ্জের শিক্ষক, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং ৫ বছরের ছেলেকে কুপিয়ে খুন করেছে সে। পুলিশের জেরায় স্বীকার করল উৎপল বেহরা। বছর কুড়ির ওই তরুণের বাড়ি মুর্শিদাবাদেরই সাগরদিঘি থানার সাহাপুর গ্রামে। একটি রক্তমাখা বিমার কাগজই ধরিয়ে দিল তাকে। মঙ্গলবার মুর্শিদাবাদ জেলার পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানালেন মুকেশ কুমারকে গ্রেফতারের কথা। আদালতে হাজির করানোর পর ধৃতকে আপাতত ১৪ দিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। সেখানে তাকে আরও জেরা করা হবে।
গত ৮ অক্টোবর, বিজয়া দশমীর দুপুরে জিয়াগঞ্জের বাড়িতে খুন হন স্কুলশিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বিউটি ও পাঁচ বছরের ছেলে অঙ্গন। তিন জনকেই হাঁসুয়া দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়েছিল। তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে ধন্দে পড়ে। খুনের মোটিভ এবং খুনি কে, তা বুঝে উঠতে পারছিল না। তার মধ্যেই শুরু হয় রাজনৈতিক দড়ি টানটানি। বিজেপি তেড়েফুঁড়ে ওঠে। দাবি করে, বন্ধুপ্রকাশ আরএসএস কর্মী। খুনের জন্য রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের দিকে আঙুল তোলে। এর মধ্যেই পুলিশের হাতে আসে বিউটির একটি ডায়েরি। তাতে স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটে ওঠে। তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, পাল দম্পতির সম্পর্কের মধ্যে হয়তো তৃতীয় কোনও ব্যক্তি ঢুকে পড়েছিলেন। খুনের পিছনে হয়তো তারি হাত রয়এছে। আত্মীয়–পরিজনকে জেরা করেও পুলিশ তেমন সদুত্তর পায়নি।
অবশেষে সপরিবারে শিক্ষক খুনের ধোয়াশা কাটল। এ দিন মুকেশ কুমার জানান, তদন্তে নেমে বন্ধুপ্রকাশের বাড়ি থেকে একটি রক্তমাখা কাগজ উদ্ধার হয়। কাগজে উৎপল বেহরার নাম পাওয়া যায়। সেই সূত্রেই তাকে গত কয়েক দিন ধরে জেরা করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। চাপের মুখে একটা সময়ে ভেঙে পড়ে সে। এর পরেই সোমবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। খুনের কথা স্বীকারও করে উৎপল।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, বন্ধুপ্রকাশ বিভিন্ন অর্থলগ্নি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন বিমা কোম্পানির সঙ্গেও কাজ করতেন তিনি। উৎপল বেহরারও একটি বিমা করান বন্ধুপ্রকাশ। আর সেই বিমা নিয়েই শুরু অশান্তি। মুকেশ কুমারের দাবি, উৎপল টুকটাক রাজমিস্ত্রির কাজ করত। সেই কাজে মাঝে মাঝে বাইরে যেত। বন্ধুপ্রকাশ তাকে দিয়ে যে বিমাটি করিয়েছিলেন, তার বাৎসরিক প্রিমিয়াম ছিল ২৪ হাজার ১৬৭ টাকা। পুলিশকে জেরায় উৎপল জানিয়েছে, বিমা করানোর পর প্রথম বারের টাকার রসিদ বন্ধুপ্রকাশ তাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন হয়ে গেলেও দ্বিতীয় প্রিমিয়ামের রসিদ আর দেননি। রসিদ চেয়ে বার বার তাগাদা দিয়েও কোনও লাভ হয়নি। উল্টে তার সঙ্গে বন্ধুপ্রকাশ অভদ্র আচরণ ও গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ উৎপলের। উৎপলের সন্দেহ হয়, বন্ধুপ্রকাশ তার প্রিমিয়ামের টাকা জমা দেননি। প্রতিশোধ নিতেই খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়, জেরায় জানিয়েছে উৎপল।
দশমীর দিন, ৮ অক্টোবর জিয়াগঞ্জে নিজের বোনের বাড়িতে জামাকাপড় দিতে গেছিল উৎপল। সেখান থেকেই যায় বন্ধুপ্রকাশের বাড়িতে। সঙ্গে ছিল হাঁসুয়া। পুলিশের কাছে সে জানিয়েছে, খুনের জন্য তৈরি হয়েই সে ওখানে গিয়েছিল। আগে থেকে চিনতেন বলে উৎপলকে দেখে ঘরের দরজা খুলে দেন বন্ধুপ্রকাশ। সেই সুযোগে ঘরে ঢুকে এলোপাথারি হাঁসুয়া চালায় সে। প্রথমে খুন করে বন্ধুপ্রকাশকে। পরে পাশের ঘরে গিয়ে খুন করে তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে।