বিতর্ক। বিচ্ছেদ। পুনর্জন্ম। এক নজরে বিগত এক–দেড় মাসে এটাই পৃথিবীর আপডেট। তারই মধ্যে নতুন লাইন আপে পৃথিবী ফিরছে তাদের নতুন গান ‌‘‌মুক্তি’‌ নিয়ে। কী সমস্যা হয়েছিল ব্যান্ডের অন্দরে, জানার বহু চেষ্টা করল নিউজপোল। কিছুতেই পুরোটা খোলসা করলেন না কৌশিক চক্রবর্তী। বরং নতুন গান, নতুন সাউন্ড নিয়ে একান্ত, দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিলেন প্রিয়ম সেনগুপ্ত-কে।

পৃথিবী এখন কেমন আছে?‌
কৌশিক:‌ খুব ভাল আছে। (‌একটু থেমে)‌ বরং আমি বলব খুব খুব ভাল আছে।

এত ঝড়ঝাপটা, এত বিতর্কের পরে এইটুকু ছোট্ট উত্তর?‌ নিউজপোলের পাঠকরা এবং পৃথিবীর ভক্তরা কিন্তু একটু বড় উত্তর এবং বিশদে ব্যাখ্যা আশা করেছিলেন।
কৌশিক:‌ (‌হাসি)‌ দেখুন, শরীর থাকলে যেমন খারাপ হয়, তেমনই পাঁচটা মানুষ একসঙ্গে চলতে গেলেও কিছুটা সমস্যা হতে পারে। সেটা অস্বাভাবিক তো কিছু নয়। শরীর ছিল, খারাপ হয়েছিল। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে ওষুধ দিয়েছি। এখন আমরা ভাল আছি।

আপনাদের যারা ভক্ত। তাঁদের অনেকেরই মনে এখনও প্রশ্ন, ঠিক কী হয়েছিল?‌
কৌশিক:‌ ঠিক কী হয়েছিল, সেটা নিয়ে আমার মনে হয় না প্রকাশ্যে আলোচনার খুব একটা দরকার আছে। পৃথিবীকে আমি কোনওদিনও ব্যক্তিগত স্তরে ভাবিনি। দলগত স্তরেই ভেবেছি। কিন্তু শেষের দিকে বিষয়টা কারও কারও কাছে ব্যক্তিগতই হয়ে গেছিল।

এই যে বলছেন ব্যক্তিগত হয়ে গিয়েছিল, সেটা কি আপনার দিক থেকে?‌
কৌশিক:‌ আমার দিক থেকে না হলেও বাকিদের কারও কারও দিক থেকে। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি কোনও দিনও পৃথিবীকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্তরে ভাবিনি। পৃথিবী শুরু হওয়ার দিন থেকে আমি কোনও দিনও কারও ব্যক্তিগত জায়গায় ঢুকতে চাইনি, ঢুকিওনি। কিন্তু শেষের দিকে ব্যক্তিগত স্তরের কিছু ঘটনা দলগত স্তরে এসে পৃথিবীকে ধাক্কা দিচ্ছিল। তখন আমারই মনে হয়েছিল, এই সমস্যার কী সমাধান হতে পারে, সেটা ভেবে দেখা উচিৎ?‌

 

ব্যান্ড মেম্বারদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করেননি?‌
কৌশিক:‌ আসলে আমি মানুষটা একটু আবেগপ্রবণ এবং নরম। মুখের ওপরে কটূ কথা বলতে একটু বাধোবাধো ঠেকে। তখন আমারই মনে হয়েছিল, আমিই হয়তো এই দলে খাপ খাচ্ছি না। তাই আমিই প্রথমে সিদ্ধান্ত নিই যে এই দল থেকে সরে যাব। পরে তারাই সরে দাঁড়াল। তবে দলের বাকিদের সঙ্গে এখনও আমার কোনও খারাপ সম্পর্ক নেই। বিশেষ করে একজনের সঙ্গে। বাকিদের সঙ্গে এখনও আমার যোগাযোগ হয়নি। যে দিন ঘোষণা করেছিলাম যে আমি বিরতি নিচ্ছি, তখন ওই একজনই আমার বাড়িতে এসেছিল। কথা বলেছিল। বাকিদের সঙ্গে আমার কথা হয়নি। তার মানে এই নয় যে, আমরা আর বন্ধু থাকব না। এখনও আমরা কাছের মানুষ হিসেবেই থাকব। একই পরিবারের সদস্যদের মতোই হাসিঠাট্টা করব।

তার মানে, যারা এখন আর পৃথিবীতে নেই, তারা এখনও আপনার পরিবার?‌
কৌশিক:‌ (‌মুখের কথা শেষ না করতে দিয়েই)‌ অবশ্যই। তারা আমার পরিবারের অঙ্গ ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু এমনও তো অনেক সময় হয় না, যে পথ চলতে চলতে কারও সঙ্গে পথ চলাটা হয়ে ওঠে না। এটাও সেরকমই ব্যাপার।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল যখন, তখন কী কোনওভাবে সমস্যাটা মিটিয়ে নেওয়া যেত না?‌
কৌশিক:‌ সমস্যা একটা নয়, একাধিক। আমি অন্যান্য অসুবিধাগুলোর কথা ছেড়েই দিচ্ছি, সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই না। তবে, একটা কথা অস্বীকার করা যাবে না। সেটা হল পৃথিবীর ‘মিউজিক্যালি আপডেটেড’‌ হওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল।

 

মিউজিক্যালি আপডেটেড বলতে?‌
কৌশিক:‌ প্রত্যেকের গানবাজনা শেখার যে ব্যাপারটা সেটায় বোধহয় একটু খামতি থেকে যাচ্ছিল। একজন মিউজিশিয়ানের কাছে কিন্তু নিরন্তর শিখে যাওয়াটা খুব দরকারি ব্যাপার। আমার বয়স প্রায় চল্লিশ। আমি কিন্তু এই বয়সেও নিয়মিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিই। এই শেখাটার কোনও বিকল্প নেই। এটা আমি বাকিদের মধ্যে পাচ্ছিলাম না।

অনেকক্ষণ ধরে ঝামেলা নিয়ে কথা বলে গেলাম। এবার ‘‌মুক্তি’‌–র প্রসঙ্গে আসা যাক। এই যে ব্যান্ডে এতো টানাপোড়েন গেল, তারপরেই নতুন লাইন–আপ। আর ঠিক তারপরেই যে গানটা প্রকাশিত হচ্ছে, সেটার নাম কি না মুক্তি!‌
কৌশিক:‌ ওই যে বললাম, একটা খারাপ লাগা তৈরি হয়েছিল। আমি অনেকদিন থেকেই এই খারাপ লাগা থেকে মুক্তি চাইছিলাম। তবে গানটা কিন্তু অনেক দিন ধরে লেখা গান নয়। হঠাৎ করে আসা একটা গান। সুরটাও হঠাৎ করে ফেলা। গানটা খুব সহজভাবেই এসেছে আমার মধ্যে, একেবারেই পরিশ্রম করতে হয়নি। তার অবশ্য একটা বড় কারণ হল, আমি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেটার থেকে মুক্তি চাইছিলাম। গত মাসের ২৩ তারিখ নাগাদ গানটা লিখে ফেলি। আর এই মাসের ২৩ তারিখে গানটা মুক্তি পাচ্ছে। তবে আমি এটাও বলব, যে কোনও দৃষ্টিকোণ থেকে যদি মানুষ গানটা শোনেন, তাহলে এই গানটার সঙ্গে নিজেকে ‘‌রিলেট’‌ করতে পারবেন। কারণ, আমরা সকলেই কোনও না কোনও পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাইছি। আগেও দেখেছি, আমার গানের সঙ্গে অনেকেই খুব সহজে ‘‌রিলেট’‌ করে নিতে পারেন। মিউজিক ভিডিওর শ্যুট করতে গিয়ে দেখলাম, এবারও কিন্তু সেটাই হচ্ছে। পরিচালক শমীক রায়চৌধুরী এবং ওর দলের যে বাকি কলাকুশলীরা, যেমন প্রসেনজিৎ কোলে, সায়ন মুখোপাধ্যায়, সুচন্দ্রা করমহাপাত্র— প্রত্যেকেই কিন্তু গানটা শুনে উচ্ছ্বসিত। আর ওদের সঙ্গে কাজটাও হয়েছে খুব মজা করে।

পৃথিবীর নতুন লাইন আপে যাদের দেখতে পাচ্ছি, তারা তো আপনার চেয়ে বয়সে অনেকটাই ছোট। মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না?‌
কৌশিক:‌ বয়সে ছোট তো বটেই। এমনকী, যে সবচেয়ে ছোট, তার বয়স আমার অর্ধেক, সবে প্রথম বর্ষের ছাত্র!‌ তবে এটাও দেখতে হবে, প্রথম বর্ষের ছাত্র হয়েও এই বয়সে সে পৃথিবীর মতো একটা ব্যান্ডে বাজানোর সুযোগ পাচ্ছে। তার মানে ‘‌মিউজিক্যালি’‌ সে কতটা পরিণত!‌ পুরো লাইন আপ বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসবে, সে হল অরুণাংশু ডাম্পি বাগচী (‌গিটার)‌, কনিষ্ঠতম সদস্য দেবাংশু ভট্টাচার্য (‌গিটার)‌, দীপ ঘোষ (‌বেস গিটার)‌, দীপায়ন মৈত্র (‌কি–বোর্ড)‌, অনিরুদ্ধ মণ্ডল (‌ড্রাম্‌স)‌। এই অনিরুদ্ধ আমাদের ফ্যান ক্লাবের সদস্য ছিল। ও আমাদের রোডি–ও ছিল একটা সময়। ম্যানেজমেন্ট সামলাচ্ছে আমার স্ত্রী ঈশিতা। ও আমাদের ওপরে একেবারে মিলিটারি শাসন চালাচ্ছে (‌হাসি)‌। ও ম্যানেজার হওয়ার পর থেকে ম্যানেজমেন্টে বহু বছর ধরে তৈরি হওয়া ফাঁকগুলো একএক করে মেটাচ্ছে।

এবার তাহলে আপনাদের কর্মপদ্ধতি কোন দিকে এগোচ্ছে?‌
কৌশিক:‌ এখন পরপর আমাদের কিছু কনটেন্ট আসবে। খুব শিগগিরই আমরা নতুন অ্যালবাম ‘‌চ্যাপ্টার ফোর’‌–ও রিলিজ করবে। ভেবেছিলাম বাংলা নববর্ষে অ্যালবামটা রিলিজ করব। কিন্তু সেটা আমরা কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছি। হয়তো আগস্টে এই অ্যালবামটা আসবে। এছাড়া ‘‌রিইনকারনেশন’‌ নামে একটা ইপি–ও আসছে শিগগিরই।

নতুন সদস্য, নতুন লাইন আপ। আপনাদের সাউন্ড তো অবশ্যই বদলাচ্ছে। এখানে দুটো প্রশ্ন। সাউন্ড বদলে কোনদিকে যাচ্ছে এবং কতটা বদলাচ্ছে?‌
কৌশিক:‌ পৃথিবীর নতুন গানটা না শুনলে এই বদলটা বোঝা যাবে না। আমরা ইতিমধ্যেই কয়েকটা রিহার্সালের ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেছি। শ্রোতারা সেগুলো শুনেছেন। শুনে কিন্তু উচ্ছ্বসিত প্রশংসাই করেছেন। তাছাড়া দেখুন, গোটা বিশ্বে মিউজিকের ভাষা এবং সাউন্ড পাল্টে যাচ্ছে। আমাদের সেটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতেই হবে। তবে তার মানে এই নয়, আমরা আমাদের সাউন্ডের খোলনলচে পাল্টে ফেলছি। মূলগত কাঠামোটা একই থাকছে। তবে তার ওপরে নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হচ্ছে। দুটো জিনিসে জোর দেওয়া হচ্ছে। এক, ‘‌প্রাসঙ্গিক থাকা’, দুই ‘‌অল্টারনেটিভ মিউজিক’‌।

নতুন লাইন আপে সময় দিতে গিয়ে আপনার সোলো প্রোজেক্ট ‘‌কৌশিক ও নগর সংকীর্তন’‌–এর কাজে ক্ষতি হচ্ছে না?‌
‌কৌশিক:‌ কোনও প্রভাব পড়াই প্রশ্নই নেই। কৌশিক ও নগরসংকীর্তন এক–দেড় বছরের মধ্যে যে জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে, সেটা যথেষ্ট মজবুত ভিত্তি। আগের বছর কৌশিক ও নগর সংকীর্তন ছ’‌মাসে আটটা প্রোজেক্ট উপহার দিয়েছে। এবার এগুলো শ্রোতাদের ভাল করে শোনার সময় দিতে হবে।