মৌমিতা ভট্টাচার্য কর: স্থানীয় মানুষদের কাছে ওঁরা পরিচিত অপরাধপ্রবণ হিসেবে। ঘরের বাসনকোসন হোক বা পোষা গরু–ছাগল, যা কিছু খোয়া যেত পুরুলিয়ার পারুইগ্রামের উচ্চবর্ণের বাসিন্দারা দোষ চাপাতেন স্থানীয় শবরদের ওপরে। এভাবেই আশপাশের এলাকাতেও রটে গিয়েছিল শবরদের দুর্নাম। ছোট থেকেই এই ঘটনা চোখের সামনে দেখে এসেছেন পারুইয়ের আদি বাসিন্দা অরূপ মুখোপাধ্যায়। সেখান থেকেই পণ করেন, নিজের এলাকা কিংবা এলাকার শবরদের দুর্নাম ঘোচাবেন তিনি।
লেখাপড়া শিখিয়ে সেই শবরদের মূল স্রোতে ফেরানোর জন্য পারুই লাগোয়া পুঞ্চা গ্রামে আস্ত একটা স্কুল গড়ে দিয়েছেন পেশায় পুলিশকর্মী অরূপ। কোনও রাজনৈতিক দল বা সরকারি দাক্ষিণ্যে নয়, এই স্কুল চলে একা অরূপের খরচে।
পেশায় কলকাতা পুলিশের সাউথ ট্রাফিক গার্ডের কনস্টেবল অরূপবাবু। শৈশবে থাকতেন গ্রামের বাড়ি পুরুলিয়ার পারুইতে। সেখানেই তাঁর দাদুকে বলতে শুনতেন, গ্রামে যা কিছু চুরি হতো তা নাকি শবররাই করেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কেন শবররা চুরির রাস্তা বেছে নিতে বাধ্য হন? অরূপ নিউজপোলকে বললেন, ‘দাদু জানিয়েছিল, ক্ষুধা ও শিক্ষার অভাবেই শবররা চুরিকেই নিজেদের পেশা বানিয়ে নিয়েছেন।’‌ এই কথা দাগ কেটে গেছিল ছোট্ট অরূপের মনে। শৈশবেই তিনি ঠিক করেন, বড় হয়ে এই সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করবেন। প্রতিবেশী শবরদের ফিরিয়ে আনবেন সমাজের মূল স্রোতে।
অরূপবাবুর রক্তেই রয়েছে সমাজসেবার বীজ। তিনি বলছিলেন, ‘‌শৈশবে ঠাকুমাকে দেখেছি, বাড়ির ভাঁড়ার থেকে গোপনে চাল সরিয়ে সেটা শবরদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে, যাতে তাঁরা ক্ষুধার্ত না থাকেন। ঠাকুমা বলতেন, ‘‌যত দিবি তত বাড়বে।’‌ এই মন্ত্রকেই নিজের জীবনের ব্রত বানিয়ে নিয়েছিলেন অরূপ। ১৯৯৯ সালে অরূপবাবু কলকাতা পুলিশের চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরির প্রথম মাস থেকেই তিনি টাকা জমাতে শুরু করে দেন। ২০১০ সালে তাঁর সেই জমানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় আড়াই লক্ষ টাকায়। এইবার তিনি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। অরূপবাবু জানালেন, ‘‌আমার বন্ধুর বাবা শিরদশচী মুখোপাধ্যায় আমাকে স্কুল তৈরির জন্য পুঞ্চাতে জমি দেন। সেই জমিতে স্কুল করার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে দেড় লক্ষ টাকা ঋণ নিই এবং মায়ের কাছ থেকে নিই ৫০ হাজার টাকা। এভাবে মোট সাড়ে চার লক্ষ টাকা খরচ করে পুঞ্চায় গড়ে ওঠে শবরদের স্কুল।’‌


২০১১ সালে মাত্র ১৫ জন পড়ুয়া নিয়ে যে স্কুলটি শুরু হয়, বর্তমানে তার প্রত্যেকটি ক্লাসে পড়ুয়ার সংখ্যা ১২৫ থেকে ১৩০ জন। শবরদের শিশুদের পড়াশোনা, খাওয়া–দাওয়া সব দায়িত্ব একাই বহন করেন কলকাতা পুলিশের এই কনস্টেবল। সরকারি বা রাজনৈতিক দলের দান নেওয়াতেও প্রবল অনীহা তাঁর। কারণ অরূপবাবু চান না রাজনীতির রং তাঁর এই স্কুলে লাগুক। অরূপবাবুর কথায়, ‘‌এলাকার মানুষ আমার পাশে আছেন। এখানে শিশুদের চারবেলা খাওয়ানোর জন্য প্রতিদিন ৭০ কিলোগ্রাম মতো চাল দরকার হয়। এলাকার মানুষ কেউ চাল দেন, কেউ টাকা পাঠান। এছাড়া কিছু মানুষ টাকা পাঠান। তাঁরাই তাঁকে টাকা পাঠান। এছাড়াও চাকরির টাকা তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে স্কুলের সব প্রয়োজন মিটে যায়।’‌ তিনি আরও বলেন, ‘‌আমি চাই না রাজ্য সরকার আমার স্কুলের জন্য কিছু করুক। বরং শবর সম্প্রদায়কে মূলস্রোতে ফেরানোর জন্য তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াক সরকার। তাঁদের চাকরি দিক। এগুলো বেশি দরকারি।’‌
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম এই চার জায়গায় শবরদের বাস। রাজ্য সরকারের সাহায্য তাঁদের কাছে আসে না বলেই অভিযোগ। মাঝপথেই নাকি তা উধাও হয়ে যায় বলে অভিযোগ অরূপবাবুর। তিনি বললেন, ‘‌এই দিকটা রাজ্য সরকার দেখুক। আমি তো এই সম্প্রদায়ের মাথা থেকে অপরাধী তকমাটা ঘোচাতে চাইছি। সেটাই আমার মূল উদ্দেশ্য। সরকারও সেই চেষ্টাই করুক।’‌ নিউ আলিপুর থানার ব্যারাকে একাই থাকেন অরূপবাবু। পুরো পরিবার রয়েছে পুরুলিয়ায়। ছুটিতে সেখানে গেলে তিনি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না। বাইকে নিয়ে ১০০ কিমি রাস্তা পার করে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়ান এবং কার কী সমস্যা রয়েছে তা শোনেন। সমাধানেরও চেষ্টা করেন। এখন সকলের কাছে তিনি ‘‌শবর পিতা’‌, ‘‌পুলিশ বাবা’‌ বলে পরিচিত। অরূপবাবু বলছিলেন, ‘‌এখানে হাজার হাজার ছেলেমেয়ের বাবা আমি। গর্ববোধ হয়।’‌ এতবড় কাজ করার পরও ময়দান থানার পাশে তাঁকে দেখতে পাবেন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন একমনে। ঠিক যেমন শবরদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।‌