পারমিতা দাস:‌ সুপারহিরোরা সাধারণত রাতেই বেরোন নিজের শহরকে রক্ষা করতে। কলকাতারও রয়েছে এমন এক সুপারহিরো, যিনি রোজ রাতে বেরিয়ে পড়েন শহরের রাজপথে। লড়াই করেন ক্ষুধা নামক খলনায়কের সঙ্গে। তিনি পার্থ রায়চৌধুরী। রোজ রাত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত খাবার বিতরণ করেন এসএসকেএম, এমআর বাঙুর এবং চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে রোগীর পরিজনদের। এবং এই পরিষেবা তিনি দেন একেবারে নিখরচায়। রোগীর পরিজনদের দেওয়ার পরে খাবার উদ্বৃত্ত থাকার পরে সেটা পৌঁছে দেন অভুক্ত ফুটপাথবাসী শিশুদের। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এই কাজ শুরু করেছেন পার্থ। কলকাতার সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে ভাইরালও হয়েছে তাঁর কীর্তিকাহিনী। ভালবেসে রোগীর আত্মীয়রা তাঁর নাম দিয়েছেন ‘‌হসপিটাল ম্যান’‌!‌

কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলোতে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিদিনই আসেন অগণিত রোগী। এঁদের একটা বড় অংশই অভাবী, দরিদ্র। চিকিৎসার খরচ ওঠাতেই তাঁদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। তার ওপরে রয়েছে রোগীর পরিবারের সদস্যদের থাকা–খাওয়ার খরচ। এঁদের কাছে ‘‌হসপিটালম্যান’‌ পার্থ সাক্ষাৎ দেবদূত। হঠাৎ কেন এই কাজ শুরু করলেন?‌ নিউজপোলকে কালীঘাটের বাসিন্দা পার্থ বললেন, ‘‌কয়েকবছর আগে আমি নিজে অসুস্থ হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। তখন একদিন রাতে দেখেছিলাম, আমার পাশের বেডে একজন দরিদ্র রোগী তাঁর মা–র সঙ্গে একটি মাত্র রুটি ভাগ করে খাচ্ছেন। সেদিনই মনে হয়েছিল, যদি এঁদের জন্য কিছু করতে পারি।’‌

পেশায় কারপুল ব্যবসায়ী পার্থ কাজ শুরু করে দেন এরপরেই। প্রত্যেকদিন রাত্রিবেলা নিজের গাড়িতে গাড়ি চেপে ১৫০ থেকে ১৭০ জনের খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

খাবার দেওয়ার কাজটা প্রথমে মুড়ি–বিস্কুট দিয়ে দলেও ধীরে ধীরে মেনুতে ঢুকেছে লুচি, তরকারি, সিঙারা, কচুরি, তরকারি, জিলিপি, লেমন রাইস, সাম্বার, ইডলি, ভেজ পোলাও। এর মধ্যে প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যা এবং রাতে দু’‌বার খাবার দেওয়া হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। সন্ধেবেলা দেওয়া হয় মুড়ি, বিস্কুট, কলা, বান পাউরুটি এবং আপেল। রাতে মেনু ওই আগের মতোই। এসএসকেএম ছাড়াও চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল এবং এমআর বাঙুর হাসপাতালে চলে এই কর্মকাণ্ড। তবে এতেও রয়েছে বাধা। পার্থ বললেন, ‘‌আমার এই কাজের জন্য এসএসকেএম হাসপাতালের সামনে খাবারের দোকানের লোকজন আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, আমি বিনামূল্যে খাবার দিই বলে ওঁদের ব্যবসার ক্ষতি হয়। তাই ঠিক করি, আমি রাত দশটার পরেই খাবার দেবো। যাঁদের কিনে খাওয়ার সঙ্গতি রয়েছে, তাঁরা কিনে খেয়ে নেবেন। যাঁরা কিনতে পারবেন না, আমার দেওয়া খাবার তাঁদের কাজে লাগবে।’‌

কাজের শুরুটা একা করলেও ধীরে ধীরে কিছু লোকজনকে পাশে পান পার্থ। তিনি বললেন, ‘‌এসএসকেএম হাসপাতালের কয়েকজন পড়ুয়া আমার সঙ্গে যোগ দেয়। ২৩ মার্চ ২০১৯ সালে তৈরি হয় হেল্পিং হ্যান্ড নামে একটি সংস্থা। বর্তমানে আমাদের এই সংস্থার সদস্যরা একত্রিত হয়ে এই কাজ করেন।’‌ এঁদের মধ্যে শুভম লোধা,বল্লরী গুপ্ত, আকাশ পাঠক, জয়স্মিতা বিশ্বাসরা যেমন চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র, তেমনই অর্ক মুখোপাধ্যায় পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। শুভব্রত ঘোষ পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। প্রীতম করাটি এবং প্রিয়ম রাজরা ডিগ্রি কোর্সে পড়াশুনোর ফাঁকে এই কাজে সাহায্য করেন পার্থকে। এঁদের পাশাপাশি পার্থর সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন কলকাতার সাতটি দোকানের মালিকরা। প্রতিদিন রাতে তাদের দোকানের বেঁচে যাওয়া খাবার তাঁরা তুলে দেন পার্থর হাতে।

হাসরপাতালে এবং ফুটপাথের অভুক্ত শিশুদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও সুন্দরবন এলাকায় চাল, ডাল এবং খাদ্যদ্রব্য বিনামূল্যে সরবরাহ করার কাজ করেন পার্থ। পুরুলিয়া এবং দিনাজপুরে কম্বল বিতরণের কাজেও অংশ নিয়েছেন তিনি। এই কাজের জন্য পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। পার্থ অবশ্য পাওয়ার থেকে দেওয়াতেই বেশি বিশ্বাস রাখেন। সাফ জানিয়ে দেন, ‘‌নিজের আয়ের ত্রিশ শতাংশ এই কাজেই ব্যয় করি। আরও যদি কেউ এগিয়ে এসে সহযোগিতা করতে চান, তাহলে কাজটা আরও বড় করে করতে পারব।’‌