“আদিম কালের চাঁদিম হিম
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম
ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর
গানের পালা সাঙ্গ মোর।”

সায়ন

সুকুমার রায়ের শেষ লেখা। শেষ থেকে একটা মানুষকে শুরু করা যায়। ছেলেবেলার বয়সটা পার হয়ে গেছে। এখন আবার যখন ‘আবোল তাবোল’ এর পাতাগুলো উল্টে দেখি তখন অবাক হয়ে যাই। সুকুমার রায় কি সহজে একটা দেশ তৈরি করে দিয়েছেন আমাদের বদ্ধ ও মুখোশ পরা দেশের মাঝে। শেষ শতাব্দী থেকে বর্তমান করোনাকালীন এই পৃথিবীর মধ্যে মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা এক ‘কিম্ভূত’ মানবের ছবি এঁকেছেন পাতার পর পাতা। যেমন ছোট্ট আনা ড্যুরের জন্য লিখে ফেলতে পারেন ‘হযবরল’-র উলটপুরাণ, যে মেযে় পরবর্তীকালে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে প্রেমে পরবে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র ওযা়নার্র হাইজেনবার্গ এবং প্রেমের স্মারকরূপে তুলে দেবেন সুকুমার রায়ের থেকে উপহার পাওয়া সেই পান্ডুলিপি – ইতিহাসে যা ‘আনসার্টেন্টি প্রিনসিপল’ তৈরি করতে সাহায্য করবে। যার মুখবন্ধে লেখা আছে “ডের বাউম্মান” বা “গেছোদাদা” গল্পের কথা।

তিনি অনায়াস নিজের সম্পর্কে বলতে পারেন :
” নই ঘোড়া, নই হাতি, নই সাপ বিচ্ছু,
মৌমাছি, প্রজাপতি, নই আমি কিচ্ছু ।
মাছ ব্যাং গাছপাতা জলমাটি কেউ নই,
নই জুতা, নই ছাতা, আমি তবে কেউ নই।”

এই অন্তহীন স্বনাস্তিকার সাহায্যে তিনি আবোল তাবোলের ভিতর প্রবেশ করেন সমাজ দেশ ও বিশ্বের সংকটাপন্ন সময়ের বিরুদ্ধে তীব্র কষাঘাত। তাঁর irony আমাদের সম্বন্ধে আমাদের দিয়েই হাসির খোরাক করার যন্ত্র-
“প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি,
খাসা তোর চ্যাঁচানি”

“ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি” বলে চিৎকার করা বড়বাবু কে, কিংবা ‘খুডো়র কল’ বানিয়ে অক্লেশে মাইল মাইলে দৌড়ে খাবার খেতে ব্যার্থ কে হয় ? এই লোকগুলো কি শুধুই একটি হাসির ছড়ার চরিত্র – নাকি সুকুমার বুঝে দিচ্ছেন পার্শ্বস্থ হয়ে যাওয়া ঔপনিবেশিক সমাজের কাঠামোয় যেখানে শান্তশিষ্ট ভালো ছেলে সরকারি চাকরি করে কেরানি হবে কিংবা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সেই জীবন আদর্শকে তিনি পাগলামি আর হুল্লোড় ছাড়া কিছু মনে করেন নি। মজার বিষয় এই কারণেই সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’এ বাচ্চাদের কোনও দেখে মেলে না, তারা উপলক্ষ হয়ে ব়যেছে , লক্ষ্য নয় ।কাতুকুতু বুড়োর কাতুকুতু, কিংবা গানের গুঁতো ছেলেবেলার জন্য হাসি দমকের কাজ করে, কিন্তু মাঝেমাঝে মনে হয় ‘সুকুমার’ অবচেতনের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তিনি তৈরি করে রাখছেন একটি সাংস্কৃতিক অবক্ষয়পূর্ণ ইতিহাসলেখ।

১৯১৪- ১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন আর দামামা বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের চরমপন্থী বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয় তার সঙ্গে সেই সময় মাদ্রাজ বন্দরে জার্মান লাইট ক্রুজার জাহাজ এস.এম.এস এমডেন বোমা বর্ষন করে। মাদ্রাজ শহরজুরে ত্রাস, তার কিছুদিনের মধ্যেই গোপনে বঙ্গোপসাগর প্রবেশ করে এবং কলকাতা – কলোম্বো পথের একুশটা যুদ্ধজাহাজ দখল করে। ব্রিটিশরা এই বাইশ দিনের খবর চাপা দিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু মাদ্রাজ জুরে বোমার আঘাত গোটা ভারতকে সন্ত্রস্ত করে দেয়।
তখন বছর সাতাশের বাঙালি যুবক সুকুমার কলকাতায় বসে লিখে ফেললেন মজার কবিতা।
‘ গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা -/ আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বর্মা।’
গানের গুঁতো আসলে ইতিহাসে লেখা আছে Gun এর গুঁতোয়।

রসের ভান্ডারের খনি সুকুমার রায়ের একশো-তেত্রিশ বছরে জন্মদিনে দাঁড়িয়ে দেখি তাঁর কাজের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব নিয়ে শূন্য সময়ের বাঙালি ভুলে গেলো একজন শিল্পীর মধ্যে শুধুমাত্রই ‘শিশুসাহিত্যিক’ সত্ত্বাটুকুই নয় একজন সামাজিক দ্রষ্টার জীবন, আলেখ্য ও আখ্যান পাতার পর পাতা চাপা পরে আছে দু’মলাটের নিচে।