অর্পণ গুপ্ত: হেলমেট খোলার পর স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়ায়, ফ্লাডলাইটের আলো ছিটকে এসে লাগে মুখে৷ বিরাটের শক্ত চোয়াল, সৌরভের কড়া আগ্রাসন, সচিনের সম্মোহনী আকাশ দেখার চোখ নেই সেই খোলা হেলমেটের নীচে, রয়েছে পিছনে বেঁধে রাখা লম্বা চুল কিছুটা এলোমেলো হয়ে থমথমে আকাশে কালো মেঘ হয়ে ভেসে যাওয়ার অদ্ভুত রোমান্টিসিজম!

কিন্তু উইকিপিডিয়া যাকে ব্যাটসওম্যান বলে চিহ্নিত করে সেই স্মৃতি মন্ধানা কি আদৌ ফেলে আসা সেঞ্চুরির প্রতিটা পরতে এতটাই রোম্যান্টিক? ক্রিকেট কি এখানে মেলে দেয়নি ব্যাট বলের শুকনো স্কোরবোর্ডের বাইরে গিয়ে তার চেনা আগ্রাসন? দিয়েছে বলেই হয়তো বাঁ-হাতি মারাঠি প্রতিটা কভার ড্রাইভে ভরে দিয়েছেন কঠিন নিপুণতা আর সম্মোহনী লাবণ্যের এক মিশেল, যেখানে সচিন-বিরাট-স্মিথের পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে নিজেই গড়ে নিচ্ছেন এক স্বতন্ত্র দুনিয়া, ক্রিকেট ঈশ্বরের মানসকন্যা স্মৃতি মন্ধানা এগিয়ে চলেছেন যেন সেই জীবনানন্দের চেনা দারুচিনি দ্বীপের দিকে, ক্রিকেটের কোনও অনন্ত যাত্রাপথের পথিক হচ্ছেন রোজ…

মুম্বইয়ে ছেলেবেলা কাটানোর পর যখন ছোট্ট স্মৃতি যখন পরিবারের সাথে মাধবনগর চলে আসে তখন বয়স মাত্র ২। ক্রিকেটের রেওয়াজ বাড়িতে ছিলই, বাবা আর বড় দাদা সাংলি ডিস্ট্রিক্টের হয়ে খেলছেন সেই সময়ে, সাত বছর বয়সে যখন দাদা প্রথম মহারাষ্ট্রের হয়ে অনূর্ধ্ব ১৬ দলে সুযোগ পায় ঠিক সেখান থেকেই শুরু হল স্মৃতির ক্রিকেট প্রেমের শুরু। দাদা-বাবার হাত ধরে স্টেডিয়ামে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই ছোট্ট স্মৃতির মনে গড়ে উঠছিল একটা জেদ, নিজের অজ্ঞাতেই একটা মিথ ভেঙে দেবার শপথ। বাড়িতে প্র‍্যাকটিসে দাদার সঙ্গে খেলতে খেলতেই নিজেকে প্রথম ক্রিকেটের মন্ত্রে দীক্ষিত করার কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। মাত্র ৯ বছর বয়সে সুযোগ এল মহারাষ্ট্র অনূর্ধ্ব ১৫ দলে, মাত্র দু’ বছরের মাথাতেই সিলেক্টারদের নজরে এলেন স্মৃতি, এগারো বছরে সুযোগ পেলেন অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কনিষ্ঠতম সদস্যা হিসেবে।

২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে মহারাষ্ট্র-গুজরাট ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরি করে জাতীয় নির্বাচকদের নজরে এলেন স্মৃতি। যদিও মনে রাখা দরকার তাঁর একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক কিন্তু হয়ে গেছে ওই বছরেই বাংলাদেশের বিপক্ষে এপ্রিলে।

টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হল ঠিক পরের বছর। স্মৃতির ব্যাটিং প্রতিভা নজর এড়াল না আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সমালোচকদেরও৷ এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি করে উল্লেখ্য, অভিষেক টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২২ ও ৫১ রানের ইনিংস দুটি। ওয়ার্মস্লে পার্কের পিচে আপাতদৃষ্টিতে কম রান মনে হলেও ইনিংস দুটির তাৎপর্য ছিল এই যে, এখানে স্মৃতিকে সামলাতে হয়েছিল গতি আর সুইং-এর মিশেল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের ইংল্যান্ডে অভিষেকের যে উজ্জ্বল ট্র‍্যাডিশন তা যেন আগলে রাখলেন স্মৃতি।

তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথম সেঞ্চুরিটা পেতে স্মৃতির সময় লেগে গেল আরও দু’ বছর। এই সময়টাতে ক্রমাগত নিজেকে যেন আরও পরিণত ব্যাটসম্যান হিসেবে গড়ে তুলছিলেন তিনি। অপেক্ষা ছিল স্ফূরণের। ২০১৬ হোবার্টে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়, স্মৃতির প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির মধ্যে দিয়ে। সেই বছরই আইসিসির উইমেন্স টিম অব দ্য ইয়ারে জায়গা পেলেন তিনি। ২০১৬-১৭ খেললেন ব্রিসবেন হিটের হয়ে।

কিন্তু ২০১৬ এর শেষভাগে লিগামেন্ট ইনজুরি যেন ডেকে আনল অশনি সংকেত। তবু ২০১৭ বিশ্বকাপ দলে ডাক পেলেন স্মৃতি। অদ্ভুতভাবে কোনও প্রস্তুতি ম্যাচ ছাড়াই নামলেন প্রথম ম্যাচ থেকে এবং প্রথম ম্যাচ থেকেই ফের পুরোনো ফর্ম ফিরে পেলেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯০, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১০!

টি টোয়েন্টিতে ২৪ বলে ৫০ করে রেকর্ড গড়লেন ২০১৯ সালে। টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রথম মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে ১০০০ রানের গণ্ডি পেরোলেন স্মৃতি, সঙ্গে ভারতীয়দের মধ্যে দ্বিতীয় দ্রততম খেলোয়াড় হিসেবে পেরোলেন ২০০০ রানের গণ্ডি। এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে ৬৬৯ রান করে ৭০ গড় নিয়ে ২০১৮-তেই তার মাথায় উঠল আইসিসির শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারের খেতাব। ২০১৯ সালে ধারাবাহিকতার পুরস্কার হিসেবে পেলেন সিয়েট ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের খেতাব।

২৩ বছর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে সংখ্যাটা স্মৃতির জন্য সত্যিই বিষ্ময়কর। স্মৃতি মন্ধানার চওড়া ব্যাট যেন মনে করাচ্ছে পুরোনো স্মৃতির পাতা, মারাঠা রাজপুত্রের ১৬ বছরে ডেবিউ করে দীর্ঘ ক্রিকেটীয় রূপকথাকে৷ এর মধ্যেই স্মৃতির ঝুলিতে ঢুকে গেছে অসংখ্য খেতাব, পুরস্কার, তিনি জানেন সামনের রাস্তাটা অনেকটা লম্বা, যার সবটুকু এমন মসৃণ নয়, পরতে পরতে রয়েছে কাঁটা বিছানো, এই পথের শেষেই রাখা আছে ক্রিকেটের বরমাল্য।

স্মৃতির অদম্য জেদ আগামী কয়েক বছরে পৌঁছে দেবে সেই কাঙ্ক্ষিত বিন্দুতে, ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে স্বয়ং সরস্বতী ভেঙে দেবেন তৃতীয় বিশ্বের মনের গহনে থাকা গোঁড়া মিথ, ভারতীয় ক্রিকেটের মানচিত্রে সচিন-সৌরভ-কোহলি-ধোনি সাম্রাজ্যের পাশে স্বকীয়তায় মাথা তুলে দাঁড়াবেন স্মৃতি মন্ধানা…