মৌসুমী মোদক: ক্রিকেটের ইতিহাসে, পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান শাহিদ আফ্রিদির করা ৩৭ বলে ১০০ রানের ইনিংসটি দ্রুততম সেঞ্চুরি হিসেবে দীর্ঘ সময় টিকে ছিল।  ১৯৯৬ সালের সেই দ্রুততম সেঞ্চুরির মেয়াদ ছিল ১৮ বছর। এরপর দ্রততম সেঞ্চুরির মালিক হন নিউজিল্যান্ডের বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান কোরি অ্যান্ডারসন। বর্তমানে সেই শিরোপা দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার এবি  ডিভিলিয়ার্সের মাথায়। তিনি এই শতরান হাঁকিয়েছিলেন মাত্র ৩১ বলে। অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত একদিনের ক্রিকেট ৪০ বলের কমে সেঞ্চুরির সংখ্যা মোট ৩টি। কিন্তু যখন বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রসঙ্গ আসে, সেক্ষেত্রে ৪০ তো দূরের কথা, ৫০ বলের নীচে কোনও সেঞ্চুরির দেখা মেলেনি। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। বিশ্বকাপের মতো এত বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষের কড়া প্রতিযোগিতা সামলে সেঞ্চুরি করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! এর মধ্যেও ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে বেশকিছু দ্রুততম শতরানের নজির রয়েছে। দেখে নেওয়া যাক সেই তালিকা।

১০. ক্লাইভ লয়েড (৮২ বল)

প্রতিপক্ষ: অস্ট্রেলিয়া (১৯৭৫)

ক্লাইভ লয়েডকে ছাড়া দ্রুততম সেঞ্চুরির তালিকাটি হয়তো অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। নিজের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়া ছাড়াও, ব্যাট হাতে বিস্ফোরক সব ইনিংস উপহার দেওয়া ক্লাইভ লয়েড বিপক্ষ বোলারদের জন্য ত্রাস ছিলেন। প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালেই ‘অধিনায়কোচিত’ এক ইনিংস খেলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের সেই ফাইনালে তিনি মাত্র  ৮২ বলে সেঞ্চুরি করেন। যে যুগের বিচারে ইনিংসটা অবশ্যই ঝোড়ো। তাঁর সেঞ্চুরির ওপরে ভর করেই সেই ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মোট ২৯১ রান সংগ্রহ করে। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ২৭৪ রান করে। দুর্দান্ত সেঞ্চুরির জন্য ম্যাচের সেরার পুরস্কারটিও জেতেন লয়েড। লয়েডের বিশ্বকাপ ফাইনালে এই দ্রুততম শতকের রেকর্ডটি টিকে ছিল দীর্ঘ ৩২ বছর। ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালে এসে যেটি ভাঙেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট।

 

৯. বীরেন্দ্র সেওয়াগ (৮১ বল)

প্রতিপক্ষ : বারমুডা (২০০৭)

২০০৭ বিশ্বকাপের কথা কোনও ভারতবাসীই মনে রাখতে চাইবেন না। সেবার বিশ্বকাপে অনেক আশা নিয়ে শুরু করলেও গ্রুপ স্টেজেই হেরে বিদায় নেয় ভারত। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বাদ পড়লেও ভারত যথাযথভাবে নিজেদের মেলে ধরেছিল বারমুডার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে সেওয়াগের ৮১ বলের সেঞ্চুরির ওপর ভর করে ভারত সংগ্রহ করে মোট ৪১৪ রান, যা এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। ৮১ বলে সেঞ্চুরি করা সেওয়াগ শেষ পর্যন্ত ১১৪ রানে থামেন। তবে সেওয়াগ থামলেও ভারত কিন্তু ম্যাচটি জিতে নেয় ২৫৭ রানের বিশাল ব্যবধানে।

 

৮. জস বাটলার (৭৫ বল)

প্রতিপক্ষ : পাকিস্তান (২০১৯)

চলতি বছরের ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জস বাটলারের সেঞ্চুরি এই তালিকার ৭ নম্বর স্থানে। ২০১৯ বিশ্বকাপের প্রথম সেঞ্চুরিটি আসে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যান জো রুটের ব্যাট থেকে। এরপর দ্বিতীয় সেঞ্চুরি আসে তারই সতীর্থ উইকেট কিপার-ব্যাটসম্যান জস বাটলারের হাত ধরে। মাত্র ৭৫ বলে সেঞ্চুরিটি করেন তিনি। এই ম্যাচে পাকিস্তান প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৩৪৮ রানে তাদের ইনিংস শেষ করে। জবাবে ইংল্যান্ড ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই তাদের ওপেনিং জুটিকে হারিয়ে বেশ চাপে পড়ে যায়। সেখান থেকে জো রুটকে সঙ্গে নিয়ে ৭৬ বলে ১০৩ রানের এক অসাধারণ ইনিংস খেলেন বাটলার। তিনি সেঞ্চুরি করেন মাত্র ৭৫ বলে। যদিও ঠিক তার পরের বলেই ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই তিনি আউট হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডও পাকিস্তানের কাছে ম্যাচটি হেরে যায় মাত্র ২১ রানে।

 

৭. অ্যাডাম গিলক্রিস্ট (৭২ বল)

প্রতিপক্ষ : শ্রীলঙ্কা (২০০৭)

বিশ্বকাপ ফাইনালে ক্লাইভ লয়েডের করা ৮২ বলে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড দীর্ঘ ৩২ বছর পর ভাঙেন অস্ট্রেলিয়ান ‘হার্ডহিটার’ অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার বোলারদের বিরুদ্ধে মাত্র ৭২ বলে সেঞ্চুরি করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত ১০১ বলে ১৪৯ রান করেন তিনি, যেটি বিশ্বকাপ ফাইনালে করা সর্বোচ্চ ইনিংস। তার শতকের উপর সওয়ার হয়েই অস্ট্রেলিয়া ৩৮ ওভারে ২৮১ রান সংগ্রহ করে। গিলক্রিস্টের এহেন বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে এমনিতেই আশা হারিয়ে ফেলা শ্রীলঙ্কা শেষমেশ ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ৫১ রানে হেরে যায় এবং অস্ট্রেলিয়া ঘরে তোলে টানা তিন বিশ্বকাপের শিরোপা।

 

৬. কপিল দেব (৭২ বল)

প্রতিপক্ষ : জিম্বাবোয়ে (১৯৮৩)

কপিল দেবের এই একমাত্র বিখ্যাত ইনিংসটির কোনো ভিডিও আইসিসির সংগ্রহে নেই। সেদিন ক্যামেরাম্যান বলের আঘাত পাওয়ায় কপিল দেবের এই বিখ্যাত ইনিংসটি পরবর্তী সময়ে আর কারও চাক্ষুষ প্রমাণ করার সৌভাগ্য হয়নি।

সেমিফাইনালের টিকিট পেতে হলে জিততেই হবে। অথচ শুরুতেই ১৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে পিছিয়ে পড়ে ভারত। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কপিল এই দুর্দান্ত ইনিংসটি খেলেন। মাত্র ৭২ বলে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েই ক্ষান্ত হননি, শেষ পর্যন্ত তিনি করেন ১৭৫ রান। । সাক্ষাৎ হারের মুখ থেকে দলকে উদ্ধার করেন ‘ক্যাপ্টেন’ কপিল। ভারতের ২৬৬ রানের মধ্যে ১৭৫ রানই ছিল তাঁর। মোট ৬টি ছয় ও ১৬টি চারের সাহায্যে এই রান সংগ্রহ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত জিম্বাবোয়েকে ৩১ রানে হারিয়ে সেমিফাইনাল তো বটেই, পরবর্তীতে বিশ্বকাপটাই জিতে নেয় কপিল দেবের ভারত।

 

৫. জন ডেভিসন (৬৭ বল)

প্রতিপক্ষ : ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২০০৩)

এই তালিকার সবচেয়ে চমকপ্রদ নাম হল জন ডেভিসনের।  তৎকালীন সময়ে এই কানাডিয়ান ব্যাটসম্যান বিশ্বকাপের সবচেয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে মাত্র ৬৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ডেভিসন। শেষ অবধি তাঁর করা মোট ১১১ রানের ইনিংস সাজানো ছিল ৬টি ছয় ও ৮ টি চার দিয়ে। তবে বাকি কোনও কানাডিয়ান ব্যাটসম্যানই বড় রান না পাওয়ায় দলের মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ২০২ রানে, যা ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাত্র ৩০ ওভারেই পার করে দেয়। তবে ম্যাচ হারলেও তাঁর এই ইনিংস দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখে ফেলেন জন ডেভিসন।

 

৪. ম্যাথু হেডেন (৬৬ বল)

প্রতিপক্ষ : দক্ষিণ আফ্রিকা (২০০৭)

২০০৭ বিশ্বকাপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ম্যাথু হেডেনের উপর দায়িত্ব ছিল দক্ষিণ আফ্রিকান ফাস্ট বোলার শন পোলককে সামলানোর। খেলা শুরু হতেই শন পোলক সহ দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের উপর তাণ্ডব চালাতে শুরু করেন গিলক্রিস্ট-হেডেন জুটি। বলা বাহুল্য, পোলকের উপর একটু বেশিই চড়াও হয়েছিলেন হেডেন। মাত্র ৬৬ বলে নিজের সেঞ্চুরি সম্পূর্ণ করেন হেডেন। এটি তৎকালীন সময়ের দ্রুততম বিশ্বকাপ সেঞ্চুরির মধ্যে অন্যতম। এই শতরানের পাশাপাশি পন্টিং এবং ক্লার্কের আরও দুটি দুর্দান্ত ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহে দাঁড়ায় ৩৭৭ রান। তা তাড়া করতে নেমে ডিভিলিয়ার্সও ৯২ রানের দারুণ একটি ইনিংস খেলে যান। কিন্তু তারপরও ৮৩ রানের হার স্বীকার করে নিতে হয় প্রোটিয়াদের।

 

৩. এবি ডিভিলিয়ার্স (৫৫ বল)

প্রতিপক্ষ : ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২০১৫)

২০১৫ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র ৫৫ বলে সেঞ্চুরি করেন দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার এবি ডি। প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বোলাররা তো বটেই, সিডনির দর্শকরাও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন ডিভিলিয়ার্সের এই ক্যামিওতে। দ্রুততম সেঞ্চুরি হাঁকানোর পরও তিনি কিন্তু থেমে থাকেননি, শেষ পর্যন্ত ২৪৫ স্ট্রাইক রেটে ৬৬ বলে ১৬২ রান করে যান তিনি। পুরো ইনিংসে ১৭টি চার ও ৮টি ছয় মারার পথে মাত্র সাতটি ডট বল খেলেন ‘৩৬০ ডিগ্রি’ নামে খ্যাত এই প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান। এবির এই দুর্দান্ত ইনিংসের উপর ভর করেই প্রতিপক্ষের সামনে  ৪০৮ রানের পাহাড় দাঁড় করায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

 

২. গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (৫১ বল)

প্রতিপক্ষ : শ্রীলঙ্কা (২০১৫)

এই ম্যাচের আগে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয় ব্যাটসম্যান ম্যাক্সওয়েলের কোনও সেঞ্চুরি ছিল না। পাঁচবার নব্বইয়ের ঘরে গিয়ে আউট হয়ে যান তিনি। প্রথম শতকের জন্য তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চকেই বেছে নিয়েছিলেন । ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে করা এই সেঞ্চুরির সাহায্যে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম ইনিংসের মালিকও বনে যান তিনি। ১০টি চার ও ৪টি ছ’য়ের সাহায্যে ৫১ বলে শতরান করেন তিনি।

 

১. কেভিন ও’ব্রায়েন (৫০ বল)

প্রতিপক্ষ : ইংল্যান্ড (২০১১)

বিশ্বকাপের এক অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের মধ্যে ২০১১ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড বনাম আয়ারল্যান্ডের এই ম্যাচটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। ম্যাচের প্রথমে ব্যাট করে ইংল্যান্ড ৩২৭ রানের এক বিশাল লক্ষ্যে আয়ারল্যান্ডের সামনে দাঁড় করায়। এত বড় রানের লক্ষ্য নিয়ে শুরুতে আয়ারল্যান্ডও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। ২৪ ওভার শেষে ১১১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে যখন দল রীতিমতো ধুঁকছে, ঠিক সেই সময়ে মাঠে নামেন আইরিশ ক্রিকেটার ও’ব্রায়েন। এরপর বাকিটা প্রায় রূপকথার মতই। পরবর্তী ১০ ওভারে খেলার মোড় একাই ঘুরিয়ে দেন ও’ব্রায়েন। এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবথেকে দ্রুততম সেঞ্চুরিটি করে ফেলেন তিনি। মাত্র ৫০ বলে ১০০ রান পথে মোট ১৩টি চার ও ৬টি ছয় মারেন। শেষ পর্যন্ত ১১৩ রানে রানআউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন ও’ব্রায়েন। অবশ্য তার আগে দলকে প্রায় জয়ের কিনারায় পৌঁছেই দিয়ে যান কেভিন।

 

বিশ্বকাপের মতো এত বড় মঞ্চে এভাবে দ্রুততম সেঞ্চুরির মাধ্যমে নিজের দলকে জেতানো অবশ্যই বিশেষ কৃতিত্বের নমুনা। তবে বর্তমানে টি-টোয়েন্টির যুগে হয়তো কোনওকিছুই অসম্ভব নয়। তাই অদূর ভবিষ্যতে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডও যদি হাতবদল করে, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবু ক্রিকেটপ্রেমীর মনের মণিকোঠায় চিরউজ্জ্বল হয়ে থাকবে অতীতের সেই লড়াইয়ের কাহিনি।